শিল্পীর ক্যানভাসে সুন্দর পৃথিবীর হাতছানি

আপডেট : ০১ ডিসেম্বর ২০১২, ২২:০২
কংক্রিটের চাপে বিপন্ন নগর, বিপন্ন মানুষ। শিল্পী কাজী সালাহউদ্দিনের ক্যানভাসে উঠে এসেছে এই বার্তা। রাজধানী ঢাকার যে নাভিশ্বাস উঠেছে, সে কথাই তুলির আঁচড়ে ফুটিয়ে তুলেছেন তিনি। ফিলিস্তিনি চিত্রকর বাসার আল রৌবের ক্যানভাসে উঠে এসেছে ফিলিস্তিনের ওপর চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধে কী নিদারুণ বিপন্ন মানুষ! মানুষ ছাড়া আর সবকিছুই গুরুত্বপূর্ণ। শুধু মানুষের জীবনের কোন মূল্যই নেই সেখানে। সে কারণে রৌবের ক্যানভাস সাদা, ধোঁয়াটে। মানুষের অবয়ব ধীরে ধীরে মুছে যাচ্ছে। আগ্রাসী রাষ্ট্রের কাছে এভাবেই মানুষ অপ্রয়োজনীয় হয়ে ওঠে! ছবির বিষয় দেখে চমকে উঠতে হয়। দর্শকদের ভাবতে বাধ্য করে এমনই মনকে নাড়া দেয়ার মত ছবি নিয়ে শুরু হয়েছে মাসব্যাপী ১৫তম দ্বিবার্ষিক এশীয় চারুকলা প্রদর্শনী বাংলাদেশ-২০১২। এবারের শ্লোগান ‘এশীয় দ্বিবার্ষিক চারুকলার বর্ণিল তিরিশ বছর’। প্রদর্শনীতে এবার বাংলাদেশসহ ৩৪টি দেশের ২১৮ জন শিল্পীর মোট ৪৭৫টি শিল্পকর্ম প্রদর্শিত হচ্ছে। এরমধ্যে আমন্ত্রিত ৩৩টি দেশের ১১৮ জন শিল্পীর বিভিন্ন মাধ্যমের ৩৩৭টি শিল্পকর্ম এবং স্বাগতিক বাংলাদেশের নির্বাচিত ১০০ জন শিল্পীর ১৩৮টি শিল্পকর্ম স্থান পেয়েছে প্রদর্শনীতে। শুধু বাংলাদেশ বা ফিলিস্তিন নয়, অংশ নেয়া বেশিরভাগ দেশের শিল্পীই বিশ্ব জুড়ে মানবাধিকার লংঘন নিয়ে চিন্তিত। সুন্দর পৃথিবীর অন্বেষণে তারা ক্যানভাসে, ভাস্কর্যে, ইন্সটলেশন আর্টের মাধ্যমে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। ডাক দিয়েছেন সুন্দর মানবিক পৃথিবী গড়ে তোলার। এশিয়ান বায়েনিয়ালের এবারের ছবি প্রসঙ্গে আলোচনায় বাংলাদেশের সবর্জন শ্রদ্ধেয় শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী বললেন, শিল্পী মাত্রেই সংবেদনশীল, তা তিনি যে দেশেরই হোন না কেন। তাঁরা চান ভাবনার উত্তরণ ঘটুক। যুদ্ধ, মানুষে মানুষে হিংসা-ঘুচে যাক। একটি সুন্দর মানবিক পৃথিবী প্রতিষ্ঠিত হোক। সে কারণেই শিল্পীদের ক্যানভাসে জীবনের জয়গান ধ্বনিত হয়েছে। গতকাল শনিবার শিল্পকলা একাডেমীর জাতীয় নাট্যশালায় সকালে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত প্রধান অতিথি হিসাবে মাসব্যাপী এ প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন। উদ্বোধনী পর্বে বিশেষ অতিথি ছিলেন সংস্কৃতি মন্ত্রী আবুল কালাম আজাদ, সম্মানিত অতিথি ছিলেন ইয়েমেনের সংস্কৃতি মন্ত্রী আবদাল্লাহ আওয়াবিল মানদুক ও এশীয় চারুকলা প্রদর্শনীর সম্মানিত জুরি বোর্ডের চেয়ারম্যান দেশের খ্যাতিমান শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সংস্কৃতি সচিব সুরাইয়া বেগম, স্বাগত বক্তৃতা প্রদান করেন একাডেমীর মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকী। শুভেচ্ছা বক্তৃতা দেন একাডেমীর চারুকলা বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন। অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘শিল্পবোধের চেতনাটাই বাঙালিকে তার অধিকার আদায়ে সবসময় সোচ্চার রেখেছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের চিত্রকলা বিশ্বে সুনাম অর্জন করেছে এবং সমাদৃতও হচ্ছে। আমরাও বিশ্বব্যাপী গর্ব করার মত পেয়েছি বেশকিছু পাইওনিয়র চিত্রকর।’ উল্লেখ্য, প্রদর্শনীতে স্থান পাওয়া শিল্পকর্ম থেকে জুরি বোর্ডের সদস্যরা ৩ জনকে গ্রান্ড অ্যাওয়ার্ড ও ৬ জনকে সম্মাননা অ্যাওয়ার্ড প্রদান করেন। ঘনবসতিপূর্ণ নগরী রাজধানী ঢাকা দিন দিন নগরবাসীর ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে, এ্যাক্রেলিক মাধ্যমে এ বিষয়টি ফুটিয়ে তুলে গ্র্যান্ড অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেছেন বাংলাদেশের শিল্পী কাজী সালাউদ্দিন আহমেদ। এছাড়া গ্র্যান্ড পুরস্কার আরো পেয়েছেন ফিলিস্তিনের বাসার আল রৌব ও জাপানের মেইরো কোইজুমি। সম্মাননা অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন বাংলাদেশের জিহান করিম ও ইয়াসমিন জাহান নূপুর, সিরিয়ার নিসরিন বুখারী, নেপালের রাজান কাফলী, অস্ট্রেলিয়ার টড ফুলার ও ইরানের সাদেগ্ টিরাফখান। গ্র্যান্ড ও সম্মাননা অ্যাওয়ার্ড পাওয়া শিল্পীদের প্রত্যেকের হাতে মেডেল, ক্রেস্ট ও সনদপত্র তুলে দেন অর্থমন্ত্রী। অংশগ্রহণকারী দেশগুলো হলো বাংলাদেশ, আফগানিস্তান, অস্ট্রেলিয়া, ভুটান, চীন, পূর্ব তিমুর, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ইরান, জাপান, জর্দান, কুয়েত, কাজাখস্তান, লেবানন, মালদ্বীপ, মঙ্গোলিয়া, নেপাল, ওমান, ফিলিস্তিন, ফিলিপাইন, কাতার, রাশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, সৌদি আরব, শ্রীলংকা, সিঙ্গাপুর, সিরিয়া, থাইল্যান্ড, তুরস্ক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, উজবেকিস্তান ও মিয়ানমার। দর্শনার্থীদের জন্য প্রদর্শনী হল প্রতিদিন বেলা ১১টা থেকে রাত ৮টা এবং শুক্রবার বেলা ৩টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত উন্মুক্ত থাকবে। উল্লেখ্য, ১৯৮১ সাল থেকে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর বিশিষ্ট শিল্পীদের নিয়ে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী এই দ্বিবার্ষিক এশীয় চারুকলা প্রদর্শনীর আয়োজন করে আসছে। মুক্তিযুদ্ধের প্রবন্ধ সংকলন ‘মুক্তির সংগ্রাম’ :বিজয়ের মাসের প্রথমদিনে চন্দ্রাবতী একাডেমী প্রকাশ করেছে এই ভূখণ্ডের ২২৪ বছরের স্বাধীনতার ইতিহাস সংবলিত বই ‘মুক্তির সংগ্রাম’। গতকাল শনিবার জাতীয় জাদুঘরে এর মোড়ক উন্মোচন ও চিত্র প্রদর্শনী উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তারা নতুন প্রজন্মকে জাতির ইতিহাস জানাতে বইটি বিশেষ ভূমিকা রাখবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন। বইটিতে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা বিদ্রোহ, তেভাগা আন্দোলন, নাচোল বিদ্রোহ থেকে ছয় দফা, স্বাধীনতা সংগ্রামের বিস্তারিত নিয়ে ভারত বাংলাদেশের ২০ জন লেখকের ২৩টি প্রবন্ধ স্থান পায়। প্রতিটি প্রবন্ধের শুরুতে রয়েছে সেই প্রবন্ধ সংশ্লিষ্ট ছবি। বইটি সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করেন এমিরেটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। সহকারী সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করেন সেলিনা হোসেন, অধ্যাপক আব্দুল মমিন চৌধুরী। ছবি সম্পাদনার দায়িত্বে ছিলেন শিল্পী বীরেন সোম ও রফিকুন নবী। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, বিশেষ অতিথি ছিলেন এবি ব্যাংকের চেয়ারম্যান এম ওয়াহিদুল হক, সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠান শেষে নলিনীকান্ত ভট্টশালী গ্যালারিতে বইয়ের ছবিগুলো নিয়ে আয়োজিত প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন অর্থমন্ত্রী। জাতীয় জাদুঘরে সপ্তাহব্যাপী এই বই নিয়ে আলোচনার আয়োজন করেছে চন্দ্রাবতী একাডেমী। এই প্রকাশনায় আর্থিক সহায়তা করেছে এবি ব্যাংক। জাপানি শিল্পীদের কনসার্ট :বাংলাদেশ ও জাপানের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৪০ বছর পূর্তি উপলক্ষে বাংলাদেশের জাপান দূতাবাস আয়োজিত দুইদিনব্যাপী ‘জাপানিজ ড্রাম কনসার্ট: আউন ও হিদে-জাপানিজ মিউজিক ফিউশন’ এর দ্বিতীয় দিনের মত অনুষ্ঠিত হলো জাতীয় জাদুঘরের প্রধান মিলনায়তনে। এর আগে গত শুক্রবার এ দলের প্রথম কনসার্টটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল শিল্পকলা একাডেমীর জাতীয় নাট্যশালায়। জাপান ফাউন্ডেশন, শিল্পকলা একাডেমী এবং জাতীয় জাদুঘর এর সহযোগী আয়োজক। উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত উত্সবের শেষ দিন আজ :বেঙ্গল ফাউন্ডেশন ও ভারতের কলকাতার আইটিসি এসআরএ সঙ্গীত একাডেমী যৌথভাবে আয়োজনে বেঙ্গল-আইটিসি এসআরএ শাস্ত্রীয় সঙ্গীত উত্সবের তৃতীয় দিনে উপমহাদেশের প্রবাদপ্রতিম শিল্পীরা বিভিন্ন ঘরানার নির্মল রাগসঙ্গীত পরিবেশন করে দর্শক-শ্রোতাদের মুগ্ধ করেন। রাত ১২টা পর্যন্ত একের পর এক উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের সুরধারা পরিবেশন করেন আরশাদ আলী খান, শশাঙ্ক মাক্তেদার, প্রিয়াংকা গোপ, কুমার মারদার, বিদুষী শুভ্রা গুহ এবং বিদুষী গিরিজা দেবী। সেতারের রাগ-রাগিনীর সুর তোলেন এবাদুল হক এবং পূর্বায়ন চট্টোপাধ্যায়। সরোদ পরিবেশন করেন আবির হোসেন। সবশেষে কত্থক নৃত্য পরিবেশন করে উপস্থিত কয়েক হাজার সমঝদার দর্শক-শ্রোতার মধ্যে মুগ্ধতা ছড়িয়ে দেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত নৃত্যগুরু বিরজু মহারাজ। এদিনের আয়োজন উত্সর্গ করা হয় পণ্ডিত উদয় শংকরকে। আজ রবিবার উত্সবের শেষ দিন। এদিন সন্ধ্যা ছয়টা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত আয়োজন চলবে। এদিনের আয়োজন উত্সর্গ করা হয়েছে ওস্তাদ আলী আকবর খাঁকে। এদিন আলিফ লায়লা (সেতার), ব্রজেশ্বর মুখোপাধ্যায় (কণ্ঠ), মুর্তজা কবির (বাঁশি), বিদুষী অরুণা সায়েরাম (কণ্ঠ), বিদুষী আলারমেল ভালি (ভরতনাট্যম), পণ্ডিত রাজন মিশ্র (কণ্ঠ), পণ্ডিত সজন মিশ্র (কণ্ঠ) এবং পণ্ডিত হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়া (বাঁশি) অংশ নেবেন। বিজয় মাসের প্রথম প্রভাত :মহান মুক্তিযুদ্ধ স্মরণে পদক্ষেপ বাংলাদেশ শনিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাকিম চত্বরে ‘বিজয় মাসের প্রথম প্রভাত’ শীর্ষক একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক। বিশেষ অতিথি ছিলেন সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সহ-সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ ও সাধারণ সম্পাদক হাসান আরিফ। ঘোষণাপত্র পাঠ করেন পদক্ষেপ বাংলাদেশের সভাপতি বাদল চৌধুরী। দলীয় পরিবেশনায় অংশ নেয় উদীচী, সত্যেন সেন শিল্পীগোষ্ঠী, ঋষিজ, স্বভূমি, ওস্তাদ মমতাজ আলী খান ও পদক্ষেপ বাংলাদেশ। একক সঙ্গীত পরিবেশন করেন তিমির নন্দী, সালমা আকবর, রূপু খান ও শৈবাল দত্ত। নৃত্য পরিবেশন করে স্পন্দন ও সম্ভাবনার বাংলাদেশ। ছায়ানটে ‘ট্রায়ো নাইটিঙ্গেল’ :ধানমণ্ডির ছায়ানট সংস্কৃতি ভবন মিলনায়তনে শনিবার নরওয়ের ঐতিহ্যবাহী যন্ত্রসঙ্গীত পরিবেশন করেন তিন ব্যারাক যন্ত্রশিল্পীর সমন্বয়ে গঠিত দল ‘ট্রায়ো নাইটিঙ্গেল’। ট্রায়ো নাইটিঙ্গেল-এর শিল্পীরা ছিলেন বংশীবাদক ইঙ্গেবিয়র্গ ক্রিস্টোফারসেন, বেহালাবাদক ক্যারোলিনা র্যাজেজ এবং গিটারবাদক এরিক শাঙ্কে হোসোইয়েন। ছায়ানট ও কনসার্ট নরওয়ের সাংস্কৃতিক বিনিময় কার্যক্রমের অংশ হিসেবে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।