১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর মিত্রবাহিনী ছাড়াই দেশের একমাত্র জেলা সিরাজগঞ্জ শত্রু মুক্ত হয়। জেলার মুক্তিযোদ্ধাদের যারা এক কাতারে সংগঠিত করেছিলেন তাদের মধ্যে প্রয়াত আব্দুল মোমিন তালুকদার, মোতাহার হোসেন তালুকদার, সৈয়দ হায়দার আলী, অ্যাডভোকেট দবিরউদ্দিন, শহিদুল ইসলাম তালুকদার, আনোয়ার হোসেন রতু প্রমুখের নাম করা যেতে পারে। তত্কালীন মহকুমা প্রশাসক শহীদ শামসুদ্দিনও মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করতে অনন্য ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭১ সালে ডিসেম্বরে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মুক্তিযোদ্ধাদের সকল গ্রুপের সমন্বয় সাধনের জন্য আমির হোসেন ভুলকে সর্বাধিনায়ক এবং আব্দুল লতিফ মির্জাকে সহ-সর্বাধিনায়ক নিযুক্ত এবং প্রশাসনিক শৃংখলা ফিরিয়ে আনয়নে দত্তবাড়ীর ইসমাইল হোসেনকে (বর্তমানে আমেরিকা প্রবাসী) মহকুমা প্রশাসকের দায়িত্ব প্রদান করা হয়।
মুক্তিযোদ্ধারা কেমন আছেন: জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে যারা ছিনিয়ে এনেছেন স্বাধীন পতাকা, সেই মুক্তিযোদ্ধাদের অনেকেই খেদোক্তি করে ইত্তেফাককে বললেন, মৃত্যুর পর রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফনের কোন প্রয়োজন নেই- এখন আমরা একমুঠো ডাল ভাত চাই, চাই আমাদের বেঁচে থাকার চিকিত্সা। শুধু তাই নয় আজও অনেক মুক্তিযোদ্ধা অভাবের যন্ত্রণায় কাঁদে, কেউবা বিনা চিকিত্সায় মৃত্যুর দোরগোড়ায়, অধিকাংশ মুক্তিযোদ্ধা আজ বয়সের ভারে ন্যুব্জ হলেও বেঁচে থাকার পথপ্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছেন। রায়পুর গ্রামের সেকান্দার আলী। ২ ছেলে ৩ মেয়ে নিয়ে তার সংসার। তিনি নিজেই এখন শয্যাশায়ী। সংসারের এখন করুণ হাল। অর্ধাহারে-অনাহারে দিন কাটছে তার। সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার গয়লা গ্রামের মজিবুর রহমান পাগু। ইটভাটার শ্রমিক ছিলেন। এখন তিনি খুবই অসুস্থ। ৫ ছেলে ২ মেয়ে নিয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন। মুক্তিযোদ্ধা আজহার আলী এখন রিকশা চালিয়ে কোনমতে বেঁচে আছেন। নিজের কোন ঠিকানা নেই তাই বর্তমানে ১ ছেলে নিয়ে শহরের রেলকলোনিতে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। সিরাজগঞ্জ ফুলকোচা গ্রামের শাহজাহান আলী ভ্যান চালিয়ে কষ্টে সংসার চালাচ্ছেন। শিয়ালকোল ইউনিয়নের শারটিয়া গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা সুজাবত আলী এখন ভ্যান চালিয়ে কষ্টে সংসার পরিচালনা করছেন।
বাগবাটি গণহত্যা: ১৯৭১ সালের ৩১ মে ভোর ৫টায় হানাদার বাহিনী সিরাজগঞ্জের বাগবাটি গ্রাম ঘেরাও করে শত-শত নারী-পুরুষকে নির্বিচারে হত্যা করে। সেই সকল শহীদদের ৩৭ জনের নাম ঠিকানা তৈরি ও বধ্যভূমি চিহ্নিত করা হয়। হরিণা গোপাল মৌজা জে এল নং-৩৩ দাগ নং সাবেক ৪৭, খতিয়ান নং এসএ-৯৫ জমির পরিমাণ-২ শতক। এই স্থানটিতে সারিবদ্ধ ভাবে ৩৭ জনের লাশ রাখা হয়েছিল বলে চিহ্নিত করা হয়।
সিরাজগঞ্জ শহর থেকে ১৫ কিঃ মিঃ উত্তর-পশ্চিমে সদর থানার বাগবাটি গ্রাম। জানা যায়, এই গণহত্যার আগের দিনে ১৯৭১ সালের ৩০ মে ঘোড়াচড়া স্কুল মাঠে রাজাকার শান্তি বাহিনীর এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এই বৈঠক থেকে বাগবাটি, হরিণা গোপাল ও উত্তর আলোকদিয়া গ্রামে ৫ শতাধিক মুক্তিকামী নিরীহ মানুষকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। পরিকল্পনা মোতাবেক স্থানীয় রাজাকারদের সহায়তায় পাকিস্তানী সেনারা বাগবাটি, আলোকদিয়া ও হরিণা গোপাল গ্রাম ঘেরাও করে ঘুমন্ত মানুষের উপর নির্বিচারে গুলি চালিয়ে গণহত্যা করে। বিশেষ করে হানাদারদের ভয়ে পার্শ্ববর্তী জেলা বগুড়া, শেরপুর, চান্দাইকোনা, রায়গঞ্জ, তাড়াশ ও সিরাজগঞ্জ শহর থেকে অসংখ্য নারী-পুরুষ ঐ গ্রামটিতে আশ্রয় নেন। এদের অধিকাংশই ছিলেন হিন্দু সমপ্রদায়ের ও স্বর্ণ ব্যবসায়ী। এমন শতাধিক পরিবারের অনেককেই নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। যুবতী নারীদের উপর যে অমানবিক পৈশাচিকতা চালানো হয়। জানা গেছে প্রায় ১০/১২ জন যুবতীকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়।
সলঙ্গা গণহত্যা: ১৯৭১ সালের ২৫ এপ্রিল হানাদার পাকিস্তানী বাহিনী সলঙ্গায় এদিনটিতে চালায় বর্বর গণহত্যা। পাকবাহিনীর সৈন্যরা একযোগে ব্রাশ ফায়ারে সলঙ্গায় হত্যা করে প্রায় ২ শতাধিক মুক্তিকামী ও নিরীহ মানুষকে। সিরাজগঞ্জের সলঙ্গা থানার মধ্যপাড়া চড়িয়া, পাটধারী, কালিবাড়ী, শিকার মগড়াপাড়া, চড়িয়া শিকার দক্ষিণপাড়া, গোলকপুর, কাচিয়ায় সংঘটিত হয়েছিল এ গণহত্যাযজ্ঞ।
পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর একটি দল সৈয়দপুর হতে ঢাকা যাওয়ার সময় বর্তমান উত্তরবঙ্গ মহাসড়কে পথে ব্যারিকেড পেয়ে গ্রামের মধ্যে ঢুকে পড়ে। তখন গ্রামের নিরীহ মানুষ ঘুমিয়ে ছিল। তারা সূর্যোদয়ের আগে গুলি চালাতে শুরু করে এবং একটানা সকাল ৯ টা পর্যন্ত গুলি চালায় নিরীহ মানুষের উপর। ভস্মীভূত করে দেয় এলাকার ঘরবাড়ি। পশুদের হাত থেকে রেহাই পায়নি কোলের শিশু পর্যন্ত। পাকিস্তানী হায়েনাদের হাত থেকে বেঁচে যাওয়া চড়িয়া মধ্যগ্রামের আবুল কালাম (কাঙ্গাল মণ্ডল) জানান, ঐ দিন সকালে পাক-বাহিনী আব্দুল মজিদের পুকুরের পাশে, ইয়ার আলীর পুকুরের পাশে লোকজনদের সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে গুলি চালায়। ঘটনাস্থলেই ৩৫ জনের মৃত্যু হয়। ভাগ্যের জোরে তিনি ৩টি গুলি খেয়েও বেঁচে যান।
সম্মুখযুদ্ধে নিহত ৭১: মুক্তিযুদ্ধে সিরাজগঞ্জের ৭১ জন মুক্তিযোদ্ধা নিহত হন। এরা হলেন— সদর উপজেলার আহসান হাবিব কালু, আবুল কালাম আজাদ, আব্দুস সোবহান রতন, শাহেদ আলী, সুলতান মাহমুদ, মকবুল হোসেন কালু, ছফর আলী, আব্দুল আজিজ, শুকুর মাহমুদ, সেরাজুল বারী। কাজিপুরের রবিলাল দাস, সোহরাব হোসেন, আব্দুর রাজ্জাক, চাঁন মিয়া, মজিদ সরকার, শাহজামাল, সুজাবত আলী, সোহরাব আলী, আব্দুস সামাদ, সোলেমান হোসেন, দিলশাদ, ইজ্জত আলী, জমসের আলী, রায়গঞ্জের আহমদ হোসেন, তাড়াশের ইয়ার মোহাম্মদ, মতিয়ার রহমান, মাহাতাব উদ্দিন, হীরালাল গোস্বামী, মহাদেব চন্দ সাহা, দীনেশ চন্দ সাহা, শচীন্দ নাথ ঘোষ, আব্দুর রহমান, মোক্তার হোসেন, ওসমান গনি, উল্লাপাড়া’র নেফাজ আলী, হোসেন আলী, হায়দার আলী, বিরু ভূষণ সিংহ, ইমদাদুল হক, হাবিলদার মেছের আলী, জামালউদ্দিন, ধীরেন্দ নাথ সুত্রধর, জয়দেব সাহা, কে.এম. হামিদ, ওমর আলী, নূরুল ইসলাম, তোজাম্মেল হক, শাহাজাদপুরের জিলুর রহমান (বিঃবিঃ), নূরুল ইসলাম, তোজাম্মেল হক, আমিরুল ইসলাম, চৌহালী উপজেলার ওয়ারেস আলী, শাহজাহান আলী, হরমুজ আলী, মিয়া শাজাহান আলী, ফজলুল হক, বেলকুচি উপজেলার শাহাজাহান, গোলাম সরোয়ার, নজরুল ইসলাম,বাহাদুর আলী, তোফাজ্জল হোসেন, আবু বকর, মোফাজ্জল হোসেন, বদরুদ্দোজা, কামারখন্দের সিপাহী ওয়াজেদ আলী, আব্দুস সাত্তার, ইয়াকুব আলী, সুরত্জ্জামান ও সোলায়মান হোসেন।
