উন্নয়ন অন্বেষণের প্রতিবেদন

সরকারের অদূরদর্শিতায় ঘাটতি ও ঋণ বাড়ছে

আপডেট : ০১ ডিসেম্বর ২০১২, ২১:৩৩
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান উন্নয়ন অন্বেষণের এক অর্থনৈতিক পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সামগ্রিক আয় ও ব্যয়ের মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য তৈরি হচ্ছে। পাশাপাশি মোট দেশজ উত্পাদনে (জিডিপি) বৈদেশিক সহায়তার পরিমাণ কমছে। ফলে অর্থনীতিতে ঘাটতি ও ঋণ ক্রমশ বেড়ে চলেছে। বর্তমান অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি,প্রস্তাবিত বাজেট ও সংশোধিত বাজেটের পার্থক্য বিবেচনা করে উন্নয়ন অন্বেষণ জানিয়েছে, চলতি অর্থবছরে বাজেট ঘাটতি ৫২ হাজার ৬৮ (অনুদান ব্যতীত) কোটি টাকা প্রাক্কলন করা হয়েছে। যা সংশোধিত বাজেটে বৃদ্ধি পেয়ে ৫৩ হাজার ৩৬২ কোটি টাকা হতে পারে। বাজেট ঘাটতি বেড়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে উন্নয়ন অন্বেষণ বলছে, বিদ্যুত্ খাতে ভর্তুকির পরিমাণ বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক সহায়তার সরবরাহ প্রত্যাশা অনুযায়ী হয়নি। তাই ঘাটতি বেড়ে চলছে এবং ঘাটতি মোকাবেলায় বাড়ছে ঋণের পরিমাণ। ২০১২-১৩ অর্থবছরে বিদ্যুত্ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) কর্তৃক দাবিকৃত ভর্তুকির পরিমাণ ৬ হাজার ৪৭৯ কোটি টাকা, যা ২০১১-১২ অর্থবছরে ছিল ৬ হাজার ১০০ কোটি টাকা। অধিক ভর্তুকি দেয়ায় বেসরকারি খাতে বিদ্যুত্ উত্পাদন বাড়ছে। আর সরকারি খাতে বিদ্যুত্ উত্পাদন কমছে। ফলে একদিকে কর রাজস্বের সুবিধা ভর্তূকির মাধ্যমে বেসরকারি খাতে প্রবাহিত হচ্ছে। অন্যদিকে বিদ্যুতের জন্য বেসরকারি খাতের উপর নির্ভরশীলতা তথা কুইক রেন্টাল বিদ্যুত্ উত্পাদনের উপর নির্ভরশীলতা বাড়ছে। এতে দাম বাড়াতে হচ্ছে বিদ্যুতের এবং কুইক রেন্টালের মাধ্যমে দুর্নীতির সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে। কুইক রেন্টাল পাওয়ার প্লান্টের অধিক স্থাপনের কারণে ২০১১-১২ অর্থবছরে জ্বালানি এবং অপরিশোধিত জ্বালানি আমদানির হার পূর্ববর্তী অর্থবছরের তুলনায় ৩২ দশমিক ৯ এবং ৩২ দশমিক ১৯ শতাংশ বেড়েছে। উন্নয়ন অন্বেষণ বলছে, সরকারের দূরদর্শিতা ও সৃজনশীল নীতি কাঠামোর অভাবে ঘাটতি ও ঋণ ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে জনসাধারণকে বিদ্যুত্ ক্রয় বাবদ উচ্চমূল্য দিতে হচ্ছে, সামাজিক খাতে সরকারের ব্যয় কমে যাচ্ছে এবং সর্বোপরি জনগণকে মুদ্রাস্ফীতি ও উচ্চ করের বোঝা বইতে হচ্ছে। এসবের পরিপ্রেক্ষিতে উন্নয়ন অন্বেষণ মনে করে রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল পাওয়ার প্লান্ট বন্ধ করা এবং একই সাথে বিদ্যুত্ ও জ্বালানি খাতে সরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি করার সময় এসেছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বর্তমান বছরগুলোতে মাথাপিছু ঋণের বোঝা বেড়েছে। ২০১২-১৩ বাজেটের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী মাথাপিছু ঋণের বোঝা ২ হাজার ৯৯৮ দশমিক ৬১ টাকা। আগের বছরগুলোতেও মাথাপিছু ঋণের বোঝা বেড়েছিল বেশি হারে। ২০১১-১২ অর্থবছরে ২৪ দশমিক ৪২ শতাংশ এবং ২০১০-১১ অর্থবছরে ৪৮ দশমিক ৩৮ শতাংশ হারে বাড়ে মাথাপিছু ঋণের পরিমাণ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামপ্রতিক সময়ে সরকারের ঋণের পরিমাণ যেকোন সময়ের চেয়ে বেড়ে যাওয়ায় দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত হচ্ছে। ঋণের এই বৃদ্ধি প্রকৃত সুদের হারের উপর ঊর্ধ্বমুখী চাপ সৃষ্টির মাধ্যমে বেসরকারি বিনিয়োগকে বাধাগ্রস্ত করছে। তাছাড়া উচ্চ ঋণের সুদ ও ঋণ পরিশোধের জন্য সরকারের ব্যয় বৃদ্ধি বাজেট ঘাটতিকে আরো বৃদ্ধি করছে এবং সামাজিক নিরাপত্তা খাতের ব্যয় হ্রাস করছে। সরকার এই ঋণ পরিশোধের জন্য মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) এবং এর আওতা বৃদ্ধি করছে। আর এই কর আয় নিরপেক্ষ হওয়ায় সাধারণ মানুষের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে।