লালবাগ কেল্লা ও ৪৩ খাল ব্যক্তির নামে রেকর্ড

আপডেট : ২৯ নভেম্বর ২০১২, ২২:৪১
মহানগরীর ৪৩ খালসহ ঐতিহাসিক নিদর্শন লালবাগের কেল্লা এখন ব্যক্তি মালিকানায় চলে গেছে। নওয়াব শায়েস্তা খাঁর উত্তরাধিকারীদের কাছ থেকে বৃটিশ সরকার লালবাগের এই কেল্লা কিনে নিয়েছিল। তখন থেকেই মালিকানাসূত্রে এটি সরকারিভাবে সংরক্ষণ করা হয়। ১৯৯৫-৯৬ সালে পরিচালিত মহানগর জরিপকালে এই কেল্লা ও আলোচ্য খালের বিভিন্ন অংশ অথবা পুরোটাসহ দুই হাজার ৮০০ একর সরকারি জমি ব্যক্তি মালিকানায় রেকর্ড করে দেয়া হয়েছে। ভূমি মন্ত্রণালয়ের গঠিত দুটি তদন্ত কমিটির রিপোর্টে এ তথ্য প্রকাশ পেয়েছে। এখন এই জরিপ বাতিলের সুপারিশ করেছে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বাধীন গঠিত জাতীয় টাস্কফোর্স। তবে সরকার এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। ভূমি প্রতিমন্ত্রী মুস্তাফিজুর রহমান ফিজার ইত্তেফাককে বলেন, তদন্ত প্রতিবেদন ও সুপারিশ পর্যালোচনা করা হচ্ছে। এই জরিপের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব কর্মকর্তা ও কর্মচারীর বিরুদ্ধে কি ধরনের ব্যবস্থা নেয়া যায় তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। মহানগর জরিপ শুধু ত্রুটিপূর্ণ নয়, এটি এখন জনহয়রানিমূলক হয়েছে। সবকিছুই সরকার খতিয়ে দেখছে। প্রতিবেদনের সুপারিশে বলা হয়েছে, মহানগর জরিপ এতটাই ত্রুটিপূর্ণ যে, শুধু সরকারি জমি ব্যক্তির নামে নয়, একের জমি অন্যের নামেও রেকর্ড করে দেয়ার অসংখ্য ঘটনা রয়েছে। ফলে এসব ঘটনায় ল্যাণ্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালে সংক্ষুব্ধ ৯ হাজার ৫৯০টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। তাই নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে গঠিত আন্ত:মন্ত্রণালয় টাস্কফোর্স মহানগর জরিপ বাতিল করতে সুপারিশ করছে। একইসঙ্গে মহানগর জরিপের সময় এসব অন্যায় কাজে জড়িত সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতেও ভূমি মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করা হয়েছে। এদিকে সার্বিক বিষয়ে আইনি উদ্যোগ বিষয়ে করণীয় এবং প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করতে ভূমিমন্ত্রী রেজাউল করিম হীরা গত ২১ নভেম্বর এটর্নি জেনারেলকে অনানুষ্ঠানিক চিঠি দিয়েছেন। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ২০১০ সালে মহানগর জরিপ রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়। এতে দেখা যায়, বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, বালু ও তুরাগ নদীসহ মহানগরের পার্শ্ববর্তী নদীর নাব্যতা, গতিপ্রবাহ স্বাভাবিক রাখা ও পানি নিষ্কাশনের জন্য প্রয়োজনীয় ৪৩টি খাল ব্যক্তিমালিকানায় রেকর্ড হয়েছে। ইতিমধ্যে ল্যাণ্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালে মহানগর জরিপের বিরুদ্ধে দায়ের করা ৯ হাজারের বেশি মামলা প্রমাণ করে যে, ওই জরিপ অস্বচ্ছ এবং ত্রুটিপূর্ণ ছিল। এতে জনস্বার্থ উপেক্ষিত হওয়ার পাশাপাশি সরকারি জমিও বেহাত হয়েছে। অধিক মামলা-মোকদ্দমায় জড়িয়ে জনসাধারণ হয়রানির শিকার হচ্ছেন। ইতিমধ্যে ভূমি মন্ত্রণালয় এসব অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে গঠিত টাস্কফোর্সের সুপারিশ অনুযায়ী মহানগর জরিপ বাতিল করার বিষয়ে ভূমি মন্ত্রণালয় চিন্তাভাবনা করছে। বুড়িগঙ্গা, তুরাগ ও বালুসহ ঢাকার চারপাশের নদ-নদীর অবৈধ দখলদার মুক্ত করা ও নাব্যতা ঠিক করার বিষয়টিও ঝুলে গেছে। এসব নদ-নদীর পুরোটাই বা অংশবিশেষ ব্যক্তির নামে রেকর্ড করে দেয়ায় অনেকে মালিকানা দাবি করে মামলা-মোকদ্দমায় সামিল হচ্ছেন। ফলে উচ্ছেদ অভিযান অনেকক্ষেত্রেই বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। যদিও ইতিপূর্বে হাইকোর্টের নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে সরকার এসব নদী দখল করে গড়ে উঠা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের কার্যক্রম গ্রহণ করে। ইতিমধ্যে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ জেলা প্রশাসন, বিআইডব্লিউটিএ আলাদাভাবে অভিযান চালিয়ে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে। ভূমি মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেছেন, যেসব মামলা-মোকদ্দমা হচ্ছে সেসব বিষয়ে এটর্নি জেনারেলের মাধ্যমে হাইকোর্টের নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে। হাইকোর্টের পরবর্তী নির্দেশনা পেলে তারা কার্যক্রম শুরু করবেন। মহানগর জরিপ সম্পূর্ণ বাতিল করার ক্ষেত্রে সরকারের অনেক অর্থের বিষয় জড়িত রয়েছে। তবে যেসব সরকারি জমি ব্যক্তির নামে রেকর্ড হয়েছে সেগুলো কিভাবে সরকারের হাতে ফিরিয়ে নেয়া যায় সেই প্রক্রিয়া নির্ণয়ের কাজ চলছে। একইসঙ্গে সার্ভে ট্রাইব্যুনালে দায়ের করা ব্যক্তি শ্রেণীর মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির মাধ্যমে হয়রানির হাত থেকে জনগণকে রক্ষার উদ্যোগ নেয়া হবে। কল্যাণপুরের তিনটি খালের অংশবিশেষ, হাজারীবাগ খালের পুরোটাই, শুভাড্যা খাল, মীরপুর খালসহ মহানগরীর অভ্যন্তরের পানি নিষ্কাশনের ৪৩টি খালের পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক করতে গত চার বছরে নানা উদ্যোগ নেয়া হলেও এখনো পুরোপুরি এসব খাল স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরে পায়নি। মামলা ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে অবৈধ উচ্ছেদ অভিযান বাধাগ্রস্ত হওয়ায় এসব উদ্যোগ পুরোপুরি কার্যকর করা যাচ্ছে না বলে এ প্রক্রিয়ায় জড়িত সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।