বহদ্দারহাট ফ্লাইওভার নির্মাণে স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ

আপডেট : ২৯ নভেম্বর ২০১২, ১৫:৫৩
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) চেয়ারম্যান আবদুচ ছালামের উচ্চাভিলাস চট্টগ্রাম মহানগরীকে খানা-খন্দকের নগরীতে পরিণত করেছে বলে অভিজ্ঞমহলের অভিমত। নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে ফ্লাইওভারসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে অযোগ্য এবং অনভিজ্ঞ প্রকৌশলীদের। একইভাবে ফ্লাইওভারসহ নগরীর সড়ক সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ দেয়া হয়েছে অনভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠানকে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি ও নিজ পছন্দের লোকদের দিয়ে কাজ করাতে গিয়ে চট্টগ্রাম মহানগরী এখন 'অচল' নগরীতে পরিণত হয়েছে। প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে পুরকৌশল কিংবা নগর পরিকল্পনাবিদসহ কারো পরামর্শ গ্রহণ করেননি বলে চট্টগ্রামের অভিজ্ঞ পরিকল্পনাবিদগণ জানিয়েছেন। নগর পরিকল্পনাবিদগণ বলছেন, সিডিএ-এর মাস্টারপ্ল্যান ১৯৯৫-এর তোয়াক্কা না করাতে চট্টগ্রাম মহানগরী জঞ্জালের নগরীতে পরিণত হয়েছে। বার বার দুর্ঘটনায় পতিত বহদ্দারহাট ফ্লাইওভার তার একক ইচ্ছায় সিডিএ'র নিজস্ব ১০৬ কোটি টাকায় নির্মাণের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। যানজট নিরসনে ওয়াই আকৃতির ওভারপাস নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। সে অনুযায়ী ওভারপাসের ডিজাইনও সম্পন্ন হয়। ওয়াই আকৃতির ওভারপাসের একাংশের মাথা গত শনিবার যে স্থানে গার্ডার ভেঙ্গে পড়েছিল তার একটু সামনে নেমে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু হঠাৎ করে ওই ডিজাইন পরিবর্তন করে ওভারপাসের ওই মাথা আরো এগিয়ে বহদ্দারহাট এক মাইল এলাকা পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হয়। পরিবর্তিত ডিজাইনে লম্বা ১ দশমিক ৩৩ কিলোমিটার করা হয়। পূর্বের ওয়াই আকৃতির ডিজাইনের জন্য ৬৫ কোটি টাকা খরচ ধরা হলেও ফ্লাইওভারের জন্য বরাদ্দ দাঁড়ায় ১০৬ কোটি টাকা। সিডিএ'র মাস্টারপ্ল্যানে বহদ্দারহাটে ফ্লাইওভার নির্মাণের দিকনির্দেশনা না থাকলেও ফ্লাইওভার নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়। নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, ফিজিবিলিটি স্টাডি করা হলে এখানে ফ্লাইওভার নির্মাণ করা যেত না। মীর আকতার ও পারিসা নামে প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেয়া হলেও প্রথম থেকে কাজ করছে পারিসা নামক প্রতিষ্ঠান। অথচ পারিসার ইতিপূর্বে এ ধরনের বিশাল কাজ করার কোন অভিজ্ঞতা ছিল না। চিটাগাং ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটের প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক প্রকৌশলী দেলোয়ার হোসেন মজুমদার ঠিকাদার নিয়োগের পদ্ধতির ব্যাপারে আপত্তি তোলেন। তিনি বলেন, কোন কাজের জন্য কোন ধরনের টেকনিক্যাল ঠিকাদার নিয়োগ করা যাবে তা দরপত্রে নিশ্চিত করা দরকার। কারণ এ কাজে অভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠানের সাথে অনভিজ্ঞ একটি প্রতিষ্ঠান কাজ পেয়ে গেছে। বহদ্দারহাট ফ্লাইওভার নির্মাণ প্রকল্পের পরিচালক নিয়ে প্রথম থেকে সিডিএ'র আপত্তি রয়েছে অনেকের। যে প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ করা হয়েছে তিনি দুদকের একটি মামলায় চার্জশিটভুক্ত আসামি। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়েছে দুদকের চার্জশিটভুক্তদের সাময়িক বরখাস্ত করে কাজ থেকে বিরত রাখতে। দুদকের মামলায় প্রকল্প পরিচালক হাবিবুর রহমানসহ সিডিএ'র আরো ২০ জন প্রকৌশলী ও ঠিকাদার চার্জশিটভুক্ত আসামি। প্রকৌশলী সংকটের কারণে তাদের বিরুদ্ধে সিডিএ কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। ইঞ্জিনিয়ার হাবিবুর রহমানকে একই সাথে কার্পাসগোলা সড়কের ৮০ কোটি টাকার প্রকল্পেরও পরিচালক করা হয়েছে। সিডিএ-এর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাগণ জানান, মাত্র একজন উপ-সহকারী ও একজন সহকারী প্রকৌশলীকে দিয়ে কোনভাবেই ১০৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন ফ্লাইওভারের কাজ তদারকি সম্ভব নয়। এ কারণেই ঠিকাদার কিংবা কনসালটেন্ট কি করছে তা তদারকি মোটেই ছিল না। সিডিএ-এর সুপারভিশন না থাকায় ঠিকাদার ও কনসালটেন্টের প্রকৌশলীরাও সাইটে তেমন একটা যেতেন না বলে জানা যায়। আবার কাজের প্রথম থেকেই নিরাপত্তার জন্য বিকল্প সড়ক নির্মাণ এবং কাজের এলাকা ঢেকে দেয়ার কোন ব্যবস্থা ছিল না। সিডিএ-এর এক কর্মকর্তা বলেন, শুধু টাকা বাঁচানোর জন্য মানুষের নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থার দিকে নজর দেয়া হয়নি। ৯ থেকে ১৬ পিলারের গার্ডার ঝুঁকিপূর্ণ ফ্লাইওভারের ৯ থেকে ১৬নং পিলারের অসংখ্য গার্ডার এখনও ঝুঁকিপূর্ণ বলে জানা যায়। সিডিএ-এর প্রকৌশলী সূত্রে জানা যায়, গার্ডারগুলো অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। কারণ এখনো ক্রস গার্ডারের কাজ করা হয়নি। আবার ২১ ও ২২নং পিলারের মধ্যবর্তী স্থানের একটি গার্ডার বেশি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে বলে প্রকৌশলী জানান। কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন ফ্লাইওভারের কাজের গুণগতমান নিয়ে প্রকৌশলীসহ সংশ্লিষ্টদের মনে সন্দেহ দেখা দিয়েছে। শুরুতে যে সকল রড ও সিমেন্ট কোম্পানি সরবরাহ করেছে পারিসার মালিক জাহাঙ্গীর সাত্তার টিংকু মারা যাওয়ার পর তারা মালামাল সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে। আর্থিক সমস্যা এবং প্রকৃত গুণগত মানসম্পন্ন ঠিকাদার না থাকায় মালামালের মানরক্ষায়ও যত্নবান হয়নি। এতে করে ফ্লাইওভারের বিরাট অংশের কাজের নির্মাণ সামগ্রীর মান ঠিক কিনা তা এখনই পরীক্ষা করা উচিত বলে নগর পরিকল্পনাবিদগণ অভিমত ব্যক্ত করেন। তাছাড়া বিশাল আকারের গার্ডারকে সাপোর্ট দেয়ার সাটারিং দেয়া হয়েছে। তাও ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ বহু জোড়া লাগানো এবং মরিচা পড়া দুর্বল সাটারিং রাখা হয়েছে। প্রকল্পে কেউ পরিচালক হতে চাচ্ছেন না ফ্লাইওভারের বার বার দুর্ঘটনা এবং গার্ডার ভেঙ্গে পড়ায় সিডিএ-এর প্রকৌশলীদের মধ্যে আতংক ঢুকেছে। প্রকল্প পরিচালকসহ তিনজন প্রকৌশলীর বরখাস্তের প্রেক্ষিতে কেউ দায়িত্ব নিতে চাচ্ছেন না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সিনিয়র প্রকৌশলী দায়িত্ব নেয়ার ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রয়োজনে ছুটিতে চলে যাব তবু দায়িত্ব নেব না। ফ্লাইওভারে বার বার দুর্ঘটনার প্রেক্ষিতে এর মূল কারণ উদঘাটন খুবই জরুরি বলে সংশ্লিষ্টদের অভিমত। একই সাথে বার বার গার্ডার শিফটিং-এর সময় গার্ডার পড়ে যাবার বিষয়টি খতিয়ে দেখতে হবে বলে নগর পরিকল্পনাবিদগণ অভিমত দেন। বিশিষ্ট নগর পরিকল্পনাবিদ প্রকৌশলী সুভাশীষ বড়ুয়া বলেছেন, ফ্লাইওভার নির্মাণে ভৌত অবকাঠামো পরীক্ষা করা হয়নি। কারণ বহদ্দারহাটসহ নগরীর যে ৩টি স্থানে ফ্লাইওভার নির্মাণ করা হচ্ছে ভৌত অবকাঠামো পরীক্ষা করলে নির্মাণ করা যেত না। সিডিএ চেয়ারম্যানের বক্তব্য সিডিএ চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম বলেন, মাস্টারপ্ল্যানে জংশনে ফ্লাইওভার কিংবা ওভারপাস করে যানজট নিরসনের নির্দেশনা রয়েছে। ফিজিবিলিটি স্টাডির মাধ্যমে এবং সিটি কর্পোরেশনের অনুমতি নিয়েই ফ্লাইওভার নির্মাণ করা হয়েছে। তিনি বলেন, বহদ্দারহাট ফ্লাইওভার নির্মাণের জন্য যে দুটি প্রতিষ্ঠান কাজ পেয়েছে তারা প্রথম থেকেই কাজ করছে। পারিসার মালিক জাহাঙ্গীর সাত্তার টিংকু মারা গেলেও জয়েন্ট ভেঞ্চারের লিড প্রতিষ্ঠান মীর আক্তারের লোকজন কাজ করে আসছে। আবদুচ ছালাম বলেন, যেহেতু তদন্তের কাজ চলছে তাই এর বেশি কিছু বলা যাবে না।