বাংলাদেশে সার্বিকভাবে পরিবেশ দূষণের কারণে মৃত্যুর সংখ্যা ক্রমবর্ধমান। বিজ্ঞান সাময়িকী ল্যানসেট বত্সর দুইয়েক আগে এক গবেষণায় বলিয়াছিল যে, ২০১৫ সালে বিশ্বব্যাপী ৯০ লক্ষ মানুষ বিভিন্ন প্রকার দূষণের শিকার হইয়া প্রাণ হারাইয়াছেন। এই দূষণ হইতে সবচাইতে বেশি মৃত্যু ঘটিয়াছে বাংলাদেশে। ইহার পর তালিকায় ছিল আফ্রিকার দেশ সোমালিয়ার নাম। এখন পর্যন্ত এই পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি হয় নাই। সম্প্রতি বৈশ্বিক বায়ুদূষণের ঝুঁকিবিষয়ক ‘দ্য স্টেট অব গ্লোবাল এয়ার ২০১৯’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ করিয়াছে ইউনিভার্সিটি অব ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার হেলথ ইফেক্ট ইনস্টিটিউট ও ইনস্টিটিউট ফর হেলথ মেট্রিকস অ্যান্ড ইভ্যালুয়েশন। তাহাতে বলা হইয়াছে, বিশ্বের যে পাঁচটি দেশের শতভাগ মানুষ দূষিত বায়ুর মধ্যে বসবাস করে, তন্মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। আর বায়ুদূষণজনিত মৃত্যুর সংখ্যার দিক হইতে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান এখন পঞ্চম। বিশ্ব জুড়িয়া বায়ুদূষণ বন্ধ করা না গেলে বর্তমান সময়ে জন্ম নেওয়া শিশুদের গড় আয়ু ২০ মাস কমিবে। ইহার আগে গত মার্চ মাসে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান এয়ারভিজ্যুয়ালের ‘বিশ্ব বাতাসের মান প্রতিবেদন ২০১৮’তে বলা হয়, বিশ্বে সর্বাধিক বায়ুদূষণের কবলে থাকা রাজধানী শহরগুলির তালিকায় ঢাকার অবস্থান দ্বিতীয়। এই শহরে বাতাসে ক্ষুদ্র বস্তুকণার (পার্টিকুলেট ম্যাটার বা পিএম ২.৫) পরিমাণ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বাঁধিয়া দেওয়া মাত্রার চাইতে প্রায় ১০ গুণ বেশি।
প্রকৃতপক্ষে উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশে দূষণের ক্ষেত্রে সবচাইতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলিতেছে বায়ুদূষণ। দূষণজনিত মৃত্যুর দুই-তৃতীয়াংশের পিছনে রহিয়াছে এই প্রকার দূষণ। দূষণ বিভিন্ন প্রকার, যেমন— বায়ু, পানি, জ্বালানি, স্যানিটেশনসহ পরিবেশ দূষণ ইত্যাদি। তবে ইহার মধ্যে বায়ুদূষণে মৃত্যুর হার বেশি হইলেও এই ব্যাপারে আমাদের সচেতনতা এখনও কম। এই প্রকার দূষণের প্রধান দুইটি উপাদান হইল শিল্পকারখানার বর্জ্য ও যানবাহনের ধোঁয়া। নন-কমপ্লায়েন্স শিল্প ও অপর্যাপ্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কারণে বিশেষত শহরের বাতাস দূষিত হইতেছে অধিক হারে। বাতাসে থাকা রাস্তাঘাট ও নির্মাণাধীন বিভিন্ন স্থাপনার ধুলিকণা, সালফার ডাইঅক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইড, হাইড্রোকার্বন, কার্বন মনোঅক্সাইড, সিসা ও অ্যামোনিয়া বাতাস দূষণের জন্য বহুলাংশে দায়ী। ইটভাটার ধোঁয়া এই ধরনের দূষণের আরেকটি বড় কারণ। এই বায়ুদূষণ শিশুর বুদ্ধিমত্তা বিকাশ ও স্নায়ুর মারাত্মক ক্ষতিসাধন করিতেছে। গর্ভবতী মহিলাদের গর্ভপাত ও মৃত শিশু প্রসবের ঝুঁকি বৃদ্ধি করিতেছে। ইহার কারণে অসংক্রামক রোগ যেমন— হূদরোগ, স্ট্রোক ও ফুসফুসের ক্যান্সার বাড়িতেছে। গবেষণায় দেখা গিয়াছে, এইরূপ দূষণের সহিত দারিদ্র্য, অস্বাস্থ্য ও সামাজিক অবিচারের বিষয়গুলিও অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত।
পরিবেশ দূষণ ও পরিবেশ সংরক্ষণ বর্তমান সময়ের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। শিক্ষা-দীক্ষা বৃদ্ধির কারণে এই ব্যাপারে আমাদের সচেতনতা বাড়িলেও এখনো তাহা কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে উন্নীত হয় নাই। অতএব, শুধু বায়ুদূষণ নহে, সব ধরনের দূষণের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সরকারের সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া উচিত। এইজন্য পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের যথাযথ প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বিশেষ করিয়া বায়ুদূষণ প্রতিরোধে নিয়মিত পানি ছিটানো ও ইহার পূর্বাভাস দেওয়ার ব্যাপারে আমাদের সক্রিয় হইতে হইবে।
