তাজরীন গার্মেন্টসের বেঁচে যাওয়া শ্রমিকদের দেয়া তথ্য ও অনুসন্ধানে পুলিশের তদন্ত কমিটি নিশ্চিত হয়েছে, অগি্নকাণ্ডের পরপর কারখানার কলাপসিবল গেইটে তালা না দিলে এতো শ্রমিকের মৃত্যু হতো না। শ্রমিকদের কারখানার ভেতরে তালা মেরে নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তি ও কর্মকর্তারা দ্রুত সটকে পড়ে। আগুন লাগার পর শ্রমিকরা বেরুতে চাইলে নিরাপত্তা কর্মীরা বলতে থাকে 'ভিতরে থাকো, আগুন লাগেনি'। এ কথা বলে তারা প্রত্যেক তলার কলাপসিবল গেইট বন্ধ করে দেয়। শ্রমিকরা, 'স্যার গেট খুলে দেন, গার্ড ভাই গেট খুলে দেন, আমাদের বাঁচতে দিন' বলে চিৎকার করলেও কেউ সাড়া দেয়নি। এক তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, তদন্তে নিরাপত্তা কর্মী ও কর্মকর্তাদের গেইট লাগিয়ে দেয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে। গার্মেন্টসের দুই কর্মকর্তা ও এক নিরাপত্তা তত্ত্বাবধানকারীকে এ ঘটনায় গতকাল বুধবার ভোরে ঢাকা ও আশুলিয়া থেকে পুলিশ গ্রেফতার করে। গতকাল এ তিনজনকে আশুলিয়া থানা পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাঁচদিনের রিমান্ডে নিয়েছে। এর আগে তাদেরকে তাজরীন গার্মেন্টসে শ্রমিককে পুড়িয়ে হত্যাসহ নাশকতা ঘটনার মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়।
তাজরীন গার্মেন্টসের মালিক একজন ঋণ খেলাপি। ওই মালিকের কাছে ব্যাংক ৩১ কোটি টাকা পাবে বলে তদন্তে বেরিয়ে এসেছে। এ ব্যাপারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহিউদ্দিন খান আলমগীর বলেন, তাজরীন গার্মেন্টসে অগি্নকাণ্ডের ঘটনা নাশকতামূলক এতে তিনি একশত ভাগ নিশ্চিত। নাশকতার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতার করা হবে বলে মন্ত্রী জানান।
তদন্ত কর্মকর্তারা ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন তাজরীন গার্মেন্টসের কর্মীদের দেয়া বিভিন্ন তথ্য পর্যালোচনা করে অগি্নকাণ্ডে কার-কি ভূমিকা ছিল তা বের করেন। আহত শ্রমিকরা দুই তদন্ত কমিটির কাছে সাক্ষ্য দেয় যে, গার্মেন্টসের নিচতলায় রাসায়নিকের গুদামে আগুনের সূত্রপাত হয়। আগুনের ধোঁয়া উপরে ও বাইরের দিকে ছেয়ে যায়। তিনতলা থেকে নয় তলা পর্যন্ত ওইদিন ১১৫৯ জন শ্রমিক কাজ করছিল। নিরাপত্তা কর্মী ছিলো ১২ জন এবং কর্মকর্তা ছিলেন সাতজন।
নিচতলায় আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গে কর্মকর্তারা গার্ডদের প্রতিতলার কলাপসিবল গেইটে তালা দেয়ার নির্দেশ দেন। নিরাপত্তা কর্মীরা নির্দেশ পালন করেন। এর ফলে ভিতরে শ্রমিকরা আটকা পড়ে। তারা বের হতে পারেনি।
আগুন পাঁচতলা পর্যন্ত ছড়ায়। আর উপরে উঠতে পারেনি। গেইট খোলা থাকলে শ্রমিকরা সিঁড়ি বেয়ে ছাদে গিয়ে জীবনরক্ষা করতে পারতেন। ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশের তদন্ত কমিটি এ বক্তব্যের সত্যতা পেয়েছেন। যে সব শ্রমিক ছাদে গিয়েছিল তাদের প্রত্যেককে দমকল বাহিনী নিরাপদে উদ্ধার করে। কি উদ্দেশ্যে শ্রমিকদের গেইটে তালা লাগিয়ে গার্ড ও কর্মকর্তারা দ্রুত সরে গেলেন। এটা নাশকতামূলকও শ্রমিকদের হত্যা করার উদ্দেশ্যে ঘটনা হয়েছে আহত শ্রমিকদের দাবি। ১২ জন গার্ড ছাড়া ঐ দিন কর্তব্যরত কর্মকর্তারা ১০ জন হলেন, প্রোডাকশন ম্যানেজার মঞ্জু, সহকারী প্রোডাকশন ম্যানেজার রানা, কোয়ালিটি ইনচার্জ দুলাল, ম্যানেজার আবদুর রাজ্জাক, প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোঃ দুলাল উদ্দিন (৩৭), স্টোর ইনচার্জ মোঃ হামিদুল ইসলাম লাবলু ও সিকিউরিটি সুপারভাইজার আল-আমিন। তাদের মধ্যে আশুলিয়া থানা ও ঢাকা জেলা গোয়েন্দা পুলিশ গতকাল ভোরে রামপুরা বনশ্রী আবাসিক এলাকার বাসা থেকে প্রশাসনিক কর্মকর্তা দুলাল উদ্দিন, উত্তর বাড্ডা হোসেন মার্কেট এলাকা থেকে মালিকের ভাগি্নর বাসা থেকে স্টোর ইনচার্জ হামিদুল ইসলাম লাবলু ও আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুর এলাকা থেকে সিকিউরিটি সুপারভাইজার আল আমিনকে গ্রেফতার করেছে। বাকি পলাতকদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে বলে পুলিশ সুপার (ঢাকা) হাবিবুর রহমান জানিয়েছেন।
তাজরীন গার্মেন্টসে নাশকতার ঘটনার অভিযোগে গ্রেফতারকৃত তিনজনকে গতকাল সকালে ঢাকা মহানগর পুলিশের মিডিয়া সেন্টারে হাজির করা হয়। সেখানে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার হাবিবুর রহমান বলেন, গ্রেফতারকৃত তিনজন কেন গেইট বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন? কি উদ্দেশ্যে ও এর পেছনে অন্য কোন চক্র জড়িত কিনা এসব বিষয়ে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। মালিক ঋণ খেলাপি থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য এ নাশকতার ঘটনা ঘটিয়েছেন কিনা এ প্রশ্নের জবাবে পুলিশ সুপার বলেন, এ বিষয়টি উড়িয়ে দেয়া যায় না। এ বিষয়ে তদন্ত চলছে বলে তিনি জানান। প্রেস ব্রিফিং-এ উপ-পুলিশ কমিশনার (মিডিয়া) উপস্থিত ছিলেন। মাত্র কয়েকদিন আগে ফায়ার সার্ভিসের উদ্যোগে তাজরীন গার্মেন্টসে অগি্নকাণ্ডে কিভাব নিজেকে রক্ষা ও আগুন নিয়ন্ত্রণ করা যায় এ সব বিষয় নিয়ে অনুশীলন করা হয়। ঐ অনুশীলনে শ্রমিক ছাড়াও তাজরীন গার্মেন্টসের মালিকসহ সব কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন। অনুশীলনে অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে আগুন লাগলে অগি্ন নির্বাপণে প্রথম গেইট খোলা রাখার বিষয়ে দমকল বাহিনী গুরুত্ব দেন। মালিক দেলোয়ার হোসেন অগি্নকাণ্ডের সময় গার্মেন্টসে রক্ষিত অগি্ননির্বাপক যন্ত্র ব্যবহার এবং গেইট খোলার পরামর্শ দেন। তাজরীন গার্মেন্টসে বিকল্প কোন সিঁড়ি নেই এবং ঝুঁকিপূর্ণ কারখানার তালিকায় ছিল।
৩ কর্মকর্তা পাঁচ ৫ দিনের রিমান্ডে :আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুরে তাজরীন ফ্যাশনস গার্মেন্টসে অগি্নকাণ্ডের মামলায় গ্রেফতার ৩ কর্মকর্তার ৫ দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। গতকাল বুধবার ঢাকার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ওয়াসিম শেখ এই আদেশ দেন। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আশুলিয়া থানার ওসি (তদন্ত) মোস্তফা কামাল প্রত্যেক আসামিকে পুলিশের হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাতদিন করে রিমান্ড আবেদন করেন।
