আর কতো লাশ কতো আগুন

আপডেট : ০২ ডিসেম্বর ২০১২, ১৯:৩৩
বাংলাদেশের অর্থনীতি এগিয়ে চলেছে। বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার মধ্যেও বিগত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের উচ্চ প্রবৃদ্ধির হার পৃথিবীর কাছে এক অমীমাংসিত বিস্ময়। এই উন্নয়ন অনেকাংশে নির্ভর করে গার্মেন্টস কর্মীদের উপর। মালিকদের অবহেলার কারণে যখন এই গার্মেন্টস কর্মীদের প্রাণ হারাতে হয় তখন কি আমাদের কিছুই করার থাকে না? গত ২৪শে নভেম্বর ১১১ জন আগুনে পুড়ে প্রাণ হারিয়েছেন, আহত হয়েছেন বহু শ্রমিক। তারা আমাদের সুন্দরভাবে বাঁচার জন্য, অর্থনীতির উন্নয়নে সাহায্য করছে। তাদের তৈরি কাপড় বহু দেশে রপ্তানির মধ্য দিয়ে আমাদের দেশ বিশ্বের কাছে পরিচিত হয়ে উঠছে। তাদের জীবনের কি কোনই মূল্য নেই? এভাবেই কি দিনের পর দিন তারা জীবন দিয়ে যাবে। আর তাদের রক্ত ঝরা শ্রমকে কাজে লাগিয়ে আমরা উন্নতির পথে এগিয়ে যাব, তাদের দিকে ফিরেও তাকাবো না। এই ভয়ংকর সত্যই কি আমাদের মেনে নিতে হবে। নইলে এখনও কেন শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোতে অগ্নি নির্বাপণের সঠিক ব্যবস্থা নেই। অগ্নিকাণ্ডের ভয়াবহতা গার্মেন্টস কর্মীদের যে জীবন মরণ পরীক্ষার মুখে এনে দাঁড় করায় সে সম্পর্কে জানতে কথা হচ্ছিল সেখানকার কর্মীদের সাথে। সাথী অন্য সবদিনের মত সেদিনও আমি পাঁচতলায় বসে কাজ করছিলাম। হঠাত্ শুনি আগুন, আগুন। চিত্কার শুনেই বুঝতে পারি আগুন লেগেছে। আগুন এত তাড়াতাড়ি ছড়িয়ে পড়ছিল যে আমরা বুঝতে পারছিলাম না কোনদিকে পালাব। বের হতে গিয়ে আবিষ্কার করলাম গেট তালা মারা। আমরা বন্দী। এদিকে ধোঁয়ায় ঘর ভরে যাচ্ছে। চারদিকে হাহাকার। শেষে আমরা জানালা ভেঙ্গে বাঁশ বেয়ে নেমেছি। আমার পা আর হাত কেটে গেছে। আমার সাথের অনেকেই বাঁচতে গিয়ে লাফ দিয়েছে। পড়ে গিয়ে হাত পা ভেঙ্গেছে। যেসব সঙ্গী আমাদের ছেড়ে গেছে তারা বলতে গেলে বেঁচেই গেছে। আমরা যারা হাত পা ভেঙ্গে পড়ে রয়েছি এখনও পর্যন্ত তেমন কোন প্রকার সাহায্য আমাদের কাছে এসে পৌঁছায়নি। আজকে সাত দিন হতে চলল, অনেকের পায়ে ঘা হয়ে পচে যাচ্ছে তবু তার চিকিত্সার কোন ব্যবস্থা নেই। আমাদের চিকিত্সার জন্য কারও কাছ থেকে কোন সাহায্য নেই। আর আমার সেই টাকা নেই যে নিজের চিকিত্সা নিজে করব। সরকার, বিজিএমইএ, মিডিয়া, এনজিও কোন অংশ থেকেই কোনপ্রকার সাহায্য পাইনি। আমাদের জীবন কি এতই সস্তা। হাসি আমার নামটা হাসি হলেও আমাদের ভাগ্যে হাসি খুশি থাকা লেখা নাই। মাঝে মাঝে মনে হয় যার কেউ নাই তার এই পৃথিবীতে বাঁচার কোন অধিকারও নাই। এখন ভাবলেও ভয় করে কীভাবে আমরা বাঁচব। এখন বাড়ি ভাড়া কেমনে দিব, কেমনেই বা খাবার টাকা দিব আর চিকিত্সাই বা কেমনে করব। নামতে গিয়ে ডান হাতে এমন ব্যথা পেয়েছি যে নাড়াতেও পারি না। আমাদের গার্মেন্টসে মেয়ে কর্মী বেশি। তাই আমার সাথের অনেকে ওই চিপা সিঁড়ি দিয়ে উঠতে গিয়ে ভিড়ে লোকের চাপে পড়েও মারা গেছে। গার্মেন্টস মালিক বলে তাদের একলক্ষ করে টাকা দিবে। আমাদের জীবন কি এতই সস্তা। আমি তাকে একলক্ষ টাকা দিলে সেকি একটা জীবনও ফিরিয়ে দিতে পারবে। আশপাশের বহু বাড়ির মেয়ের খোঁজ নেই, তাদের লাশও পাওয়া যায় নাই। আমাদের মালিক কি একটা কর্মীর নাম বলতে পারবে। এমনকি আমাদের সান্ত্বনা দিতে, আবার উঠে দাঁড়াবার সাহস দিতেও মালিক পক্ষের কেউ আমাদের সাথে দেখা করেনি। আমাদের কি কেউ মানুষই মনে করে না। মনে হয় এই দুঃখ দুর্দশা আর অনিশ্চিত ভবিষ্যতে বেঁচে থাকার চেয়ে আগুনে পুড়ে মরলেই ভাল হত। গার্মেন্টস কর্মীদের একটি মানবিক জীবন দেয়ার জন্য, তাদের জীবনে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা প্রদানে আমাদের পদক্ষেপ কি হওয়া উচিত তা জানতে কথা হচ্ছিল মানবাধিকার কমিশন চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমানের সাথে। তিনি বলেন, যখন কোন শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠে তখন কী কী নিরাপত্তার ব্যবস্থা থাকতে হবে তার একটা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড থাকে। কিন্তু তাজরীন গার্মেন্টস ফ্যাক্টরীতে তার কিছুই মানা হয়নি। এমন একটি ফ্যাক্টরী কিভাবে ছাড়পত্র পেল। কর্তৃপক্ষই বা কি করে তাতে সন্তুষ্ট হল? ভবিষ্যতে তাই একটি ফ্যাক্টরীও যেন উপযুক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়া অনুমতি না পায় তার ব্যবস্থা করতে হবে। মালিক পক্ষের আরও মানবিক হতে হবে। শ্রমিক শ্রেণীর অবদান কখনই ছোট করে দেখা যাবে না। মালিকদের শ্রমিকের স্বার্থ রক্ষার্থে সর্বাত্মক সহযোগিতা করতে হবে। প্রয়োজন সাপেক্ষে আইনি ব্যবস্থাপনার মধ্যে দিয়ে হলেও শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষা করতে হবে। তাজরীন গার্মেন্টসের মালিকের কাছে বড় তার লোকশান এবং বিদেশি ক্রেতাদের তার ফ্যাক্টরীর প্রতি বিমুখতা। বহু লাশ বেওয়ারিশের মত পড়ে রয়েছে। মালিক হিসেবে তিনি তাদের নাম, পরিচয় কিছুই জানেন না। কোথাওই সেসব সংরক্ষণ করা নেই। তাই শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষার্থে সঠিকভাবে আইনের প্রয়োগই তাদের জীবনে এনে দিতে পারে সুরক্ষা। মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু বলেন, যে ভাবেই আগুন লাগুক না কেন, ষড়যন্ত্রই হোক বা দুর্ঘটনা, তা নিরসনের জন্য কেন প্রতিটি ফ্যাক্টরীতে সঠিক ও যথাযথ ব্যবস্থা থাকবে না। এত এত নারী কর্মী পুড়ে ছাই হয়ে গেল। তাদের নামার ব্যবস্থা নেই। কেন তারা ঘরে বন্দী থাকবে। নিরাপত্তার ব্যবস্থা সুনিশ্চিত না করেই কীভাবে এসব ফ্যাক্টরী শুরু হয়। প্রতিটি ফ্যাক্টরীর আশপাশে ফায়ার ব্রিগেড থাকবে যেন আগুন লাগার সাথে সাথে নেভাবার জন্য আসতে সক্ষম হয়। কোন ঘরেই কর্মীরা তালা দিয়ে বন্দী থাকবে না। আগুনে আহতদের জন্য সাথে সাথেই মেডিক্যালে চিকিত্সার লক্ষ্যে সর্বদা ব্যবস্থা থাকবে এবং আইনগতভাবে অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। এবারের দুর্ঘটনায় আহত সকলের চিকিত্সার্থে মালিক, সরকার, বিজিএমইএ ও সকল এনজিওকে কালবিলম্ব না করে এগিয়ে আসতে হবে। লাশের সন্ধান মেলেনি মা-বাবা হারা অবুঝ শিশুসন্তান সীমা ও জাকারিয়ার দায়িত্ব নেবে কে? মোঃ আব্দুল হালিম অবুঝ ২ শিশু সন্তানকে বাড়ি রেখে কাজের সন্ধানে গিয়েছিলেন মিঠাপুকুর উপজেলার সিংগী কুঁড়ার গ্রামের শাহীন মিয়া ও তার স্ত্রী জান্নাতী বেগম। তাজরিন ফ্যাশনের অগ্নিকাণ্ডে দু’জনেই মারা যাওয়ায় অসহায় হয়ে পড়েছে তাদের দুই শিশু সন্তান সীমা ও জাকারিয়া। মা-বাবা হরানো এই শিশুদুটির ভবিষ্যত্ নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েছেন অসুস্থ নানা শাহজাহান মিয়া। প্রশ্ন একটাই অবুঝ এই শিশু দুটির দায়িত্ব নেবে কে? সংসারের অভাব অনটন থেকে মুক্তি পেতে তাজরিন ফ্যাশনে চাকুরী নিয়েছিলেন শাহীন-জান্নাতী দম্পত্তি। নিমিশেই আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায়। ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড তাদের প্রাণ প্রদীপ নিভে যায়। অসহায় হয়ে পড়ে তাদের অবুঝ শিশু দু’টি। স্বজনেরা অনেক চেষ্টা করেও লাশের সন্ধান না পেয়ে বাড়ি ফিরেছে। শিশু দু’টি আশ্রয় নিয়েছে লতিবপুর গ্রামে নানা শাহজাহান মিয়া বাড়িতে। আশ্রয়দাতা নানাও অসুস্থ। কথা হয় অবুঝ শিশু -সীমার সাথে। সে জানায়, বেতনের টাকা পেয়ে মা আমাদের শীতের কাপড় নিয়ে বাড়িতে আসতে চেয়েছিল। কিন্তু সবাই বলছে মা-বাবার কারখানায় আগুন লেগেছে তাই তাদের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। অবুঝ এই শিশু দুটিকে সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা নেই। নেই কোন উপায় অগ্নিকাণ্ডে নিহত তার বাবা-মা’র লাশ খুজে বের করার। শাহীন দম্পতির স্বজনরা ঢাকা থেকে লাশ না পেয়ে ফিরে এসেছে।