আগামী ডিসেম্বরেই আমদানি পণ্যের মূল্যায়নে প্রাক জাহাজীকরণ পরিদর্শন (পিএসআই) পদ্ধতি শেষ হচ্ছে। দীর্ঘ এক যুগ আগে চালু হওয়া বহুল আলোচিত সমালোচিত এ পদ্ধতির পরিবর্তে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) শুল্ক বিভাগ জানুয়ারি থেকে আমদানি পণ্যের মূল্যায়ন কাজ পরিচালনা করবে। তবে পিএসআই’র কাজটি এনবিআর সফলভাবে করতে কতটুকু সক্ষম তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন ব্যবসায়ীরা। সমপ্রতি এনবিআরের নব নিযুক্ত চেয়ারম্যান গোলাম হোসেন নিজেও চট্টগ্রামে শুল্ক বিভাগের কর্মকর্তাদের সাথে এক আলোচনায় পিএসআই পদ্ধতির শুণ্যতা পূরণ নিয়ে তার উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, পণ্যের মূল্যায়ন নিয়ে কাস্টমস কর্মকর্তাদের সবচেয়ে বেশি দ্বন্দ্ব হয়। পিএসআইয়ের পরিবর্তে বিকল্প পদ্ধতি চালুর আগে অন্তর্বর্তী সময়ে পণ্যের মূল্যায়ন কী পদ্ধতিতে হবে তা নিয়ে আমি উদ্বিগ্ন। পিএসআই পদ্ধতি উঠে গেলে পণ্যের মূল্যায়নে শুল্ক বিভাগে এসাইকুডা ওয়ার্ল্ড যুক্ত হবে। কিন্তু এই পদ্ধতির প্রস্তুতি নিয়েও তিনি পুরোপুরি অবগত নই।
আবার ব্যবসায়ীদের একটি অংশ মনে করেন, অন্যান্য দেশে পণ্যের আন্তর্জাতিক মূল্য নির্ধারণে কাস্টমস বিভাগে যে ধরনের দক্ষতা ও যোগ্যতা গড়ে উঠেছে বাংলাদেশে তা অনুপস্থিত। এ অবস্থায় এটি তুলে দিলে কাস্টমস কর্মকর্তাদের হাতে জিম্মি হয়ে পড়বেন ব্যবসায়ীরা। এতে করে তাদের ওপর হয়রানি বাড়বে।
তবে পিএসআই উঠে যাওয়া না যাওয়া নিয়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যে বিভক্তি তৈরি হয়েছে। এক সময় বেশিরভাগ ব্যবসায়ী পিএসই প্রথা উঠে যাওয়ার পক্ষে মত দিলেও বর্তমানে তাদের মধ্যে বড় আমদানিকারকরা এনবিআরের সক্ষমতা এখনো তৈরি হয়নি - এমন অজুহাতে পিএসআই প্রথা বাতিলের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। সূত্র জানায়, তবে ছোট আমদানিকারকরা এই পদ্ধতি বাতিলের পক্ষে একাট্টা। কারণ তাদের পক্ষে পণ্য মুল্য কম দেখিয়ে আমদানি করার সুযোগ কম। পিএসই চার্জ হিসেবে ১ শতাংশ দিতে হয়। আবার পিএসআই সম্পন্ন হতেও ১৫ থেকে ২০ দিন সময় লেগে যায়।
অবশ্য এনবিআরের শুল্ক বিভাগের কর্মকর্তারা মনে করছেন, পিএসআই প্রথা বাতিল হলেও আমদানি পণ্যের মূল্য পরীক্ষায় সক্ষম তারা। নাম প্রকাশ না করার শতে এনবিআরের দায়িত্বশীল একজন সদস্য ইত্তেফাককে বলেন, না বুঝে অনেকে সংশয় প্রকাশ করছেন। আবার কেউ কেউ ইচ্ছা করে আমদানিকারকদের মধ্যে একধরণের ভীতি তৈরি করছেন। কিন্তু এনবিআরের শুল্ক বিভাগ নিজেই এই কাজটি করতে সক্ষম। এটি নির্ভর করবে কমিশনার ও কর্মকর্তাদের অঙ্গীকারের উপর। ফলে আতঙ্কিত হওয়ার কোন কারণ নেই। তিনি বলেন, পণ্যের মূল্যায়ন নিয়ে অনেকে আশংকার কথা বলছেন। তবে যেহেতু ঘুরে ফিরে একই পণ্য আমদানি হয় সুতরাং মূল্যায়নের অভিজ্ঞতা কর্মকর্তাদের রয়েছে। কালে ভদ্রে হয়ত নতুন পণ্য আসে। তাতেও সমস্যা হবে না বলে মনে করেন তিনি। সূত্র জানায় বর্তমানে আমদানি পণ্যের মুল্যায়নে এসাইকুডা প্লাস প্লাস ব্যবহার হয়। পিএসআই বাতিল হলে এ ক্ষেত্রে কাস্টম বিভাগ আমদানিপণ্যের প্রকৃত মূল্য নির্ণয়ে নতুন একটি ডেটাবেইজ তৈরি করছে। এসাইকুডা ওয়ার্ল্ড নামের এই ডাটাবেইজ ব্যবহার করে পণ্যের মূল্যায়ন হওয়ার কথা।
এনবিআরের নতুন চেয়ারম্যান গোলাম হোসেন ইত্তেফাককে বলেন; আশঙ্কা আছে, তবে বিষয়টি নিয়ে আমরা কাজ করছি। ডাটাবেইজে এসাইকুডা ওয়ার্ল্ড যুক্ত হবে।
বর্তমানে যে চারটি কোম্পানি পিএসআইয়ের দায়িত্ব পালন করছে সেগুলো হচ্ছে সুইজারল্যান্ড ভিত্তিক কোম্পানি এসজিএস, ফ্রান্সভিত্তিক ব্যুরো ভেরিটাস ব্রিটিশভিত্তিক আইটিএস ও জাপানভিত্তিক কোম্পানি অমিক। প্রসঙ্গত, আমদানি করা পণ্যের পাঁচটি বিষয় নিশ্চিত করে পিএসআই কোম্পানি। এগুলো হলো পণ্যের গুণগত মান, পরিমাণ, মূল্য, এইচএস কোড (পন্য পরিচিতি কোড) ও আমদানিযোগ্যতা। এই পাঁচটি বিষয় নিশ্চিত করে পিএসআই সংস্থা সিআরএফ (ক্লিন রিপোর্ট ফাইন্ডিংস) সার্টিফিকেট ইস্যু করে থাকে। এর ভিত্তিতে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ পণ্যের শুল্কায়ন করে মালামাল খালাস করে। পিএসআই কোম্পানি যে সার্ভিস প্রদান করে তার বিপরীতে নির্ধারিত হারে চার্জ কেটে নেয়। এর পরিমাণ প্রতি চালানে আমদানি করা পণ্যের মোট মূল্যের দশমিক ৪২ থেকে ৫০ শতাংশ।
আমদানি পন্যের মূল্য কম দেখানোয় সহায়তা করা, ভুয়া ব্যাংক ডকুমেন্ট দেখিয়ে মিথ্যা ঘোষণায় পন্য আমদানি, মানহীন পন্যে সিআরএফ (ক্লিন রিপোর্ট ফাইন্ডিংস) বা প্রত্যয়নপত্র দেয়া, মিথ্যা এইচ এস কোড ব্যবহার, খাদ্য পন্যের নামে বিলাস বহুল পণ্য আমদানিতে সহায়তাসহ নানাবিধ অভিযোগ রয়েছে পিএসআই কোম্পানির বিরুদ্ধে। চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউজ গত বছর আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের অভিযোগে বিভিন্ন আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রায় ৫৫০টি মামলা দায়ের করেছে। মিথ্যা ঘোষনা ও বন্ডেড ওয়্যার হাউজ সুবিধার অপব্যবহার করায় এ ধরণের ৭৪টি প্রতিষ্ঠানকে চিহ্নিত করা হয়েছে।
