চট্টগ্রাম নগরীর বহদ্দারহাট ফ্লাইওভারের ভবিষ্যত্ নিয়ে অনিশ্চয়তার আশংকা দেখা দিয়েছে। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী নুরুল হুদার নেতৃত্বে ৪ সদস্যের টেকনিক্যাল কমিটি ফ্লাইওভারটির কারিগরি ত্রুটি দেখতে বর্তমানে চট্টগ্রামে অবস্থান করছেন। গতকাল শুক্রবার তারা দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। ফ্লাইওভারের কাজের তদারকির জন্য প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব নিতে কেউ রাজি হচ্ছে না। ফৌজদারি মামলা ও তদন্ত কমিটিসমূহের তদন্তের কারণে ঠিকাদার ও প্রকল্পের উপদেষ্টারাও আত্মগোপনে রয়েছেন।
ফ্লাইওভারের প্রশাসনিক কাজের মনিটরিং-এর দায়িত্বে রয়েছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। ১ দশমিক ৩৩ কিলোমিটার দীর্ঘ ফ্লাইওভারের অনেকগুলো গার্ডার এখনও বিপজ্জনক অবস্থায় রয়েছে। বারবার গার্ডার ধসে পড়ায় পুরো প্রকল্পে আরো অনেক ত্রুটি রয়েছে বলে স্বয়ং সিডিএ’র অনেক প্রকৌশলীর ধারণা। কারণ ফ্লাইওভার নির্মাণে প্রথম থেকেই এর গুণগত মান ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ঠিকাদার, উপদেষ্টা ও সিডিএ উদাসীন ছিল। তাছাড়া মূল ঠিকাদার পারিসার মালিক জাহাঙ্গীর সাত্তার টিংকুর মৃত্যুর পর এর কাজ কে এতোদিন চালিয়েছিল তা নিয়েও ধূম্রজাল সৃষ্টি হয়েছে। পারিসার পক্ষে আগে যারা কাজ করেছিল তারা এখন কাজ করছে না বলে জানায়।
আবার সিডিএর চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম বলেছেন, মীর আকতার ও পারিসার যৌথ ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের লিডিং ফার্ম মীর আকতারকে সব কিছুর দায়-দায়িত্ব নিতে হবে। কিন্তু জানা যায়, টিংকু মীর আকতার কনস্ট্রাকশন ফার্মের অভিজ্ঞতা দেখিয়ে কাজ নিলেও তিনি পারিসার মাধ্যমে প্রথম থেকে কাজ করেন।
রাজউক চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে আসা চার সদস্যের কমিটি গার্ডারগুলোর শক্তি পরীক্ষা করবেন বলে জানা যায়। প্রকৌশলী নুরুল হুদা বিভিন্ন ড্রয়িং, ডিজাইন, ফিল্ড টেস্টসহ সকল কাগজপত্র চেয়েছেন। তিনি আজ শনিবারও চট্টগ্রামে অবস্থান করবেন বলে জানা যায়। কারণ কাজের গুণগত মান নিয়ে নগর পরিকল্পনাবিদদের অনেকেই সন্দেহ পোষণ করেছেন। জানা যায়, ফ্লাইওভারের গুণগত মান ও নিরাপত্তার বিষয়ের চেয়ে কাজটি দ্রুত সম্পন্ন করার জন্য তাড়াহুড়া বেশি ছিল।
বর্তমান ফ্লাইওভার দুর্ঘটনার তদন্তে পূর্ত মন্ত্রণালয় কর্তৃক অতিরিক্ত সচিব শ্যামসুন্দর শিকদারের নেতৃত্বে ৫ সদস্যের কমিটি জেলা প্রশাসক কর্তৃক অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব)-এর নেতৃত্বে ৫ সদস্যের কমিটি, সিডিএ কর্তৃক প্রধান প্রকৌশলীর নেতৃত্বে ৪ সদস্যের কমিটি এবং রাজউক চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে ৪ সদস্যের টেকনিক্যাল কমিটি কাজ করছে।
নগর পরিকল্পনাবিদদের অনেকে বলেছেন, ফ্লাইওভারটির কাজ এগিয়ে নেয়ার আগে বিশেষজ্ঞদের মতামত গ্রহণ করে এর ত্রুটি বিচ্যুতি সংশোধন করা দরকার। কারণ প্রকল্পটি আবার ঝুঁকির মধ্যে ফেলা উচিত নয়। সিডিএর সংশ্লিষ্ট এক প্রকৌশলী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, মূল ঠিকাদারের মৃত্যুর পর প্রকল্পের জন্য নতুন অভিজ্ঞ ঠিকাদার না নেয়ায় বারবার দুর্ঘটনা ঘটছে। সিডিএ’র তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এবং ফ্লাইওভার প্রকল্পের সুপারভাইজিং কর্মকর্তা কাজী হাসান বিন শামসের মতে, সেনাবাহিনীকে দিয়ে বাকি কাজটা করা গেলে এর নিরাপত্তা ও গুণগত মান রক্ষা হবে।
জানা যায়, সিডিএর পক্ষ থেকে নতুন প্রকল্প পরিচালক হিসেবে কাজী হাসান বিন শামসকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। কিন্তু তিনি জানান, বর্তমান নাজুক পরিস্থিতিতে অন্যের দায়-দায়িত্ব নেয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়। তিনি কর্তৃপক্ষকেও তা জানিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমার সিনিয়রিটি ও যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হয়নি। যাদেরকে পূর্বে যোগ্য মনে করা হয়েছিল তাদের এ কাজের দায়িত্ব দেয়া হউক।’
জানা যায়, ফ্লাইওভার নির্মাণ কাজে অভিজ্ঞ ও দক্ষ কোন প্রকৌশলী সিডিএ-তে নেই। অপরদিকে সিডিএ-তে থাকা তত্ত্বাবধায়ক ও নির্বাহী প্রকৌশলিগণ বর্তমান পরিস্থিতিতে দায়িত্ব নিতে রাজি হচ্ছেন না। তাছাড়া সিডিএর প্রকৌশলীদের মধ্যে দ্বন্দ্বের কারণে চেইন অব কমান্ডও নেই বলে অনেকে মন্তব্য করেছেন।
