আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কোন রাজনৈতিক দলের মনোনয়ন বঞ্চিত বিদ্রোহীরা অংশ নিতে পারবেন না। কোন রাজনৈতিক দল যদি কোন সদস্যকে বহিষ্কার করে কিংবা তিনি দল ত্যাগ করেন তাহলে ওই ব্যক্তি অন্যকোন দলে যোগ দিয়েও অংশ নিতে পারবেন না নির্বাচনে। এছাড়া এখন যদি কেউ কোন নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলে যোগ দেন তাহলে তিনিও আগামী নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না। তাছাড়া অনিবন্ধিত কোন রাজনৈতিক দলেরও আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণের কোন সুযোগ নেই। এমনকি অনিবন্ধিত রাজনৈতিক দল নিবন্ধিত কোন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে নির্বাচনী জোটও করতে পারবে না। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২’র সংশোধিত বিধানে (২০০৯ সাল) এ বিধিনিষেধ রয়েছে। নির্বাচনী আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এ বিধান বহাল থাকলে নির্বাচন কেন্দ্রিক দল বদলের রাজনীতি বন্ধ হবে। সংসদ নির্বাচন পরিচালনার জন্য ১৯৭২ সালে প্রণীত হয় গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশের মাধ্যমে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের বেশকিছু বিধান সংশোধন করা হয়। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০০৯ সালের ১২ নভেম্বর এই অধ্যাদেশ সংসদে পাস হয়। তবে ওই অধ্যাদেশে বিল আকারে পাসের সময়ে আইন- শৃঙ্খলা বাহিনীর সংজ্ঞা থেকে ‘প্রতিরক্ষা কর্ম বিভাগসমূহ’ শব্দ কয়টি বাদ দেয়া হয়।
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ১৯৭২ এর ২০০৯ সালের সংশোধিত বিধানের ১২ ধারায় প্রার্থীদের যোগ্যতা ও অযোগ্যতার বর্ণনা রয়েছে। ওই ধারার (খ) তে উল্লেখ রয়েছে, নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল কর্তৃক মনোনীত বা স্বতন্ত্র ছাড়া কেউ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না। এখানে উল্লেখ্য যে, বিগত নির্বাচনে অনেক আসনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের বিশেষ করে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির একাধিক প্রার্থী মনোনয়নপত্র দাখিল করেন। মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের পর চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশের আগে দল থেকে একজনকে মনোনয়ন দেয়া হয়। কিন্তু যারা মনোনয়ন পান নি, তাদের অনেকেই বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন। এদের কেউ কেউ বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে নবম সংসদে নির্বাচিত হয়েছিলেন।
কিন্তু বিদ্যমান আইনে দলীয়ভাবে মনোনয়নপত্র দাখিলের পর বিদ্রোহী বা স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার সুযোগ নেই। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের ৭ ধারার (খ) তে উল্লেখ আছে, ‘নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের পক্ষে সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদক বা সমপর্যায়ের পদাধিকারী স্বাক্ষরিত এই মর্মে একটি প্রত্যয়নপত্র দিতে হবে যে, প্রার্থীকে ঐ দলের পক্ষ হতে মনোনয়ন প্রদান করা হয়েছে। তবে শর্ত থাকে যে, কোন নিবন্ধিত দলের পক্ষ হতে প্রাথমিকভাবে একাধিক প্রার্থীকে মনোনয়ন প্রদান করা যাবে এবং একের অধিক প্রার্থীকে মনোনয়ন প্রদান করা হলে মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের পূর্বেই চূড়ান্তভাবে একজন মনোনীত প্রার্থীর নাম রিটার্নিং অফিসারকে লিখিতভাবে অবহিত করতে হবে।’ এই বিধান অনুযায়ী মনোনয়নপত্র বাছায়ের পূর্বেই চূড়ান্তভাবে একজন প্রার্থীর নাম দলকে লিখিতভাবে জানাতে হবে।
উল্লেখ্য যে, স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে হলে মনোনয়নপত্রের সঙ্গে নির্বাচনী এলাকার এক শতাংশ ভোটারের সমর্থনসূচক স্বাক্ষর লাগবে। যারা দলীয় প্রার্থী হন তারা মনোনয়নপত্রে দলীয় পরিচয় হিসেবে ওই দলের নাম উল্লেখ করেন। এ কারণে একবার দলীয় প্রার্থী হওয়ার পর স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার আর সুযোগ নেই। যেহেতু তারা দলীয় প্রার্থী হন সেহেতু তারা এক শতাংশ ভোটারের সমর্থন সূচক স্বাক্ষর মনোনয়নপত্রের সঙ্গে সংযুক্ত করেন না। সে কারণে পরবর্তীতে দল থেকে মনোনয়নপত্র না পেলে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার সুযোগ থাকছে না।
আইনের এই ব্যাখ্যার সঙ্গে নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মোবারক একমত পোষণ করেছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি ইত্তেফাককে বলেন, কেউ একবার দলীয় প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র দাখিল করলে, আইন অনুযায়ী তিনি আর স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে পারেন না। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের ১২ (ঞ) ধারায় বলা হয়েছে, কোন ব্যক্তি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সদস্য হিসেবে তিন বছর না থাকলে তিনি নির্বাচনে অংশগ্রহণে অযোগ্য হবেন। আর মাত্র ১১ মাস পরে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ফলে এখন কেউ কোন রাজনৈতিক দলে যোগ দিলেও তিনি নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না। এছাড়া কোন রাজনৈতিক দল যদি কোন সদস্যকে বহিষ্কার করে কিংবা তিনি দল ত্যাগ করেন তাহলে ওই ব্যক্তি অন্য কোন দলে যোগ দিয়েও অংশ নিতে পারবেন না। কেননা এখন তিনি যদি কোন রাজনৈতিক দলে যোগদান করেন তাহলে নির্বাচনের আগে তিন বছর দলে থাকার যে বাধ্যবাধকতা তা পূরণ হচ্ছে না। তবে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে কোন বাধা থাকবে না।
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের এই বিধানটি বাদ দেয়ার জন্য জাতীয় পার্টি (এ) চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদ নির্বাচন কমিশনে দেনদরবার করছেন। এ নিয়ে এরশাদ নির্বাচন কমিশনকেও চিঠি দিয়েছেন। চিঠিতে বলা হয়, ‘কে কখন কোন রাজনৈতিক দলে যোগ দেবেন, কখন নির্বাচনে অংশ গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেবেন সেটা সংবিধান প্রদত্ত তার নাগরিক অধিকারের বিষয়।’
এ ব্যাপারে ইসি সচিবালয়ের সচিব ড. মোহাম্মদ সাদিক ইত্তেফাককে বলেন, সাবেক সিইসি ড. শামসুল হুদার নেতৃত্বাধীন কমিশনের আমলে এইচ এম এরশাদ এই বিধান বাতিলের দাবি জানিয়ে কমিশনকে চিঠি দিয়েছিলেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত জাতীয় পার্টি (এ) ছাড়া আর কোন রাজনৈতিক দল এ বিধান বাতিলের দাবি জানায়নি। এদিকে, নির্বাচন কমিশন (ইসি) রাজনৈতিক দল হিসেবে নিবন্ধিত হওয়ার জন্য আগামী ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে আবেদনের সময়সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে। ইসির দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দশম সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য নতুন রাজনৈতিক দলের জন্য এটা শেষ সুযোগ। ফলে ডিসেম্বরের পর জন্ম নেয়া কোন রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না। তবে নির্বাচন কমিশন যদি নিবন্ধনের সময়সীমার ব্যাপারে শিথিলতা দেখায় বা বর্তমান সময়সূচি পরিবর্তন করে সেক্ষেত্রে হয়তো নতুন দলের নির্বাচনে অংশ নেয়ার সুযোগ থাকবে।
অনিবন্ধিত দলের সঙ্গে জোট বেআইনি! :গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের ৯০ (খ) ধারার ২ (ঘ) উপ-ধারায় উল্লেখ রয়েছে, কোন নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল নির্বাচনের জন্য কোন অনিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সাথে নির্বাচনী জোট গঠন করতে পারবে না। বর্তমানে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট ও বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোটের অন্তর্ভুক্ত ১০টি রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন নেই নির্বাচন কমিশনে।
এর মধ্যে ১৮ দলীয় জোটভুক্ত ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এনডিপি), বাংলাদেশ লেবার পার্টি, বাংলাদেশ ইসলামিক পার্টি, ডেমোক্রেটিক লীগ (অলি আহাদ), ন্যাপ ভাসানী ও পিপলস লীগ ইসির নিবন্ধিত দল নয়। অন্যদিকে মহাজোটভুক্ত ইসলামী ঐক্যজোট (মিসবাহ), কমিউনিস্ট কেন্দ্র, গণতান্ত্রিক মজদুর পার্টি ও গণ আজাদী লীগের নিবন্ধন নেই। ফলে নিবন্ধিত না হলে আগামী নির্বাচনে এসব দল কোন নির্বাচনী জোটে যেতে পারবে না।
পাল্টে যাচ্ছে মনোনয়ন ফরম :জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীর দলীয় মনোনয়ন পেতে তিন বছরের সদস্যপদ থাকার বাধ্যবাধকতা আরো সুনির্দিষ্ট করে দেয়া হচ্ছে। এজন্য আরপিও’র সংশ্লিষ্ট ধারায় পরিবর্তন আনা হচ্ছে। পাল্টে যাচ্ছে জাতীয় সংসদের মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার ফরমও। বর্তমানে প্রার্থীর দলীয় ফরমে কত বছর আগ থেকে তিনি সংশ্লিষ্ট দলের প্রার্থী তা উল্লেখ করতে হয় না। এই বিষয়টি সুনির্দিষ্ট করতে কমিশন এই ফরম পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে।
