চার মাসের বকেয়া বেতন আর ক্ষতিপূরণের দাবিতে গতকাল শনিবারও বিক্ষোভ করেছেন আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুরে অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত পোশাক কারখানা তাজরীন ফ্যাশনসের শ্রমিকরা। এ সময় সড়ক অবরোধের চেষ্টা করলে পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের কয়েক দফা সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হয়। তবে কারো হতাহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি।
শ্রমিকরা অভিযোগ করেন, তাজরীন ফ্যাশনস কর্তৃপক্ষের ঘোষণা অনুযায়ী তারা গতকাল বেতনের জন্য সকাল সাড়ে আটটার দিকে কারখানায় যান। কিন্তু বিজিএমইএ কর্তৃপক্ষ সকাল ৯টার দিকে তাদের টঙ্গীতে নেয়ার জন্য ৫টি বাস পাঠায় এবং জানায়, সেখানে গিয়ে চলতি মাসের বেতন নিতে হবে। একথা শোনার পর শ্রমিকরা চার মাসের বকেয়া বেতন না দিলে টঙ্গীতে যাবেন না বলে বিক্ষোভ শুরু করেন। সকাল সাড়ে ৯টার দিকে শ্রমিকদের বিক্ষোভ মিছিলটি বাইপাইল-আব্দুল্লাহপুর মহাসড়ক অবরোধের চেষ্টা করে। পুলিশ শ্রমিকদের বাধা দিলে শ্রমিকরা ফিরে এসে পাশের নিট এশিয়া কারখানার সামনে অবস্থান নিয়ে ওই কারখানার শ্রমিকদেরও বের করে আনার চেষ্টা করে। এ সময় পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পরে অতিরিক্ত পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
সকাল ১০টার দিকে শ্রমিকরা স্থানীয় নিশ্চিন্তপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করতে থাকেন। এ সময় তাজরীন ফ্যাশনসের লাইন কন্ট্রোলার শাহানাজ পারভীন জানান, শ্রমিকদের ৩ মাসের বেতন বকেয়া রয়েছে। এখন ১ মাসের বেতন দিলে আমরা কিভাবে চলবো। অপর শ্রমিক সেলিনা জানান, ১ মাসের বেতন দিয়ে আমাদের দোকানের বাকি আর ঘর ভাড়াই পরিশোধ হবে না। এখন আমরা কিভাবে চলবো। তারা চার মাসের বেতন দাবি করেন।
এ ব্যাপারে শিল্প পুলিশের পরিচালক গোলাম রউফ খান জানান, বিজিএমইএ’র সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শ্রমিকদের নভেম্বর মাসের বেতন আমাদের হাতে আছে। তবে শ্রমিকরা ১ মাসের বেতন না নেয়ায় বেতন দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। বর্তমানে এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। যেকোন সময় বড় ধরনের শ্রমিক অসন্তোষের ঘটনার আশঙ্কায় কারখানাসহ আশপাশের এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।
পরে বেলা দেড়টার দিকে বিজিএমইএ’র একটি প্রতিনিধিদল নিশ্চিন্তপুর পৌঁছায়। তারা শ্রমিকদের কাছ থেকে ৬৬ জন প্রতিনিধির একটি তালিকা নেন। আজ রবিবার ঢাকায় বিজিএমইএ ভবনে এই ৬৬ জন প্রতিনিধির সঙ্গে বৈঠক করবেন অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা। এই বৈঠকেই ক্ষতিপূরণের বিষয়টি এবং শ্রমিকদের কত মাসের বেতন দেয়া হবে তা চূড়ান্ত হবে বলে জানা গেছে।
বিক্ষোভ-ভাঙচুর, অর্ধশত কারখানা বন্ধ
এদিকে বেলা ২টার দিকে তাজরীন ফ্যাশনসের অগ্নিকাণ্ডের সঠিক তদন্ত ও বিচারের দাবিতে আশুলিয়ার জিরাবো বাসস্ট্যান্ড এলাকায় বিক্ষোভ করেন আইরিশ ফ্যাশনের শ্রমিকরা। এ সময় বেশ কয়েকটি কারখানায় ভাঙচুরের সময় পুলিশ বাধা দিলে সংঘর্ষে পুলিশসহ ৫০ জন আহত হন। গতকাল বেলা ৩টার দিকে বিশমাইল-জিরাবো সড়কের ডিভাইন নিটওয়্যার, এম.কে ফ্যাশন, ম্যাসকট গ্রুপ, রাতুল ফ্যাশন, অরুনিমা নিটওয়্যার, মাহাবুব অ্যাপারেলস, কন্টিনেন্টাল গার্মেন্টসহ বিভিন্ন কারখানায় ভাঙচুরের ঘটনায় আশপাশের অর্ধশতাধিক কারখানা বন্ধ ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ। শ্রমিকদের মিছিলটি পুকুরপার এলাকার পিক্যাট বাংলাদেশ লিমিটেডের সামনে পৌঁছালে ওই কারখানার শ্রমিকরা অগ্নিকাণ্ডের আতঙ্কে কারখানা থেকে বের হয়ে আসে। পরে শ্রমিকরা কারখানাটির মূলফটকে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। এ সময় পুলিশ ধাওয়া দিলে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা বাইপাইল-জিরাবো সড়ক অবরোধ করে এবং বেলা ৩টা থেকে ৪টা পর্যন্ত ওই সড়কটি বন্ধ ছিল।
শিল্প পুলিশের পরিচালক গোলাম রউফ খান জানান, কিছু শ্রমিক আগুন আতঙ্কে বের হয়ে কারখানার সামনে জড়ো হয়ে বেশ কয়েকটি কারখানায় ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে শ্রমিকদের বের করে নিয়ে যায়। তবে বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। এছাড়া পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শিল্প এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ, শিল্প পুলিশ, জলকামান মোতায়েনের পাশাপাশি র্যাব ও গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
আগুন আতঙ্কে হুড়োহুড়ি, আহত অর্ধশত
তাজরীন ফ্যাশনসে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঠিক এক সপ্তাহ পর গতকাল আগুন আতঙ্কে আশুলিয়ায় কয়েকটি কারখানা থেকে হুড়োহুড়ি করে বের হতে গিয়ে প্রায় ৫০ জন শ্রমিক আহত হয়েছেন। আশুলিয়ার জিরাব এলাকায় তৈরি পোশাক কারখানা ম্যাসকট গার্মেন্টস লিমিটেড, ম্যাসকট ফ্যাশনস লিমিটেড ও ম্যাসকট নিট লিমিটেডে এ ঘটনায় আহতরা প্রাথমিক চিকিত্সা নিয়েছেন বলে জানিয়েছে শিল্প পুলিশ। ঘটনার পর কারখানা তিনটিতে ছুটি ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ। আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুরে তাজরীন ফ্যাশনসে আগুনে শতাধিক শ্রমিকের মৃত্যুর পর থেকে সাভার ও আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে আগুন আতঙ্কে ভুগছেন শ্রমিকরা। গত কয়েকদিনে আতঙ্কে হুড়োহুড়ির কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে।
তাজরীনে অগ্নিকাণ্ডের পর গত বৃহস্পতিবার ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের ১৫টি দল কারখানাগুলোয় অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা অনুসন্ধানে আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে অভিযান চালায়। ম্যাসকট গ্রুপের কারখানাগুলোতে প্রয়োজনীয় অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা আছে বলে জানান ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (প্রশাসন) আব্দুস সালাম।
ম্যাসকট গ্রুপের ব্যবস্থাপক (কারিগরি) প্রকৌশলী মো. সিরাজুল ইসলাম জানান, কারখানার ৭/৮ জন কর্মচারীকে নিচতলায় অগ্নিনির্বাপণ প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছিল। এ সময় এক কর্মচারীর ধাক্কায় ড্রাই কেমিক্যালসের একটি ড্রাম উল্টে রাসায়নিক পদার্থ পড়ে যায়। এতে বাতাসে ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে। ধোঁয়া দ্বিতীয় তলায় পৌঁছালে শ্রমিকরা আগুন ভেবে হুড়োহুড়ি করতে থাকে। তিনটি কারখানার প্রায় দুই হাজার শ্রমিক তাড়াহুড়ো করে নামতে গেলে অর্ধশত শ্রমিক আহত হন। শ্রমিকরা কারখানা থেকে বেরিয়ে গেলে একদিনের ছুটি ঘোষণা করা হয়। নিজেদের ভুলের কারণেই এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে বলে তিনি স্বীকার করেন।
এদিকে কালিয়াকৈরের হেচং বিডি কারখানায়ও আগুন আতঙ্কে ১০ শ্রমিক আহত হয়েছেন। বারইপাড়া এলাকার ওই সোয়েটার কারখানায় গতকাল সকালে এই ঘটনা ঘটে। কারখানার উত্পাদন কর্মকর্তা জসিম উদ্দিন জানান, কারখানার পঞ্চম তলার নিটিং সেকশনে আগুন লেগেছে বলে গুজব ছড়িয়ে পড়লে শ্রমিকরা সিঁড়ি দিয়ে হুড়োহুড়ি করে নামতে গিয়ে আহত হন। এর আগে গত শুক্রবার সকালেও ওই কারখানায় হুড়োহুড়ি করে নামতে গিয়ে ১৫ শ্রমিক আহত হয়েছিলেন।
