কিয়েভ দখলে রুশ অভিযান আসন্ন!

আপডেট : ১৩ মার্চ ২০২২, ০০:৫৩

ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার যুদ্ধের ১৭তম দিনে শনিবার (১২ মার্চ) বিশাল রুশ সেনাদল এবং সাঁজোয়া বহর ক্রমশ রাজধানী কিয়েভের দিকে অগ্রসর হয়েছে। ব্রিটেনের গোয়েন্দা সূত্রগুলো বলছে, বেশিরভাগ রুশ সেনা এখন রাজধানী কিয়েভের কেন্দ্র থেকে মাত্র ২৫ কিলোমিটার দূরে।

এর আগে বৃহস্পতিবারই মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, রাশিয়ার সেনা কিয়েভের ৫ কিলোমিটারের মধ্যে পৌঁছে গেছে। রুশ বাহিনীকে প্রতিরোধে ব্যাপক প্রস্ত্ততি নিয়ে রেখেছে ইউক্রেন সেনাবাহিনী ও স্হানীয়রা। প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি এই চরম পরিস্হিতিকে ইউক্রেনের জন্য মোড় ঘোরানো মুহূর্ত বলে উল্লেখ করেছেন। এদিকে রাশিয়ার বিরুদ্ধে দেশটির এক মেয়রকে অপহরণের অভিযোগ পাওয়া গেছে। কিয়েভের দক্ষিণে ইউক্রেনের একটি সামরিক বিমান ক্ষেত্রের ওপর রুশ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়েছে। ভাসিলকিভ শহরের মেয়র জানিয়েছেন, এই হামলায় রানওয়ে এবং তেলের ডিপো ধ্বংস হয়ে গেছে, একই সঙ্গে পাশে অস্ত্র এবং গোলাবারুদের গুদামেও বিস্ফোরণ ঘটেছে। ইউক্রেনের আরেকটি উত্তরাঞ্চলীয় শহর চেরনিহিভ এখনো অবরুদ্ধ, সেখানে তীব্র গোলাবর্ষণ হচ্ছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। শহরে কোনো পানির সরবরাহ নেই, একটি অংশে বিদ্যুৎ সরবরাহও বন্ধ হয়ে গেছে।

দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর মাইকোলেভ, যেটি রুশ অধিকৃত শহর খেরসান এবং ইউক্রেনের তৃতীয় বৃহত্তম শহর ওডেসার মাঝামাঝি, সেখানেও তীব্র গোলাবর্ষণ চলছে। ইউক্রেনের সরকার বলছে, কয়েকটি মানবিক ত্রাণ করিডোর খোলা যাবে বলে তারা আশা করছে, যাতে বিভিন্ন শহরের রুশ বোমা হামলার মুখে থাকা লোকজন যে পালাতে পারে। ইউক্রেনের ডেপুটি প্রধানমন্ত্রী ইরিনা ভেরেশচুক জানিয়েছেন, এসব শহর থেকে মানুষকে উদ্ধারের বিষয়টি নির্ভর করবে রাশিয়া যুদ্ধবিরতি মেনে চলে কীনা, তার ওপর।

কিয়েভে হামলা আসন্ন

স্যাটেলাইটে তোলা ছবি থেকে দেখা যাচ্ছে, রুশ রকেট লঞ্চারগুলো এখন কিয়েভের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্ত্তর দিকে তাক করা। ভারী গোলাবর্ষণের শব্দও শোনা যাচ্ছে। পাশাপাশি, সাঁজোয়া গাড়িতে বসানো ‘বিএম-২১ গ্রাদ’ রকেট ছোড়া হচ্ছে কিভের নানা পূর্বনির্দিষ্ট লক্ষ্যে। বিবিসির সংবাদদাতা জেমস ওয়াটারহাউজ বলেছেন, রাজধানী কিয়েভের উত্তরে এখন ক্রমাগত বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যাচ্ছে। বেশিরভাগ রুশ সেনা সেদিকেই জড়ো হয়েছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা ধারণা করছেন, বেশিরভাগ রুশ সেনা এখন কিয়েভের উপকণ্ঠ পর্যন্ত চলে এসেছে। যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাদ্যমে বলা হয়, রাজধানী কিয়েভের উত্তরাঞ্চলে রাশিয়ান সেনাবাহিনীর একটি বড় বহর দেখা গেছে। ইউক্রেনের পালটা হামলায় নিজেদের ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে এমন বহরকে সামনে নিয়ে আসা হচ্ছে বলে ধারণা বিশ্লেষকদের।

ইউক্রেনের সামরিক অধিনায়কদের আশংকা, রুশ সেনারা কিয়েভের ওপর অনেক ব্যাপক এবং পূর্ণাঙ্গ হামলার প্রস্ত্ততি নিচ্ছে। একই সঙ্গে তারা শহরটি চারদিক থেকে ঘিরে ফেলার চেষ্টা করবে, যেটি তারা অন্যান্য শহরের ক্ষেত্রেও করেছে। তবে সেরকম সক্ষমতা রাশিয়ার বাহিনীর আছে কীনা, সেটা স্পষ্ট নয়। ইউক্রেনের অন্যান্য শহরের মতো এখানেও রুশ বাহিনী তীব্র প্রতিরোধের মুখে পড়ছে। ইউক্রেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার স্হানীয় সময় ভোররাতে কিয়েভের উত্তরপূর্বে ব্রোভারি জেলায় রুশ বাহিনীর গোলাবর্ষণে হিমায়িত পণ্যের একটি গুদামে আগুন লেগে যায়। তাছাড়া রাজধানীর দক্ষিণে অবস্হিত একটি ইউক্রেনের একটি সামরিক স্হাপনায়ও হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। তাছাড়া দেশটির বন্দরনগরী মারিউপোলের একটি প্রাচীন মসজিদেও হামলা চালায় রাশিয়ান সেনারা। মসজিদটিতে শিশুসহ প্রায় ৮০জন সাধারণ মানুষ আশ্রয় নিয়েছিলেন বলে জানা গেছে।

পুতিন অধৈর্য হয়ে উঠছেন

বিবিসির নিরাপত্তা সংবাদদাতা ফ্রাংক গার্ডনার বলছেন, প্রেসিডেন্ট পুতিন যে ক্রমশ অধৈর্য হয়ে উঠছেন, সেটা স্পষ্ট এবং রাশিয়া যে এই সংঘাতের নতুন একটা পর্যায়ে প্রবেশ করছে, সেটাও স্পষ্ট। কারণ কিয়েভকে ঘিরে তারা বিপুল সমরাস্ত্র জড়ো করেছে-আর্টিলারি, রকেট লঞ্চার, ডেÌান, ক্ষেপণাস্ত্রসহ সব ধরণের সমরাস্ত্র। ফ্রাংক গার্ডনার বলেছেন, রাশিয়া কীভাবে লড়াই করবে, তার ইঙ্গিত পেতে তাকাতে হবে অতীতে চেচনিয়ার গ্রোজনি বা সিরিয়ার আলেপ্পোতে তারা কী ধরণের কৌশল নিয়েছিল সেদিকে। এই দুটি শহর দখলের জন্য রুশ সেনাদের প্রতিটি রাস্তায় লড়াই করতে হয়েছে, কিন্তু এর ফলে দুটি শহরই কার্যত মাটিতে মিশে গিয়েছিল। প্রশ্ন হচ্ছে, প্রেসিডেন্ট পুতিন কি কিয়েভে সেটা করবেন? ফ্রাংক গার্ডনার বলেছেন, এটা বলা কঠিন। কারণ কিয়েভ শুধু ইউক্রেনের রাজধানী নয়, এই শহর প্রাচীন রুশ সাম্্রাজ্যের ইতিহাসের অংশ, যখন মস্কো বলে কোনো শহরের অস্তিত্বই ছিল না, তখন এই কিয়েভই ছিল রুশ সাম্রাজ্যের রাজধানী। প্রেসিডেন্ট পুতিন যদি কিয়েভ ধ্বংস করে ফেলেন, সেটা রাশিয়ার মানুষ ভালোভাবে নেবে না। তবে ফ্রাংক গার্ডনারের বিশ্বাস, ইউক্রেন দখলের জন্য প্রেসিডেন্ট পুতিন কোন কিছুই বাদ রাখবেন না। ইউক্রেন ন্যাটো বা ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগ দিচ্ছে, এটা দেখার চাইতে তিনি বরং তার প্রতিবেশি দেশকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়াও মেনে নেবেন।

রুশ অভিযান নিয়ে সংশয়

ন্যাটোর সাবেক ডেপুটি সেক্রেটারি জেনারেল রোজ গোটেমোয়েলার বলেছেন, কিয়েভে রাশিয়ার সৈন্যরা সেরকম বড় কোনো সাফল্য পাবে কীনা, সেটা নিয়ে তার সংশয় আছে। তিনি বলেন, রুশ সেনাদের এই পর্যায়ে নতুন করে সংগঠিত হওয়ার সক্ষমতা আছে কিনা, সেটা আমি ভাবছি। কারণ তাদের রসদ-পত্রের খুব খারাপ অবস্হা, কিয়েভ পর্যন্ত অগ্রসর হওয়ার মতো জ্বালানি পর্যন্ত তাদের নেই। তিনি আরো বলেন, রাশিয়া যে এখন সিরিয়া থেকে ভাড়াটে যোদ্ধা আনার চেষ্টা করছে, সেটাও প্রমাণ করে, রাশিয়া এই অভিযানে কত বর্বর একটা কৌশল নিয়েছে। রাশিয়া বলছে, মধ্যপ্রাচ্যে ১৬ হাজার যোদ্ধা আছে, যারা রাশিয়ার পক্ষে লড়াই করতে প্রস্ত্তত। যুক্তরাষ্ট্রের ধারণা এদের মধ্যে অনেক সিরিয়ান আছে, যারা শহরের গেরিলা লড়াইয়ে বেশ দক্ষ। রোজ গোটেমোয়েলার বলছেন, এগুলো আসলে চরমপম্হি গোষ্ঠী, সিরিয়ায় লড়াই করছিল এরকম লোকজন। যুদ্ধে লিপ্ত সবচেয়ে সহিংস কিছু চরমপম্হি দল।

ইউক্রেন বাহিনীর ব্যাপক প্রস্তুতি

গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনে হামলা শুরুর পর একে একে দেশটির বিভিন্ন শহরের অবরোধ ও দখল করে রাশিয়ান সেনারা। গতকাল শনিবার ভোররাতের পর রাশিয়ান স্থলবাহিনী রাজধানী কিয়েভের খুব কাছাকাছি চলে আসে। রাজধানীর খুব কাছে রাশিয়ান সেনাবাহিনীর উপস্থিতির প্রেক্ষিতে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি বলেন, ইউক্রেন ইতিমধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সন্ধিক্ষণে উপনীত হয়েছে। রুশ সেনাদের ছোট ছোট কিছু অগ্রবর্তী দল আরো কাছে যাওয়ার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু তারা ইউক্রেনের বাহিনীর দিক থেকে তীব্র প্রতিরোধের মুখে পড়ে। ইউক্রেনের একজন এমপি বিবিসিকে বলেছেন, রুশ আক্রমণ প্রতিরোধের জন্য কিয়েভের মানুষ দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এবং রুশরা শহরে ঢোকার চেষ্টা করলে তাদের তীব্র প্রতিরোধের মুখে পড়তে হবে।

মেয়রকে অপহরণের অভিযোগ

মেলিটোপোল শহরের মেয়রকে রাশিয়ার সেনারা অপহরণ করেছে বলে অভিযোগ ইউক্রেনের। মেয়রের মুক্তির দাবি জানিয়ে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভোলদোমির জেলেনস্কি বলেন, মেয়রের অপহরণের ঘটনায় রাশিয়ার দুর্বলতা প্রকাশ পেয়েছে। আর এটি কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয় বরং একটি জনগোষ্ঠির উপর চালানো অপরাধ। এটি গণতন্ত্রের উপর চালানো অপরাধ। উল্লেখ্য ইউক্রেনের দক্ষিণাঞ্চলের এই শহরটি হামলা শুরুর প্রথম দিকেই দখলে নেয় রুশ সেনারা।

যুদ্ধবিরতির আহ্বান

রাশিয়ার হামলার পর বিভিন্ন শহর ও গ্রামাঞ্চলে আটকে পড়া সাধারণ মানুষকে নিরাপদে বেরিয়ে যেতে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে ইউক্রেন। কিয়েভ, মারিউপোল ও সুমিসহ অন্যান্য শহরগুলো থেকে সাধারণ মানুষকে বেরিয়ে যাওয়া সুযোগ দেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানান উপপ্রধানমন্ত্রী ইরিনা ভেরেশচুক। গতকার মারিউপোলে যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে সেখানকার সাধারণ মানুষকে বেরিয়ে যেতে করিডোর তৈরি করার কথা রয়েছে। ইউক্রেনের উপপ্রধানমন্ত্রী ইরিনা ভেরেশচুক বলেন, আমি আশা করি মানবিক করিডোরগুলো খুলে দেওয়া হবেক। রাশিয়ার সৈন্যরা যুদ্ধবিরতি মেনে সাধারণ মানুষকে বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেবে।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় প্রস্তুত রাশিয়া

নিরাপত্তা ইস্যুসহ কৌশলগত অস্ত্রশস্ত্র হ্রাস চুক্তি (এসটিএআরটি) নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় বসতে প্রস্ত্তত বলে জানিয়েছে রাশিয়া। রুশ ডেপুটি পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘মার্কিনিরা যদি প্রস্তুত থাকে, আমরা অবশ্যই আবারো আলোচনায় বসতে প্রস্ত্তত। এসটিএআরটি নিয়েও কাজ করতে চাই, যেটি বন্ধ রয়েছে। এটি নির্ভর করছে ওয়াশিংটনের ওপর।’ এদিকে ইউক্রেনে আরো ৫০ কোটি ইউরোর সামরিক সহায়তা পাঠাতে যাচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। একইসঙ্গে রাশিয়ার বিরুদ্ধে চতুর্থ দফায় আরো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে তারা। ফ্রান্সের ভার্সাইতে ইইউ নেতাদের বৈঠকে এমন সিদ্ধান্ত হয়েছে। -বিবিসি, ডয়চেভেলে ও সিএনএন

ইত্তেফাক/এসজেড