সিলেট নগরীসহ আশপাশ এলাকার মাটির নিচে রয়েছে তেল-গ্যাস ক্ষেত্র। নগরীর পার্শ্ববর্তী লাক্কাতুরা চা বাগান এলাকা থেকে তেল উত্তোলিত হচ্ছে। ১৫ কি.মি. অদূরেই রয়েছে হরিপুর গ্যাস কূপ। এদিকে অপরিকল্পিত নগরায়ন অব্যাহত রয়েছে। আবাসিক, বাণিজ্যিক ভবনগুলো ক্রমেই নগরীর নীল আকাশ ঢেকে দিচ্ছে। কিন্তু এসব ভবনের অনেকগুলোতেই অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা নেই অথবা ব্যবস্থাপনা দুর্বল। এই অবস্থায় সিলেট নগরীতে আগুনের ঝুঁকি খুব বেশি। শহরের অন্তত ৮০ ভাগ ভবনে আগুন নেভানোর আধুনিক যন্ত্রপাতি নেই। ফলে যেকোন সময় বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলে পরিস্থিতি সামাল দেয়া মুশকিল হয়ে পড়বে। বহুতল ভবনগুলোতে যারা বাস করছেন তাদের অনেকের অগ্নিকাণ্ডের মুহূর্তে করণীয় সম্পর্কে নেই কোন সচেতনতা। বিল্ডিং কোড না মানা ও অগ্নি নিরাপত্তা পরিকল্পনা না থাকায় অনেক ভবনের বাসিন্দা আগুনের ঝুঁকিতে বসবাস করছেন দিনের পর দিন।
মদিনা মার্কেট, সুবিদ বাজার, আম্বরখানা, উপশহর, শিবগঞ্জ, ইসলামপুর ও বিমানবন্দর এলাকায় ছোট ছোট ফায়ার স্টেশন স্থাপন এখন জরুরি। এদিকে শহরে আপাতত ৩টি নতুন ফায়ার স্টেশন স্থাপনের প্রস্তাবনা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বরাবরে পাঠানো হয়েছে। বিষয়টি বিবেচনাধীন। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স সিলেট অফিসসূত্রে জানা গেছে, দ্বিতল বা তারচেয়ে বেশি উচ্চতার ভবন নির্মাণের জন্য ফায়ার সার্ভিসের ছাড়পত্র গ্রহণ করতে হয়। দুর্যোগ দেখা দিলে নিরাপদে বের হওয়ার জন্য প্রতিটি ভবনে জরুরি বহির্গমন রাস্তা, অগ্নি নির্বাপণের জন্য পানি, ড্রাই পাউডার ও অগ্নি নির্বাপক যন্ত্রের ব্যবস্থা রাখা বাধ্যতামূলক। কিন্তু এসব ব্যবস্থা না রেখেই সিলেটে একের পর এক গড়ে উঠছে আকাশচুম্বি বহুতল ভবন। নীতিমালা অমান্য করে গড়ে উঠা ভবনগুলোর বিরুদ্ধে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স কর্মকর্তারা বিভিন্ন সময় অভিযান চালালেও ভবনগুলো রয়েছে বহাল তবিয়তেই।
সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান ইত্তেফাককে বলেন, কর্পোরেশনের ভেতরে ‘সেফটি প্ল্যান’ ছাড়া কোনো বহুতল ভবন নির্মাণের অনুমতি দেয়া হচ্ছে না। এদিকে নগরীতে দিন দিন যেভাবে বসতি বাড়ছে আর পানির উত্স হ্রাস পাচ্ছে তাতে ‘হাইড্রেন্ট সিস্টেম’ চালু করার বিষয়ে সংশ্লিষ্টরা গুরুত্বারোপ করেন। পাকিস্তান আমলে ঢাকায় এই ব্যবস্থা ছিল। বর্তমানে পৃথিবীর বহু উন্নত দেশে অগ্নি নির্বাপণের জন্য বিভিন্ন শহরে ‘হাইড্রেন্ট সিস্টেম’ এর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এই ব্যবস্থায় নদীর সাথে নগরীর বিভিন্ন স্থানে বড় বড় পানির পাইপের সংযোগ থাকবে এবং মোটর চালু থাকবে। যা থেকে সহজে ফায়ার সার্ভিস দল নগরীর যেকোন প্রান্ত থেকে পানি সংগ্রহ করতে পারবে। এদিকে ১৯৬২ সালে নগরীর তালতলায় স্থাপিত ফায়ার সার্ভিস স্টেশনটির রয়েছে নানা সীমাবদ্ধতা। যুগের প্রয়োজনে এ স্টেশনের যতটুকু আধুনিকায়ন হওয়ার কথা তা হয়নি। বহুতল ভবনে অগ্নিকাণ্ডের মতো কোন ঘটনা ঘটলে নেভানোর কিংবা ভবনে আটকেপড়া লোকজনকে উদ্ধারের প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদি সিলেট ফায়ার সার্ভিসের নেই। সিলেট ফায়ার সার্ভিসসূত্রে জানা যায়, বাণিজ্যিকভাবে মাত্র তিনতলা পর্যন্ত আগুন নেভাতে পারবে ফায়ার সার্ভিস। অথচ সিলেটে ১০ তলা ভবন নির্মিত হয়েছে। ২৪ তলা পর্যন্ত ভবন নির্মাণের অনুমোদন দেয়া হয়েছে। ফায়ার সার্ভিস এন্ড সিভিল ডিফেন্স সিলেটের সহকারী পরিচালক পরিমল চন্দ্র কুন্ডু ইত্তেফাককে জানান, ভূমিকম্পের জন্য সিলেট হচ্ছে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল। অথচ সিলেটের বহুতল ভবনের ৮০ ভাগেরই দুর্যোগ মোকাবেলার কোনো ব্যবস্থা রাখা হয়নি। তাই ফায়ার সার্ভিসের নীতিমালা না মেনে গড়ে উঠে ভবনগুলোতে ধস বা অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলে ব্যাপক প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে।
