দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে গতকাল শনিবার সকাল-সন্ধ্যা হরতাল সর্বাত্মকভাবে পালিত হয়েছে। উন্মুক্ত খনন পদ্ধতিতে কয়লা তোলা নিয়ে বহুজাতিক কোম্পানি এশিয়া এনার্জিকে সমীক্ষাকাজে সহায়তার নির্দেশ দিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পাঠানো চিঠি প্রত্যাহারসহ তিন দফা দাবিতে এ হরতাল পালন করা হয়।
দাবি আদায়ে আজ রোববারও হরতালের ডাক দিয়েছে তেল-গ্যাস, খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি ফুলবাড়ী শাখা। তবে খনি এলাকার অরাজনৈতিক সম্মিলিত পেশাজীবী সংগঠনের সমন্বয়ক পৌরসভার মেয়র মো. মানিক সরকার দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত হরতাল চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।
এদিকে ফুলবাড়ীতে ডাকা হরতালের সমর্থনে গতকাল বিকেলে রাজধানীতে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে গণতান্ত্রিক বাম মোর্চার উদ্যোগে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করা হয়।
হরতাল সফল করতে খনি এলাকার মানুষ গতকাল সকাল থেকে বাঁশের লাঠি হাতে নিয়ে সড়কে বিক্ষোভ শুরু করেন। রেলস্টেশন, রেলঘুমটি, ঢাকা মোড়, টিঅ্যান্ডটি মোড়, নিমতলা মোড়, ননীগোপাল মোড়, বাসস্ট্যান্ডসহ অন্তত ২০টি স্থানে সড়কের ওপর কাঠের গুঁড়ি ফেলে ও টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করা হয়। এতে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ব্যবসায়ীরা দোকানপাট বন্ধ রাখেন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে মোড়ে মোড়ে পুলিশ মোতায়েন করা হয়। দিনাজপুর থেকে ঢাকাগামী আন্তনগর দ্রুতযান এক্সপ্রেস (৭৫৮ ডাউন) ট্রেনটি সকাল নয়টা ৪৭ মিনিটে ফুলবাড়ী রেলস্টেশনে আটকে রাখা হয়। রেলস্টেশন মাস্টার সাহেদ জামান বলেন, ক্ষুব্ধ জনতা ট্রেনের কয়েকটি কামরায় ভাঙচুর চালায়। এ সময় পাশের স্টেশনগুলোতে কয়েকটি ট্রেন আটকা পড়ে।
গতকাল বিকেল পৌনে চারটার দিকে তেল-গ্যাস, খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির ফুলবাড়ী শাখা কার্যালয়ে আজও হরতাল পালনের ঘোষণা দেওয়া হয়। কমিটির আহ্বায়ক সৈয়দ সাইফুল ইসলাম বলেন, ফুলবাড়ী খনি নিয়ে ষড়যন্ত্র রুখতে এলাকার মানুষ ঐক্যবদ্ধ।
এর আগে গত শুক্রবার বিকেলে স্থানীয় নিমতলা মোড়ে জাতীয় কমিটির পক্ষ থেকে সমাবেশ ডাকা হয়। সমাবেশ বন্ধ করতে প্রশাসন শুক্রবার দুপুরে ১৪৪ ধারা জারি করে। কিন্তু বিকেল সাড়ে চারটার দিকে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে সমাবেশ করা হয়। ওই সমাবেশে তেল-গ্যাস রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্যসচিব আনু মুহামঞ্চদ শুক্রবার হরতালের ডাক দেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পাঠানো চিঠি প্রত্যাহার, ফুলবাড়ী ছয় দফা চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) দ্রুত প্রত্যাহারের দাবিতে ওই হরতাল আহ্বান করা হয়।
আন্দোলনে অংশ নেওয়া খনি এলাকার গৌরীপাড়ার গৃহবধূ জমিলা, আলেয়া ও নাসরিন বলেন, ‘জীবন দেব, তবু এখানে খনি হতে দেব না।’
তেঁতুলিয়া গ্রামের জব্বার, শমসের ও নবীর আলী বলেন, ‘এর আগেও যুদ্ধ করে ফুলবাড়ী রক্ষা করেছি, নিজের বাড়িঘর রক্ষার জন্য এবারও যুদ্ধে নেমেছি।’
আন্দোলনের নেতা ফুলবাড়ী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘এশিয়া এনার্জির লাঠিয়াল বাহিনী হিসেবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কাজ করছে। ষড়যন্ত্র রুখতে এলাকাবাসীকে সঙ্গে নিয়ে কঠোর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।’
অরাজনৈতিক সম্মিলিত পেশাজীবী সংগঠনের সমন্বয়ক পৌরসভা মেয়র মো. মানিক সরকার বলেন, এলাকার মানুষ এখানে কয়লাখনি চায় না। এর পরও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হঠাৎ একটি চিঠি পাঠিয়ে শান্ত ফুলবাড়ীকে অশান্ত করেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চিঠি প্রত্যাহারসহ তিন দফা দাবি বাস্তবায়ন না হলে আরও কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে।
গতকাল সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে জেলা প্রশাসনের প্রতিনিধি হিসেবে অতিরিক্ত জেলা হাকিম (এডিএম) এনামুল হক, ফুলবাড়ীর ইউএনও মো. মনিরুজ্জামান ও সহকারী পুলিশ সুপার বিমান চন্দ্র কর্মকার ফুলবাড়ীতে আসেন। তাঁরা আজ রোববার দাবির বিষয়ে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে বৈঠক করার প্রস্তাব দেন। আন্দোলনের নেতারা প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠকে বসতে রাজি হয়েছেন।
বাম মোর্চার সমাবেশ: ঢাকায় বাম মোর্চার সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকির সভাপতিত্বে সমাবেশে বক্তব্য দেন বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টির সাধারণ সম্পাদক মোশরেফা মিশু, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট লীগের সাধারণ সম্পাদক মোশাররফ হোসেন প্রমুখ।
বক্তারা বলেন, ফুলবাড়ীর হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে জানিয়ে দিয়েছে, উন্মুক্ত খনি সেখানে বাস্তবায়ন করতে তাঁরা দেবেন না। গণবিরোধী পাঁয়তারা বন্ধ করে অবিলম্বে ফুলবাড়ী চুক্তির সাত দফা বাস্তবায়নের আহ্বান জানান নেতারা।
