পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির তদন্তের অগ্রগতি পর্যালোচনায় বিশ্বব্যাংকের বিশেষজ্ঞ দল আবার ঢাকায় আসছে। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন দুর্নীতি বিরোধী বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত এই দলটি আগামী ১ ডিসেম্বর ঢাকায় পেঁৗছবে বলে গতকাল বুধবার বিশ্বব্যাংক তরফে জানানো হয়েছে। দ্বিতীয় সফরে তারা দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সঙ্গে পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির তদন্ত আরম্ভের অগ্রগতি পর্যালোচনা করবে।
এদিকে সেতুর প্রকল্পটির বাস্তবায়নের কাঠামো কি হবে তা নিয়ে গতকাল ম্যানিলায় একটি প্রাথমিক আলোচনা শুরু করেছে বিশ্বব্যাংক, এডিবি ও জাইকা কর্মকর্তারা। দাতা সূত্রে জানা গেছে, এডিবি প্রধান কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে কিভাবে সেতু প্রকল্প বাস্তবায়ন করা যায় তা নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা। সূত্র আরও সুনির্দিষ্টভাবে জানায়, মূলত সেতু প্রকল্পের ক্রয় প্রক্রিয়ায় দাতাদের পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার বিষয়ে বৈঠকে আলোচনা হবে। যদি আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ দল ইতিবাচক রিপোর্ট দেয় সে ক্ষেত্রে উল্লেখিত তিন সংস্থার প্রতিনিধিরা ঢাকায় এসে এই প্রাথমিক পরিকল্পনা চূড়ান্ত করবেন। তবে সব কিছুই নির্ভর করছে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ প্যানেলে রিপোর্টের উপর। প্রসঙ্গত, এর আগে এরকম একটি বৈঠক ঢাকায় হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বিশেষজ্ঞ প্যানেল গঠন প্রক্রিয়া বিলম্বিত হওয়ায় পরে সেটি বাতিল হয়। এ বিষয় দাতাদের অন্য একটি সূত্র জানায়, পদ্মা সেতু বিষয়ে অন্ধকারে থাকায় এডিবি ও জাইকা খানিকটা ক্ষুব্ধ। এই পরিস্থিতিতে তাদেরকে সর্বশেষ অগ্রগতি সম্পর্কে জানানোর জন্য বৈঠকটির আয়োজন করা হয়েছে। বাড়তি হিসেবে নির্মাণ প্রক্রিয়া নিয়েও সেখানে কথা হবে।
আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ দল আবার ঢাকায় আসছে এই খবর দিয়ে দেয়া বিশ্বব্যাংকের বিজ্ঞপ্তিতে বাংলাদেশে নিযুক্ত বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর অ্যালেন গোল্ডস্টেইন বলেছেন, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিশেষজ্ঞ দলটি তদন্তের অগ্রগতি ও পর্যাপ্ততা সম্পর্কে প্রকল্পে অর্থায়নকারী সংস্থাগুলোকে পরামর্শ দেবে। তিনি আরও বলেছেন, "বাংলাদেশের জনগণ জানে যে, পদ্মা সেতু দক্ষিণ-পশ্চিম অংশের অর্থনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন আনবে ও দারিদ্র্র্য বিমোচন ত্বরান্বিত করবে। তারা চায় যে, সেতুটির নির্মাণ দুর্নীতিমুক্ত হোক কেননা দুর্নীতির মাধ্যমে গরীবের টাকা কেড়ে নেয়া হয়।"
গত ৫ অক্টোবর আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের নিয়ে তিন সদস্যের প্যানেল গঠনের ঘোষণা দেয় বিশ্বব্যাংক। এই দলের প্রধান আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আই সি সি) সাবেক প্রধান আইনজীবী লুই গ্যাবরিয়েল মোরেনো ওকাম্পো। প্যানেলের অন্য দুই সদস্য হলেন হংকং এর দুর্নীতি বিরোধী স্বাধীন কমিশনের সাবেক কমিশনার টিমোথি টং ও যুক্তরাজ্যের সিরিয়াস ফ্রড অফিসের সাবেক পরিচালক রিচার্ড এ্যাল্ডারম্যান। এর আগে গত ১৪ অক্টোবর বিশেষজ্ঞ দলটি প্রথমবারের মতো ঢাকা সফরে আসে। ওই সময় তারা পদ্মা সেতু প্রকল্পের দুর্নীতির বিষয়টি নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সঙ্গে একাধিক বৈঠক করে। পরবর্তীতে বিশ্বব্যাংকের ইন্টিগ্রিটি ভাইস প্রেসিডেন্ট দুদককে গত ১৩ নভেম্বর আরও তথ্য প্রদান করে। মূলত, এই তথ্যের ভিত্তিতে তদন্ত কাজ অনেক এগিয়ে যায় এবং দুদক যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তাদের দ্বিতীয়বার জিজ্ঞাসাবাদের সিদ্ধান্ত নেয়। দুদকের চেয়ারম্যান গোলাম রহমান মঙ্গলবার বলেন, পদ্মা সেতু প্রকল্পে কাজ পেতে 'ঘুষ লেনদেনের ষড়যন্ত্র' হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন এ ব্যাপারে কিছু প্রমাণ পেয়েছে। দ্রুত অভিযুক্তদের ব্যাপারে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।
উল্লেখ করা যেতে পারে, পদ্মা সেতুর অর্থায়নের বিষয়টির সাথে উর্ধ্বতন সরকারি ব্যক্তিবর্গ ও কর্মকর্তাদের দুর্নীতিতে জড়িত থাকার বিশ্বাসযোগ্য তথ্য-প্রমাণ সরকারকে একাধিকবার তুলে ধরার পরও সরকারের কাছ থেকে যথাযথ সাড়া না পাওয়ার কারণে বিশ্ব ব্যাংক পদ্মা সেতুর ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের ঋণ গত ২৯ জুন, ২০১২ তে বাতিল করে। এর পরবর্তীতে বেশকিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করায় বিশ্বব্যাংক পুনরায় সেতু প্রকল্পে সম্পৃক্ত হতে সম্মত হয়। যে যে বিষয়ে সরকারের সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের সমঝোতা হয় তার মধ্যে রয়েছে - তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রকল্পে দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত সন্দেহভাজন সকল সরকারি কর্মকর্তা ও ব্যক্তিবর্গকে সরকারি দায়িত্ব পালন থেকে ছুটি প্রদান। এই অভিযোগ তদন্তের জন্য বাংলাদেশ দুর্নীতি দমন কমিশনে একটি বিশেষ তদন্ত ও আইনি দল গঠন। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত একটি এঙ্টারনাল প্যানেলের কাছে তদন্ত সংশ্লিষ্ট সকল তথ্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করা যাতে এই প্যানেল তদন্তের ব্যাপকতা ও সুষ্ঠুতার ব্যাপারে উন্নয়ন সহযোগীদের পরামর্শ দিতে পারে। এবং বিকল্প বাস্তবায়ন পন্থা অবলম্বন যাতে বিশ্ব ব্যাংক ও উন্নয়ন সহযোগীদের ক্রয় প্রক্রিয়া আরো নিবিড় পর্যবেক্ষণ করতে পারে। এই সমঝোতার কয়েকদিন পর বিশ্বব্যাংকের তরফে দ্বিতীয় দফায় একটি বিজ্ঞপ্তিতে পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দেয়া হয়, আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ প্যানেল থেকে একটি ইতিবাচক রিপোর্ট পেলেই বিশ্বব্যাংক প্রকল্প বাস্তবায়নে অগ্রসর হবে।
