অনেক অর্জনের ম্যাচ। যে ম্যাচে সাকিববিহীন বাংলাদেশকে বড়ই অচেনা লেগেছে। ওয়েস্ট ইন্ডিজকে এত সহজভাবে ৭ উইকেটে হারিয়েছে তারা! প্রতিপক্ষকে পুরো ছয় ঘন্টা কোন সুযোগই দেয়নি মুশফিকরা। এমন দাপুটে ক্রিকেটের কথা রূপকথায় হতে পারে কিন্তু বাস্তবে বিরল। সেই বিরল কাজটিই করে দেখাল বাংলাদেশিরা। পাঁচ ম্যাচ ওয়ানডে সিরিজের প্রথম ম্যাচটি বাংলাদেশের। অভিষেক টেস্টের পর ওয়ানডে ম্যাচেও সোহাগ গাজীর দুর্দান্ত পারফর্মেন্সে ক্যারিবিয়রা ১৯৯ রানে গুটিয়ে যায়। ৫৮ বল বাকি থাকতে তিন উইকেট খরচে বাংলাদেশ জয় পায়।
সাকিবের ইনজুরি দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়লেও নির্বাচক কমিটিকে প্রশংসাই দিতে হবে। তারা সাতজন পুরানো খেলোয়াড়ের সাথে অভিষেক করিয়েছেন চারজনকে (আবুল, গাজী, মোমিনুল ও বিজয়)। আইসিসির নতুন নিয়মের সাথে যখন দুই দলই অচেনা তখন বোমা ফাটালেন বাংলাদেশি স্পিনাররা। স্পিনাররা তছনছ করে দিয়েছেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের ব্যাটিং দুর্গকে। লেন্ডল সিমন্স, ক্রিস গেইল, মারলন স্যামুয়েলস, ড্যারেন ব্রাভো, কিয়েরন পোলার্ড- বাংলাদেশিদের সামনে দেয়াল হয়ে দাঁড়াতে চাইলেও সেটি দেননি গাজী, রাজ্জাক ও রিয়াদরা। মিরপুরে অভিষেক টেস্টে এক ইনিংসে ছয় উইকেটসহ ম্যাচে নয় উইকেট নিয়েছিলেন গাজী। অভিষেকে বাজিমাত করে অফ-স্পিনার হিসেবে নতুন করে নিজেকে চিনিয়েছিলেন পটুয়াখালীর এই ছেলে। কাল সিমিত ওভারের ম্যাচেও নিজেকে সবার থেকে আলাদা করে রাখলেন। গেইলকে লংঅনে তামিমের তালুবন্দি করার মধ্য দিয়ে নিজের ছন্দের শুরু হয় গাজীর। শেষ করেছেন সুনীল নারিনকে এলবিডব্লিউ করার মধ্য দিয়ে। মাঝখানে স্যামুয়েলসকে স্লিপে এবং থোমাসকে লংঅনে আউট করেছেন তিনি। অভিষেক ম্যাচে যে কোন বাংলাদেশি হিসেবে গাজীর রেকর্ড এটি। এর আগে এই হট সিটে বসেছিলেন পেসার রুবেল হোসেন। ২০০৯ সালে ঢাকায় শ্রীলংকার বিপক্ষে ৩৩ রানে চার উইকেট নিয়ে রুবেল ঠাঁই পেয়েছিলেন অভিষেকে বাজিমাত করার তালিকায়। কাল ২৯ রানে চার উইকেট নিয়ে ম্যাচ সেরা গাজী রুবেলের জায়গায় এলেন।
গতকাল শুক্রবার খুলনার শেখ আবু নাসের স্টেডিয়ামে টসে জিতে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ব্যাট করতে গেলে তাদের ড্রেসিংরুমে ভর করছিল দুশ্চিন্তা। ৩০ অক্টোবর থেকে আইসিসির নতুন নিয়ম ঘোষণার পর এই দুই দলের এটিই প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ। কি সেই নতুন নিয়ম! তা জানে না দুই দলই। তাই পুরো ম্যাচজুড়েই দুশ্চিন্তা ছিল উভয়ের। যে উইকেটে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ব্যাটিং লাইনআপে বিধ্বস্ত হয়ে ১৯৯ রানে গুটিয়ে গেছে, সেই উইকেটে বাংলাদেশ জয় পেয়েছে ৫৮ বল বাকি থাকতে। এটি সম্ভব হয়েছে ওপেনিং জুটিতে দুর্দান্ত শুরুর কারণে। তামিম ও অভিষেক ম্যাচ খেলা এনামুল হক বিজয় ইনিংসের শুরুতে এতটা আলো ছড়িয়ে দিয়েছিলেন যে ম্যাচে কখনো মনে হয়নি বাংলাদেশ হারতে পারে। ১৫ ওভারের মধ্যে এই জুটি ৮৮ রান তুলে ফেলে। তবে দুর্ভাগ্য তামিমের। নারিনের বলটি পোলার্ডের মাথার উপর দিয়ে মারতে গিয়ে ক্যাচ দিয়ে ফিরেন এই ওপেনার (৫৮)। ড্রেসিংরুমে ফিরে গেছেন ঠিকই তবে তার অর্জন হয়েছে দুটি। প্রথমত ওয়ানডে ম্যাচে এটি তার পঞ্চম ফিফটি, দ্বিতীয়ত যে কোন বাংলাদেশি হিসেবে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক তালিকার দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছেন তিনি। কাল মোহাম্মদ আশরাফুলকে (৩৩৯৭) টপকে তামিম দ্বিতীয় স্থানে (৩৪২৬) চলে আসেন। তার উপরে রয়েছে একমাত্র সাকিব, যার সংগ্রহ ৩৬৩৫।
অনেক দিন ধরে তামিমের যোগ্য সঙ্গী পাচ্ছিলেন না চাটগাঁওয়ের এই ছেলে। ইমরুল কায়েস, জুনায়েদ সিদ্দিকি, আশরাফুল, জহুরুল ইসলাম, নাঈমের পর কাল এনামুল ওপেনিংয়ে নেমেছেন। একটু পরীক্ষিত হলেও এক্ষেত্রে নির্বাচকদের সিদ্ধান্তই যথার্থ হয়েছে। ৬২ বলে ৪১ রান করে বিদায় নিলেও দলকে ভরসা দিয়ে গেছেন তিনি। অনূর্ধ্ব-১৯ দলের হয়ে দুটি বিশ্বকাপ খেলেছেন এই ব্যাটসম্যান। পাকিস্তান ও শ্রীলংকার বিপক্ষে দুটি সেঞ্চুরিও রয়েছে তার। ঘরোয়া ক্রিকেটেও আটটি ইনিংসে দুটি সেঞ্চুরি তার। ঘরোয়া ক্রিকেটে এতসব অর্জনই তাকে জায়গা করে দিয়েছে জাতীয় দলে।
দুই অভিষেক খেলোয়াড়ের গড়া কীর্তির পর অবশ্য নিজেদের মেলে ধরার সুযোগ হয়নি মোমিনুল ও আবুল হোসেনের। বল হাতে আবুল সাফল্য পাননি আর ব্যাট করার সুযোগ হয়নি মোমিনুলের। কারণ এর আগে নাঈম (৫০*) ও নাসির (২৮) খেলা শেষ করে ফেলেন।
ঢাকার পর খুলনা। এশিয়া কাপের অনুপ্রেরণা খুঁজতে চাইছিল বাংলাদেশ। হতাশ করেনি সেই অনুপ্রেরণা। ফাইনালে পাকিস্তানের কাছে মাত্র ২ রানে হারার পরও বাংলাদেশের পারফর্মেন্স ছিল অসাধারণ। সেই অসাধারণ ক্রিকেটেই কাল ওয়েস্ট ইন্ডিজকে কাঁদিয়েছে তারা। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে পঞ্চম এবং নিজেদের মাটিতে দ্বিতীয় জয় এটি। পরিসংখ্যান এখানেই শেষ নয়, ২৬৩তম ওয়ানডে ম্যাচে ৭৩তম জয় এটি। অর্জনের খাতা আরো আছে। এখনো চারটি ম্যাচ রয়েছে বাংলাদেশের। রূপকথার ক্রিকেট যদি বাস্তব হয়, তাহলে ওয়ানডে সিরিজ নিয়েও নতুন করে স্বপ্ন দেখতে পারে মুশফিকরা। আগামীকাল সেই স্বপ্নের দ্বিতীয় ম্যাচ একই ভেন্যুতে।
রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলীয় নেত্রীর অভিনন্দন
আন্তর্জাতিক ম্যাচে ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলের বিরুদ্ধে জয়লাভ করায় বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের সকল সদস্য ও কর্মকর্তাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
বাসস জানায়, রাষ্ট্রপতি গতকাল এক অভিনন্দন বার্তায় বাংলাদেশের জনগণের জন্য সাফল্য ও বিজয় ছিনিয়ে আনায় ক্রিকেটারদের ধন্যবাদ জানান। রাষ্ট্রপতি আশা প্রকাশ করেন, ক্রিকেটার এবং সংশ্লিষ্ট সকল কর্মকর্তা কঠোর পরিশ্রম অব্যাহত রাখবেন এবং ভবিষ্যতে দেশের জন্য আরও সাফল্য বয়ে আনবেন।
বিশেষ প্রতিনিধি জানান, গতকাল শুক্রবার খুলনায় ওয়ানডে ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেটের প্রথমদিন ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ৭ উইকেটে পরাজিত করায় তিনি বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের সকল খেলোয়াড়, কোচ ও ন্যাশনাল টিমের কর্মকর্তা এবং বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) কর্মকর্তাদের ধন্যবাদ ও অভিনন্দন জানান।
প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ জানান, শেখ হাসিনা গতকাল টেলিভিশনে বাংলাদেশ ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের মধ্যকার ওয়ানডে ম্যাচ দেখেন। তিনি টাইগারদের বিজয় দেখে বিসিবির সভাপতি নাজমুল হাসান পাপনের সাথে মোবাইল ফোনে কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী তার মাধ্যমে বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্রিকেট টিমের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অভিনন্দন জানান। এ সময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের খেলোয়াড়দের টিম চেতনা ও খেলা দেখে সমগ্র জাতি গর্বিত। বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের এই বিজয়ের ধারা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
খুলনায় শেখ আবু নাসের স্টেডিয়ামে পাঁচ ম্যাচের প্রথম ম্যাচে গতকাল বাংলাদেশ ৭ উইকেটে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে পরাজিত করেছে।
খালেদা জিয়ার অভিনন্দন
ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ৭ উইকেটে হারিয়ে দেয়ায় বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে অভিনন্দন জানিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। এক বিবৃতিতে খেলোয়াড়দের উত্তরোত্তর সফলতা কামনা করে তিনি বলেন, ভবিষ্যতেও টাইগাররা এ ধরনের সফলতা ধরে রাখতে সক্ষম হবে।
বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে জেপির অভিনন্দন
বাংলাদেশ ক্রিকেট দল ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ৭ উইকেটে জয় পাওয়ায় দলের সকল খেলোয়াড়, অধিনায়ক, কোচ ও কর্মকর্তাকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন জাতীয় পার্টি-জেপির মহাসচিব ও সাবেক মন্ত্রী শেখ শহীদুল ইসলাম। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘এই সিরিজ জয়ের লক্ষ্যে জয় অব্যাহত রাখার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ক্রিকেট দল বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আরো উজ্জ্বল করতে সক্ষম হবে’।
ক্রীড়ামন্ত্রীর অভিনন্দন
পাঁচ ম্যাচ ওয়ানডে সিরিজের প্রথম ম্যাচে বাংলাদেশ দল ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ৭ উইকেটে হারানোয় যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আহাদ আলী সরকার জাতীয় দলের সকল খেলোয়াড়, কোচ, কর্মকর্তা ও বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড এবং জনগণকে আন্তরিক অভিনন্দন জানিয়েছেন।
স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের অভিনন্দন
বাংলাদেশ দল ম্যাচ জেতায় অভিনন্দন জানিয়েছেন জাতীয় সংসদের স্পিকার আব্দুল হামিদ অ্যাডভোকেট এবং ডেপুটি স্পিকার শওকত আলী।
