১৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে বাঙালি জাতি স্বাধীনতা অর্জনের মাধ্যমে তার অস্তিত্বের ঠিকানা খুেঁজ পেয়েছিল। ২০০ বছরের বৃটিশ শাসনের নাগপাশ থেকে মুক্ত হয়ে পাকিস্তানী পাঞ্জাবিদের কড়াল গ্রাসে বাঙালিরা যখন বিপর্যস্ত—ঠিক তখনই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহবানে জেগে ওঠে এদেশের ছাত্র-জনতা, পেশাজীবী আর মেহনতি মানুষ। তারপর নয় মাসের সশস্ত্র সংগ্রাম-ত্রিশ লাখ মানুষের আত্মদান, চার লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে এসেছিল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ।
১৯৭১ সালে ১৬ই ডিসেম্বর সকালে সরকারি কাজে আমি বাইরে গিয়েছিলাম। ফিরে এসে শুনলাম, জরুরি মন্ত্রী পরিষদ সভায় সিদ্ধান্ত নিয়েছে-যেহেতু কর্নেল (অব.) এমএজি ওসমানী তাঁর নির্বাচনী এলাকা সিলেট গিয়েছেন এবং তাঁর সাথে কোনক্রমেই যোগাযোগ করা সম্ভব হচ্ছে না, সেহেতু মুক্তিযুদ্ধের ডেপুটি চিফ অব কমান্ড হিসেবে আমাকে ঢাকায় অনুষ্ঠিত পাকিস্তানী বাহিনীর আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকার এবং মুক্তিবাহিনীর পক্ষে প্রতিনিধিত্ব করতে হবে। এদিকে দম দম বিমান বন্দরে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ অপেক্ষা করছেন। সময়ক্ষেপণ না করে যে পোশাকে সকালে বের হয়েছিলাম সেই পোশাকেই আমি জেনারেল নূরুল ইসলাম শিশু ও ফ্লাইট লেফটেনেন্ট আলি রেজাকে সঙ্গে নিয়ে দম দম বিমান বন্দরে উপস্থিত হলাম। দেখলাম টারমার্কে একটি বিমান দাঁড়িয়ে আছে। আমি জেনারেল নূরুল ইসলাম শিশু ও ফ্লাইট লেফটেনেন্ট আলি রেজাকে বিদায় দিয়ে বিমানের দুই-তিনটি সিঁড়ি বেয়ে উঠেছি-এমন সময় লক্ষ্য করলাম বিমানের দিকে ভারতীয় সেনাবাহিনীর একটি জিপ আসছে। জিপটি বিমানের নিকটে এসে দাঁড়ালো। আমি সিঁড়িতে দাঁড়িয়েই দেখলাম জিপ থেকে ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রধান লেফটেনেন্ট জেনারেল জগজিত্ সিং অরোরা এবং মিসেস অরোরা নামছেন। আমি সিঁড়ি থেকে নিচে নেমে এসে তাঁদের বিমানে ওঠার জন্য পাশে দাঁড়ালাম। এ সময় জেনারেল অরোরা মৃদু হেসে আমার কাছে এসে আমার কাঁধে হাত রেখে বললেন, তুমি মুক্তিবাহিনীর কমান্ডার, কাজেই তুমিই আগে উঠবে, আমি তোমার পরে উঠব। সেই থেকে আজো সেই মহান মানুষটির মহানুভব ভদ্রতার কথা খুবই মনে পড়ে। যুদ্ধকালীন সময়ে, অনেক সময় যুদ্ধ কৌশল, প্রশিক্ষণ, যুদ্ধ-পরিকল্পনা বিষয় নিয়ে যতবার তাঁর সাথে কথা বলেছি, তিনি অত্যন্ত বিচক্ষণতা এবং বুদ্ধি দীপ্ততার সাথে উত্তর দিয়েছেন। তাই আজো তাঁর কথা খুব বেশি মনে পড়ে। বিমানের মধ্যে দেখলাম ভারতীয় সেনাবাহিনী, বিমান বাহিনী, নৌ-বাহিনী এবং ভারতীয় ইস্টার্ন কমান্ডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ আমাদের জন্য অপেক্ষা করছেন। আমরা দম দম বিমান বন্দর থেকে আগরতলা বিমান বন্দরে এসে দেখলাম বেশ কয়েকটি আর্মি হেলিকপ্টার দাঁড়িয়ে আছে। দম দম বিমান বন্দর থেকে আগরতলা বিমান বন্দরে আসার কারণ হলো; তখন তেজগাঁও বিমান বন্দরের রানওয়ে এমনভাবে বিধস্ত ছিল যে, কোন বিমানই সেখান থেকে ওঠা-নামা করতে পারতো না। এরপর আমরা হেলিকপ্টারে করে তেজগাঁও হেলিপ্যাডে এসে উপস্থিত হলাম। আমাদের তেজগাঁও বিমান বন্দরে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর লেফটেনেন্ট জেনারেল আমির খান নিয়াজি, পাকিস্তানী আরো বেশ কিছু সংখ্যক অফিসার, মিত্রবাহিনীর কর্মকর্তাবৃন্দ, মেজর হায়দার অভ্যর্থনা জানালেন। আমরা কয়েকটি জিপযোগে রমনা ময়দানের উদ্দেশে রওনা হলাম। ইতিমধ্যে সাধারণ মানুষ জেনে গিয়েছিল—যুদ্ধ শেষ—পাকিস্তানী বাহিনী আত্মসমর্পণ করবে। তাই ঢাকার আশপাশের গ্রামগঞ্জ থেকে হাজার হাজার মানুষ ঢাকার রাজপথে জড়ো হয়েছিল। উত্ফুল্ল জনতা ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ শ্লোগানে শ্লোগানে মুখরিত করেছিল রাজপথ। তাদের মুখে ছিল হাসি। বুকের বেদনা ভুলে গিয়ে স্বাধীনতার জয়গানে উদ্বেল হয়েছিল তারা। রাজপথ, বাড়ির আঙ্গিনা, ভবনের ছাদে ছাদে ছিল নারী-পুরুষের ভিড়। বাংলাদেশের মানচিত্র খঁচিত নতুন পতাকা সবার হাতে পত্ পত্ করে উড়ছিল। ‘জয় বাংলা, জনতার জয়’ শ্লোগানে শ্লোগানে কম্পমান ছিল ঢাকার মাটি।
এমনি পরিস্থিতিতে ভিড় ঠেলে আমরা উপস্থিত হলাম রমনা ময়দানের সেই নির্দিষ্ট জায়গায়। অনুষ্ঠানের তেমন কোন আড়ম্বর ছিল না, ছিল না কোন বিশেষ আয়োজন। মাত্র দুটি চেয়ার আর একটি টেবিল। মানুষের ভিড়ে অতিথিবর্গের দাঁড়িয়ে থাকাটা কঠিন ছিল। আমি ও ভারতীয় নৌ-বাহিনীর প্রধান রিয়ার এডমিরাল নন্দী,এয়ার মার্শাল দেওয়ান পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ছিলাম, আর পাশেই ছিলেন লেফটেনেন্ট জেনারেল এফ আর জ্যাকোব। জনতার চাপে সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা কঠিন হয়ে পড়ছিল। আত্মসমর্পণের দলিল নিয়ে আসা হলো। প্রথমে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলের প্রধান লেফটেনেন্ট জেনারেল আমির খান নিয়াজি এবং পরে ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রধান লেফটেনেন্ট জেনারেল জগজিত্ সিং অরোরা স্বাক্ষর করলেন। স্বাক্ষর শেষ হলে উভয়েই উঠে দাঁড়ালেন। স্বাক্ষরিত আত্মসমর্পণের দলিল লেফটেনেন্ট জেনারেল আমির খান নিয়াজি, লেফটেনেন্ট জেনারেল জগজিত্ সিং অরোরার হাতে তুলে দিলেন। তারপর আত্মসমর্পণের রীতি অনুযায়ী লেফটেনেন্ট জেনারেল আমির খান নিয়াজি নিজের রিভলবারটি কাঁপা কাঁপা হাতে অত্যন্ত বিষণ্নতার সাথে জেনারেল জগজিত্ সিং অরোরার হাতে তুলে দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে মিত্র বাহিনী এবং মুক্তিবাহিনীর সদস্যরা পাকিস্তানী বাহিনীর সেনা সদস্যদের ঘেরাও করে নিরাপদ স্থানে নিয়ে গেলেন। কারণ ফুঁসে ওঠা মানুষ যে কোন মুহূর্তে কোন অঘটন ঘটাতে পারে-তাই জেনেভা কনভেনশনের আত্মসমর্পণের রীতি অনুযায়ী আত্মসমর্পণকারীদের নিরাপত্তা প্রদান করা প্রধান কর্তব্য।
এ সময় অসংখ্য মানুষ আমাকে আলিঙ্গন করেছিল। তাঁরা কেঁদে কেঁদে বলছিল, আজ আমরা স্বাধীন, আজ বড় শান্তিতে ঘুমাতে পারবো। তারপর আমরা প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়ে জিপে চড়ে বসলাম। লাখো মানুষের ঢলে যেন ঢাকা প্লাবিত। বিজয়ের আনন্দে মানুষ আত্মহারা। ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ শ্লোগানে শ্লোগানে মুখরিত রমনা, শাহবাগ, ফার্মগেটসহ সমগ্র ঢাকা। আমরা সবাই বিজয়ের পরিতৃপ্তি নিয়ে তেজগাঁও, আগরতলা হয়ে আবার কলকাতা ফিরে এলাম। কলকাতা ফিরে গিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন সাহেবকে সবকিছু অবহিত করলাম।
লেখক: বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের উপ-প্রধান সেনাপতি ও এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.)
