মায়ের কোলে আর ফেরা হলো না সুজনের

আপডেট : ২৬ নভেম্বর ২০১২, ১৯:৫৮
'মা, শনিবার আমি তোমার কাছে এক্কেবারে চইলা আমু, আর শ্রীমঙ্গলে যামু না। পরীক্ষা তো শেষ হইয়া গেছে।'- মাকে এমন কথা দিয়েও সেই কথা আর রাখা হলো না মো. শাহ আলম সুজনের। শ্রীমঙ্গলের জালালিয়া রোডের দক্ষিণ কলোনিতে গতকাল শনিবার সকালে পাওয়া গেছে তার মৃতদেহ। বর্ডার গার্ড উচ্চ বিদ্যালয় থেকে জেএসসি পরীক্ষা দিয়েছিল সুজন। শুক্রবার রাত অথবা শনিবার ভোরের কোনো একসময় ঘটনাটি ঘটেছে বলে এলাকাবাসীর দাবি। সুজনের মায়ের অভিযোগ, তাঁর ছেলেকে মেরে ঝুলিয়ে আত্মহত্যার কথা প্রচার করা হচ্ছে। সুজনের বাবার ভাষ্য, তিনি দরজা খুলে দেখেন লাশ ঝুলছে। গতকাল সকালে কলোনিতে গিয়ে দেখা যায়, সুজনের গলার বাম দিকে একটি ক্ষত। বেড়ার ঘরের সিলিংয়ের ওপরে বিছানার চাদর টানানো। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এলাকাবাসী বলেন, 'আত্মহত্যা হলে তো মুখ দিয়ে লালা বা জিহ্বা বের করা থাকত। এগুলো কিছুই নেই। বরং গালে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। ঘরের দরজাটিও খোলা ছিল। এমনকি পুলিশ আসার আগেই লাশ নামানো হয়েছে।' সুজনের মামা অবসরপ্রাপ্ত সেনা সার্জেন্ট এম এ বাছিত বলেন, 'ভাগনাটারে আমি নিজ হাতে লেখাপড়া শিখাইছি। সৎমা হাওয়া বেগমসহ অন্যরা মিলে পরিকল্পিতভাবে সুজনকে হত্যা করেছে।' তিনি আরো বলেন, 'যদি সে আত্মহত্যাই করে থাকত তবে পুলিশ আসার আগেই লাশ নামানো হলো কেন? গলায় ক্ষত দেখা যাচ্ছে কেন? সুজন আত্মহত্যা করার মতো ছেলে নয়।' সুজনের দাদি সাহের বানু বলেন, 'সুজন কইছে, পরীক্ষার সময় হক্কল দিন তারে ঠিকমতো ভাত খাইতে দেয় নাই। সে না খাইয়া পরীক্ষা দিবার গেছে।' খোঁজ নিয়ে আরো জানা যায়, স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করায় নানা কারণে সুজনের মা রহিমার সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ঘটে। রহিমা জানান, 'আমার সুজনরে তার বাপে জোর কইরা আমার কাছ থাইক্কা লইয়া আইছে। সুজনরে আমি মাঝে মাঝে দেখতে শ্রীমঙ্গল আইতাম। সুজনের সৎমা ও তার বাপে মিললা প্রায়ই তাকে গালাগালি ও মারামারি করত। শুক্কুরবার হের সাথে আমার শেষ কথা হইছে। সুজন আমারে কইছিল, মা, শনিবার আমি তোমার কাছে এক্কেবারে চইলা আমু, আর শ্রীমঙ্গলে যামু না। পরীক্ষা তো শেষ হইয়া গেছে।' তিনি আরো বলেন, 'আমার পুত আমার সব কিছু। বড় হইয়া লেখাপড়া হিক্কা আমারে খাওয়াইবো, আমার দুঃখ যাইবো। হায় আল্লাহ, আমার পুতেরে ওরা মাইরা ফালাইছে।' সুজনের বাবা খুরশিদ আলম ছেলের মৃত্যুর বিষয়ে বলেন, 'সকালে অনেক ডাকাডাকির পরও সুজন দরজা খুলছে না দেখে আমি ধাক্কা দিয়ে দরজা খুলে ভেতরে গিয়ে দেখি সে ঝুলে আছে। সঙ্গে সঙ্গে তাকে বাঁচানোর জন্য পাশের ঘরের কাদির মিয়াকে সঙ্গে নিয়ে তাকে নিচে নামাই। পরে দেখি সে মারা গেছে।' মইনুল ইসলাম চৌধুরী নামে এক এলাকাবাসী বলেন, 'সুজন খুবই শান্ত ও ভদ্র প্রকৃতির ছেলে ছিল। কারো সঙ্গে ঝগড়া-বিবাদে জড়াতে কখনো দেখিনি।' বর্ডার গার্ড উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নিশিকান্ত দেব বলেন, 'লেখাপড়ায় সুজনের খুব আগ্রহ ছিল। প্রতিদিন সে স্কুলে আসত।' শ্রীমঙ্গল থানার উপপরিদর্শক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, 'নিহতের গালে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। ময়নাতদন্তের জন্য লাশ মর্গে পাঠানো হয়েছে।'