খরচ করা অর্থের হিসাব মেলাতে পারছে না ধনী ও দরিদ্র দেশ

আপডেট : ২৯ নভেম্বর ২০১২, ২২:৩৭
জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মেটাতে খরচ করা অর্থের হিসাব মেলাতে পারছে না ধনি ও দরিদ্র দেশগুলো। প্রায় ২৮ বিলিয়ন ডলারের গড়মিল তৈরি হয়েছে। উন্নত দেশগুলো বলছে, তারা এপর্যন্ত জলবায়ু তহবিলে ৩২ বিলিয়ন ডলার দিয়েছে। আর উন্নয়নশীল বা অনুন্নত দেশগুলো বলছে, তারা পেয়েছে মাত্র চার বিলিয়ন ডলার। গত দুদিন দোহা জলবায়ু সম্মেলনের বিভিন্ন বৈঠকে এ বিষয়টি নিয়েই আলোচনা চলেছে বেশি। সম্পূর্ণ ভিন্ন চাহিদা ও প্রয়োজন নিয়ে আলোচনা চলছে সম্মেলনে। উন্নত দেশের প্রতিনিধিরা ঐ ৩২ বিলিয়ন ডলার ছাড় করার কথা আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মেলনে জানিয়েছে। সম্পূর্ণ ভিন্ন ভিন্ন চাহিদা নিয়ে শুরু হয়েছে এই সম্মেলন। এক দেশের প্রয়োজন আর অন্য দেশের টিকে থাকার দাবি। এই দুইয়ের দর কষাকষির শেষে নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত হবে এই আশা সকলের। পৃথিবীকে দীর্ঘদিন বাসযোগ্য রাখার প্রত্যয় আর দর কষাকষির মধ্য দিয়ে সোমবার কাতারের দোহার কাতার ন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারে (কিউএনসিসি) আনুষ্ঠানিকভাবে এ সম্মেলন শুরু হয়। গতকাল শেষ হয়েছে চতুর্থ দিন। চলবে আগামী ৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত। জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলনের এই ১৮তম আসরে ১৯৫টি দেশের প্রায় ১৭ হাজার প্রতিনিধি যোগ দিয়েছেন। দ্বিতীয় মেয়াদে কিউটো প্রটোকলের মেয়াদ বাড়ানো আর কার্বন কমানোই এবারের সম্মেলনের প্রধান লক্ষ্য। উন্নয়নশীল দেশগুলো বলছে, উন্নতদেশগুলো কার্বন কমাতে তাদের প্রতিশ্রুতির বেশিরভাগ কথা রাখেনি। বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের সমন্বয়কারী ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ড. খলিকুজ্জমান আহমেদ বলেন, কার্বন নি:সরণ যদি কমানো না যায় তাহলে সবুজায়ন সম্ভব নয়। কিন্তু এ বিষয়ে উন্নত বিশ্বের কার্যকর কোন পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। ১০০ বিলিয়ন ডলারের সহায়তার যে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে তা যদি পূরণ হয় এবং এই অর্থের বড় একটি অংশ যদি সবুজায়নে খরচ হয় তা হলেও কোন লাভ হবে না। যদি শিল্প উন্নত দেশগুলো কার্বন না কমায়। এদিকে সম্মেলনে কার্বন নির্গমণ নিয়ন্ত্রণে রাখার একমাত্র আইনগত চুক্তি কিয়োটো প্রটোকল-এর মেয়াদ দ্বিতীয়বার বাড়ানোর জন্য গতকালও দাবি তুলেন অনুন্নত রাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা। উল্লে¬খ্য চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বর এর মেয়াদ শেষ হচ্ছে। অর্থায়ন নিয়ে মতবিরোধের মধ্যেও ভবিষ্যত জলবায়ু অর্থায়নকারী নতুন সংস্থা গ্রীন ক্লাইমেট ফান্ডের ব্যাপারে কিছুটা অগ্রগতি হয়েছে। শেষ পর্যন্ত নানামুখী দর কষাকষির এ সংস্থার সদর দফতর দক্ষিণ কোরিয়ায় নির্ধারণ করা হয়েছে। আর এ তহবিলের অর্থ সংগ্রহ ও ব্যবহারের রূপরেখা প্রণয়নের জন্য একটি কনটাক্ট গ্রুপ গঠন করা হয়েছে। এ গ্রুপ অর্থায়ন কিভাবে হবে এবং কিভাবে প্রকল্প ব্যবহারের মাধ্যমে অর্থ খরচ করা হবে তার একটি পরিকল্পনা করে কনফারেন্স অব দি প্যার্টিও (কপ) কাছে উপস্থাপন করবে। একইভাবে দীর্ঘমেয়াদী অর্থায়নের ব্যাপারেও অগ্রগতি হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদী অর্থায়নের আওতায় উন্নত দেশগুলো ২০১৩ সাল থেকে ২০২০ সাল নাগাদ একশ’ বিলিয়ন ডলার দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু এ তহবিল কখন থেকে কিভাবে দেয়া হবে তা সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ নেই। তাই কিভাবে এ অর্থ পরিচালনা হবে সে ব্যাপারেও একটি কনটাক্ট গ্রুপ গঠন করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ নেগোসিয়েশন দলের প্রতিনিধি ড. আনসারুল করিম বলেন, এই কনটাক্ট গ্রুপ গঠনের ব্যাপারে বাংলাদেশকে হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে। দীর্ঘ মেয়াদী অর্থায়নের ব্যাপারে শেষ পর্যন্ত অগ্রগতি হওয়ায় বাংলাদেশ এই প্রক্রিয়াকে স্বাগত জানিয়েছে। বৃহস্পতিবার অক্সফাম আয়োজিত এক সেমিনারে প্রতিশ্রুত পুরো অর্থ ছাড় করা হবে বলে জানিয়েছে উন্নত দেশের প্রতিনিধিরা এবং উন্নয়নশীল দেশের পক্ষ থেকে তা ঠিক নয় বলে জানানো হয়েছে। সেমিনারে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও জার্মানির সরকারি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিরা বলেন, আমরা কার্বন নি:সরণের ব্যাপারে কাজ করছি। এই কাজ অব্যাহত থাকবে। জলবায়ু তহবিল গঠনে আমরা সোচ্চার। অন্যদের সাথে আমরাও ২০২০ সালের মধ্যে ১০০ বিলিয়ন ডলার জলবায়ু তহবিল গঠনে আগ্রহী। এর মধ্যে ৩২ বিলিয়ন ডলার দেয়া হয়েছে। অনুষ্ঠানে উন্নয়শীল দেশগুলোর পক্ষে ঘানা, জাম্বিয়া ও আফ্রিকান গ্রুপের পক্ষ থেকে বলা হয়, সমুদ্রের পানির উচ্চতা বাড়ছে। এতে উপকূলে নানা সমস্যা তৈরি হয়েছে। খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়েছে। এসব মোকাবেলায় দীর্ঘমেয়াদে আমাদের অর্থায়ন দরকার। ৪৭টি গাছ বাঁচলো এবারের সম্মেলনে কোন কাগজ ব্যবহার করা হচ্ছে না। প্রায় সকল কাজই হচ্ছে ইন্টারনেটের মাধ্যমে। দৈনিক প্রবন্ধ উপস্থাপন, দৈনিক কর্মসূচি ঘোষণা, তথ্য বিনিময়সহ সকল কিছুই চলছে ইন্টারনেট অথবা পেন ড্রাইভের মধ্যেমে। আয়োজকরা বলছেন, এসব কাজে কাগজ ব্যবহার না করার ফলে ডারবান সম্মেলন থেকে এবার গড়ে ৯৬ শতাংশ কম কাগজ প্রয়োজন হচ্ছে। সম্মেলনে যে পরিমাণ কাগজ ব্যবহার হত তা না করার ফলে বড় আকারের প্রায় ৪৭টি গাছ কাটার প্রয়োজন হয়নি। অর্থাত্ ৪৭টি গাছ কাটলে যে পরিমাণ কাগজ লাগতো সেই পরিমাণ কাগজ বেঁচেছে। আগামী বছর বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন হচ্ছে পোল্যান্ডে। এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হয়েছে।