দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্র সৈকত কুয়াকাটা। বলা হয়ে থাকে সাগরকন্যা খ্যাত এই কুয়াকাটা দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র সৈকত যেখান থেকে সূর্যোদয়, সূর্যাস্ত—দুটোই দেখা যায়। কিন্তু সাগরের ভাঙনের মুখে ক্রমেই ছোট হয়ে আসছে এ সৈকতের পরিধি। শ্রীহীন হয়ে পড়ছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের অপরূপ এই লীলাভূমি। সৈকতের নারিকেলকুঞ্জ, ঝাউ বাগান, তাল বাগানসহ পর্যটন স্পটগুলোর অধিকাংশ এরই মধ্যে বিলীন হয়ে গেছে সাগরের পেটে। ভাঙ্গনের কবলে সাগর পাড়ে গড়ে তোলা ইকোপার্কটিও এখন হুমকির মুখে। গত বর্ষা মৌসুমে সাগরের ভাঙনে বেলাভূমির প্রশস্ততা কমেছে প্রায় ১০০ ফুট। আর স্থানীয় বিভিন্ন সূত্রের মতে, গত ৩০ বছরের ভাঙনে সৈকতের প্রশস্ততা কমেছে প্রায় দুই কিলোমিটার। ভাঙনজনিত কারণে স্থানীয় জীব বৈচিত্র্যও হুমকির মুখে পড়েছে।
২০১০ সালে কুয়াকাটায় পর্যটন শিল্প বিকাশে এবং অবকাঠামো উন্নয়নে একটি মাস্টারপ্লান তৈরির কাজ শুরু হলেও এখনও তা চূড়ান্ত হয়নি। বিস্তীর্ণ সবুজ অঞ্চল সমুদ্রের বুকে হারিয়ে গেলেও বড় ধরনের কোনো পদক্ষেপ এখনও সরকারি বা বেসরকারিভাবে গৃহীত হয়নি। এ নিয়ে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যেও হতাশা এবং ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। খুব দ্রুত সৈকত রক্ষায় বড় ধরনের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন না হলে কুয়াকাটা সৈকত এক সময় পুরোপুরি বিলীন হওয়ার আশংকা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়া উপজেলার লতাচাপলী ইউনিয়নের একাংশ জুড়ে কুয়াকাটার অবস্থান। সমুদ্র সৈকতের তিন দিকে বঙ্গোপসাগর এবং উত্তরে খাপড়াভাঙ্গা ইউনিয়ন। সড়ক পথে পটুয়াখালী জেলা সদর থেকে কুয়াকাটার দূরত্ব প্রায় ৭১ কিলোমিটার, বিভাগীয় শহর বরিশাল থেকে ১০৯ কিলোমিটার।
রাখাইনদের আগমনের মধ্য দিয়ে জনবসতি শুরু
ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, মুঘলদের দ্বারা আরাকান দখলের পর ১৭৮৪ সালে প্রায় দেড়শ’ রাখাইন পরিবার বিতাড়িত হয়ে বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিয়ে নৌকাযোগে প্রথমে রাঙ্গাবালী দ্বীপে ও পরে তাদের একটি দল জঙ্গলাকীর্ণ সাগর সৈকত কুয়াকাটায় এসে পৌছায়। সেই থেকেই কুয়াকাটায় মানুষের বসবাস শুরু বলে ধারণা করা হয়। স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২ সালে কুয়াকাটাকে পর্যটন কেন্দ্র হিসাবে গড়ে তোলার প্রথম উদ্যোগ নেয়া হয়। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে ঐ উদ্যোগ পরে ভেস্তে যায়। পরবর্তী সময়ে শুধুই চলে প্রস্তাব আর প্রতিশ্রুতির পালা। ১৯৯৭ সালে কুয়াকাটাকে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পুনরায় উদ্যোগ নেয়া হয়। কিন্তু সেই উদ্যোগ এখনও শতভাগ বাস্তবায়িত হয়নি। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের জন্য গত তিন দশক ধরে এ সৈকতে পর্যটকদের ভিড় ক্রমেই বাড়ছে। কিন্তু সৈকতের আয়তন ছোট হয়ে আসতে থাকায় পর্যটকদের মধ্যেও হতাশা বাড়ছে।
ভাঙছে সাগর, কমছে প্রশস্ততা
পটুয়াখালী জেলা প্রশাসন এবং কুয়াকাটা পৌরসভার সংশ্লিষ্ট নথিপত্রে ১৮ কিলোমিটার দীর্ঘ সৈকতের প্রশস্ততা তিন থেকে সাড়ে তিন কিলোমিটার উল্লেখ করা হলেও বর্তমানে তা আর নেই। সাগরগর্ভে হারিয়ে গেছে সৈকতের ফয়েজ মিয়ার সারি সারি নারকেল বাগান, ঝাউ, তাল, সেগুন বাগান, সৈকত সংলগ্ন সওজ, পাউবো ও জেলা পরিষদের ডাকবাংলোসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা। স্থানীয় প্রবীণ ব্যক্তি এবং প্রশাসনের সাথে জড়িত পুরনো লোকদের মতে, গত তিন দশক ধরে কুয়াকাটা সৈকতের অন্তত দুই কিলোমিটার প্রশস্ততা কমেছে। বলেশ্বর ও পায়রা নদীর স্রোত সরাসরি কুয়াকাটার পশ্চিমাংশে আঘাত করায় সৈকতের বালু সাগরে ধুয়ে যাচ্ছে। কুয়াকাটার জিরো পয়েন্টের কাছে সৈকতের প্রশস্ততা আধা কিলোমিটারের বেশি হবে না। গোটা সৈকতের প্রশস্ততা বর্তমানে গড়পড়তায় এক কিলোমিটারের বেশি হবে না।
এ প্রসঙ্গে স্থানীয় লতাচাপলী ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও বর্তমান কুয়াকাটার পৌরসভার কাউন্সিলর মোঃ আবদুল বারেক মোল্লা ইত্তেফাককে বলেন, গত ৩০ বছরে ভাঙ্গনের কবলে কুয়াকাটা সৈকতের প্রশস্ততা প্রায় দুই কিলোমিটার কমেছে। বলেশ্বর ও পায়রা নদীর স্রোত সরাসরি কুয়াকাটার পশ্চিমাংশে আঘাত করে। ফলে সৈকতের বালু সাগরে ধুয়ে যাচ্ছে। গভীর পাইলিং বা পাথর ফেলে ভাঙ্গন রক্ষায় অবিলম্বে ব্যবস্থা নেয়া না হলে অদূর ভবিষ্যতে শুধু কুয়াকাটা নয়, পুরো লতাচাপলী ইউনিয়ন সাগরে বিলীন হয়ে যাবে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড কলাপাড়ার নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ শফিউদ্দিন বলেন, সমুদ্র সৈকত কুয়াকাটাকে পর্যটন এলাকা হিসাবে তেমন আলাদা কোন নজর দেয়া হয়নি কোন আমলেই। গত ১০ বছরে ভাঙ্গনের কবলে কমপক্ষে আধা কিলোমিটার সৈকত সমুদ্র গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। কুয়াকাটার পশ্চিমে খাজুরা এলাকার ভাঙ্গন রক্ষায় ১৫শ মিটার বেড়িবাঁধ নির্মাণ প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। এবারে ঐ এলাকায় ১ কোটি টাকা ব্যয়ে ৬শ মিটার বেড়িবাঁধ নির্মাণের জন্য কার্যাদেশ দেয়া হয়েছে। বাকি ৯শ মিটার বাঁধের জন্য আরো ১৮ কোটি টাকা বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। একাজ সম্পন্ন কুয়াকাটার পশ্চিমাংশ রক্ষা পাবে। অপর্যাপ্ত অর্থের কারণে কুয়াকাটার ভাঙ্গন রোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব হচ্ছে না।
শ্রীহীন হচ্ছে সৈকত
সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, সাগরের উপরপৃষ্ঠ বেড়ে কুয়াকাটা সৈকতের আয়তন একদিকে যেমনি কমছে অন্যদিকে দুর্যোগজনিত কারণে সৈকতে ছড়িয়ে রয়েছে ধ্বংসের চিহ্ন। সিডর ও আইলা এ সৈকতে স্থায়ী ধ্বংসের চিহ্ন একে দিয়েছে। জিরো পয়েন্ট থেকে পূর্ব দিকে বিস্তৃত অঞ্চলজুড়ে কেবলই ধ্বংসের চিহ্ন। সৈকতে উপড়ে পড়ে আছে বহু নারকেল গাছ। নারকেল বাগান লাগোয়া বনের কড়ই, জাম, রেইন ট্রিসহ অন্যান্য গাছও উপড়ে পড়ছে। সৈকতে পড়ে থাকা গাছগুলোর উপরের অংশ কেটে নেয়া হলেও গোড়ার অংশ পড়ে রয়েছে। ফলে সৌন্দর্য নষ্ট হচ্ছে সৈকতের। দর্শনার্থী ও পর্যটকদের স্বাভাবিক চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
সৈকতের বুক চিরে খাল
জিরো পয়েন্টের পশ্চিম দিকের সৈকতের পলি সরে যাচ্ছে। সৈকতের কোনো কোনো স্থানের বালু সরে গিয়ে কাদা মাটি বেরিয়ে পড়েছে। সাগরের জোয়ারের তীব্রতায় ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছে সৈকত। সৈকতের বুক চিরে তৈরি হচ্ছে অপ্রশস্ত স্রোতধারা। আবার কয়েকটি স্থানে তৈরি হয়েছে ছোট খাল। ফলে সৈকতে পর্যটকদের চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। আবার স্থানীয় জনগণের একটি অংশ এ ক্ষুদ্র খাল পাড়ি দিতে পর্যটকদের কাছ থেকে যেভাবে পারছেন অর্থ আদায় করছেন।
এ প্রসঙ্গে নদী ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞ মোমিনুল হক সরকার বলেন, কুয়াকাটার এ অঞ্চলটা যেভাবে ভাঙছে, সেভাবে পলি পড়ে গড়ছে না। কুয়াকাটা সৈকত সমুদ্রের ভাঙনের কবলে পড়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সাগর শাসন ব্যবস্থা শক্তিশালী না করলে কুয়াকাটার অস্তিত্ব সংকটে পড়বে।
তিন বছরেও চূড়ান্ত হয়নি মাস্টারপ্লান
কুয়াকাটায় পর্যটন শিল্প বিকাশে উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠন, অবকাঠামো উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে দীর্ঘ মেয়াদী ‘মাস্টারপ্লান’ বা ‘মহাপরিকল্পনা’ গ্রহণ করেছে সরকার। ২০১০ সালে বাংলাদেশ পর্যটন করর্পোরেশন কুয়াকাটা মাস্টারপ্লান করতে ১০ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে। ঐ বছরই কুয়াকাটার পর্যটন এলাকার মাস্টারপ্লান তৈরির পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হিসেবে শেলটেক কনসালটেন্ট প্রাইভেট লিমিটেডকে নিয়োগ দেয়া হয়। কিন্তু মাস্টারপ্লানটি এখনও চূড়ান্ত হয়নি। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় অনুমোদনও করেনি।
এ প্রসঙ্গে কলাপাড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সফিউদ্দিন বলেন, সৈকত রক্ষায় এখন পর্যন্ত কোনো স্থায়ী পদক্ষেপ হাতে নেওয়া হয়নি। বড় ধরনের প্রকল্প গ্রহণ করা ছাড়া এ ব্যাপারে কিছু করা যাবে না। সৈকত রক্ষায় টেকসই ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছি। মাস্টারপ্লানটি বাস্তবায়ন শুরু হলে অবস্থার উন্নতি হবে।
পটুয়াখালী জেলা প্রশাসক অমিতাভ সরকার বলেন, মাস্টারপ্লানটি তৈরি হয়েছে। মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্টদের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
ধ্বংসের শংকায় ইকোপার্ক
কুয়াকাটা সৈকতের কোলঘেঁষে গড়ে উঠা জাতীয় উদ্যান বা ইকোপার্কটিও এখন হুমকির মধ্যে। এরই মধ্যে পার্কটির এক অংশ সাগর বক্ষে বিলীন হয়ে গেছে। জিরো পয়েন্ট থেকে মাত্র দুই কিলোমিটার পূর্বে ইকোপার্কটির অবস্থান। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে সমুদ্রের ভাঙনকবলিত এই এলাকায় দুই কোটি ৯০ লাখ টাকা ব্যয়ে পার্ক প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করা হয়। বর্তমান সরকার কুয়াকাটা ইকোপার্কের নাম পরিবর্তন করে জাতীয় উদ্যান নামকরণ করে। গত কয়েক বছরে ইকোপার্ক সংলগ্ন নারকেল বাগান, ঝাউবনসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ ইতিমধ্যেই সাগর গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এ ছাড়া ঘূর্ণিঝড় সিডর ও আইলায় পার্কের ব্রিজ, পর্যটকদের বিশ্রামের স্থাপনাসহ বিভিন্ন স্থাপনা ধ্বংস হওয়ার পর এখনও সম্পূর্ণ মেরামত করা হয়নি। আবার দ্বিতীয় দফায় ইকোপার্ক মেরামত, উন্নয়ন ও সমপ্রসারণের কাজ শুরু হচ্ছে। তবে সৈকত রক্ষা না পেলে এ ইকোপার্কও রক্ষা পাবে না বলে শংকা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ প্রসঙ্গে পটুয়াখালীর বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মিহির কুমার দে বলেন, দ্বিতীয় পর্যায়ে ইকোপার্ক প্রকল্প প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে। ৫ বছর মেয়াদী ঐ প্রকল্প ১৬ কোটি টাকা ব্যায়ে সম্পন্ন করা হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে এই এলাকায় ইকো-টুরিজম সুবিধা বৃদ্ধি পাবে।
সৈকতে নিষিদ্ধ মোটর সাইকেল, হারিয়ে যাচ্ছে লাল কাকড়া
কুয়াকাটা সৈকতে মোটর সাইকেল চালনা নিষিদ্ধ করেছে স্থানীয় প্রশাসন। কিন্তু নির্দেশ পালনে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। দিন-রাত সব সময়ই সৈকতে মোটর সাইকেল চালাচ্ছেন গাইড বলে পরিচয়দানকারী স্থানীয় একটি শ্রেণী। এ অবাধে মোটর সাইকেল চালনার জন্য সৈকত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আবার ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে কুয়াকাটার অন্যতম আকর্ষণীয় লাল কাকড়া।
এ প্রসঙ্গে স্থানীয় বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম বলেন, পাঁচ বছর আগেও সৈকতে নামলে কাকড়ার জন্য ভূমি দেখা যেত না। এখন সেই সৈকতে বিচ্ছিন্নভাবে অল্প কিছু সংখ্যক লাল কাকড়া দেখা যায়। পর্যটকদের অবহেলায় ও অসচেতনতায় অনেক কাকড়া মারা যায়। আবার সৈকতে অবাধে মোটর সাইকেল চালানোর কারণে কমছে লাল কাকড়ার সংখ্যা।
সৈকত সংরক্ষণে পর্যাপ্ত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা না হলে সাগর কন্যা কুয়াকাটা সাগরের বুকেই বিলীন হয়ে যাবে বলে শংকা প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা।
