২৪ নভেম্বর, শনিবার। সকাল থেকেই দিনটি ছিলো শান্ত, স্বাভাবিক। সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষগুলোর জন্য দিনটি ছিলো আয়-রুজির অনুকূল। নগরীর বহদ্দারহাট সড়ক জংশনের অদূরে বহদ্দার পুকুর পাড়ে সকাল থেকেই ছিলো মানুষের ব্যস্ততা। এখানেই জমে উঠতো প্রতিদিন সাধারণ আয়ের, নিম্নবিত্ত মানুষের একটি অস্থায়ী বাজার। মোড় থেকে কর্ণফুলী সেতু সড়কে আঁঁধার ছিটিয়ে ভয়াল জগদ্দল পাথরের মতো গজিয়ে উঠেছে নির্মাণাধীন ফ্লাইওভারের পিলার। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নিযুক্ত ঠিকাদাররা একাজটি শুরু করার পর থেকেই কাজের মান ও প্রকল্প এলাকায় মানুষের জানমালের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে নিদারুণ অবহেলা নিয়ে বিস্তর কথাবার্তা উঠেছে। তার উপর অপেশাদারসুলভ অদক্ষতায় পাথরের টুকরো আর সিমেন্ট বালি মিশিয়ে জমানো হচ্ছিলো শত শত টন ওজনের বিশাল বিশাল গার্ডারগুলো। অদূরেই ঐতিহ্যবাহী বহদ্দারহাট বাজার। তা সত্ত্বেও বহদ্দার পুকুরপাড়ের বাজারে অনেকেই আসেন এখানে তরিতরকারি, কাঁচা বাজার সামগ্রী অনেকটা সস্তায় পাওয়া যায় বলে। পরের দিন রবিবার ছিলো মহরমের আশুরা। এদিনের জন্য বিকাল থেকেই বহদ্দার পুকুরপাড় বাজার বেশ জমে উঠতে থাকে। অদূরেই চান্দগাঁ থানা। পাশ দিয়ে ভাঙ্গা রাস্তায় ধূলির ঝড় উঠিয়ে দক্ষিণ চট্টগ্রামের দিকে ছুটে যাচ্ছিলো শত শত যানবাহন ও মানুষেরা। সন্ধ্যার পর এখানে সমবেত হয়েছিলো প্রায় দুই থেকে আড়াইশ’ ক্রেতা-বিক্রেতা। পাশেই পুকুরপাড়ের পাকা রেলিং ও দেয়ালে প্রতিদিনের মতো আড্ডায় মেতেছিলো, আশপাশ এলাকার একদল তরুণ, যুবক ও নানা পেশার মানুষ।
সন্ধ্যে সাড়ে ৭টা। এসময়ই ঘটলো সেই ভয়ংকর ঘটনাটি। একে একে ধসে পড়লো শত শত টন ওজনের ৩টি গার্ডার বহদ্দার পুকুরপাড় বাজারের প্রাণচঞ্চল মানুষগুলোর উপর। থেতলে গেলো, কারোবা ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে গেলো শরীর। প্রচণ্ড শব্দে প্রকম্পিত হলো পুরো এলাকা। রক্তের স্রোতে লাল হয়ে গেলো মাটি, পুকুরের পানি। কারো কারো শরীর আটকা পড়ে ভারী কংক্রীটের স্তূপের নীচে। তাদের প্রাণফাঁটা আর্তনাদ বাতাস ভারী করে তুলছিলো। সিদ্ধান্ত হলো যাদের শরীর আটকা পড়েছে তাদের অঙ্গ কেটেই বের করে এনে বাঁচাতে হবে। কিংকর্তব্যবিমূঢ় ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে পুকুরপাড়ে মানুষের ঢল নামে। জগদ্দল পাথর সরাতে সেনাবাহিনী ছাড়া আর উপায় নেই। মৃতের সংখ্যা সরকারি হিসাবে বার, বেসরকারি হিসাবে ষোল, ফায়ার সার্ভিসের হিসাবে পনের, কারো মতে পুকুরের পানিতে ভাঙ্গা গার্ডারের নীচে রয়ে গেছে আরো লাশ।
এ ঘটনার চারদিন পর এই ট্র্যাজিক ঘটনার শিকার স্বামীহারা জাহানারা বেগম ও মোসাম্মাত্ সাহারা বেগম কঠিন শোকে পাথর। সন্তানরাও শোকে বিহ্বল, হতচকিত। কারো সান্ত্বনার ভাষাই তাদের দিতে পারছে না প্রবোধ। এরা সবাই বহদ্দারহাট ইয়াছিন হাজী বাড়ীর বাসিন্দা। এই এলাকাতেই এই ঘটনা প্রাণ কেড়ে নিয়েছে ৪ জনের।
এই মর্মান্তিক ঘটনায় স্বামী রাজমিস্ত্রী মোহাম্মদ ইলিয়াসকে হারিয়ে শোকে স্তব্ধ জাহানারা বেগম এবং তার চার কন্যা এক পুত্র। সবচেয়ে ছোট কন্যা সন্তানটির নাম মীম। পাঁচ বছর বয়সী মীমকে বাবার কথা জিজ্ঞেস করতেই সে কি এক অবোধ্য অভিমানে মুখ লুকায়, দুই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে বড় বোনের কাঁধের উপর ঝুঁকে থাকে। এই পরিবারটি তাদের উপার্জনক্ষম একমাত্র মানুষটিকে হারিয়ে এখন চরম অনিশ্চয়তায়। বুধবার সন্ধ্যায় কথা হচ্ছিলো এই পরিবারের সদস্যদের সাথে। জাহানারা জানায়, আশুরায় বড় মেয়ে সুলতানা আক্তারের শ্বশুর বাড়ীতে খাবার পাঠাতে বাজার করতে গিয়েছিলো সেখানে তার স্বামী ইলিয়াস। এলাকায় সে কার্পেন্টার ইলিয়াস নামেই পরিচিত। তারা শুনেছিলো সে সময় গার্ডার ধসে পড়ার ভয়ংকর শব্দ। তারা ছুটে গিয়েছিলো ইলিয়াসের খোঁজে। ঘটনাস্থলে লাশ পায়নি। তারা লাশ খুঁজে পেয়েছিলো চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপালের মর্গে। তার কন্যারা হলো— ফারজানা আক্তার, সুলতানা আক্তার, কামরুন্নাহার চুমকি এবং মীম। বড় ছেলে আরিফুল ইসলাম ফারুক সবেমাত্র ছোট একটা চাকরি পেয়েছে। তার অল্প টাকা আয়ে এতোবড় সংসার কীভাবে চলবে জানে না জাহানারা। ইলিয়াস প্রতিদিনই কাঠমিস্ত্রির কাজ করে আয় করতো ৫শ’ থেকে ৮শ’ টাকা। আরিফ পুরো মাসে পায় মাত্র ৩ হাজার টাকা। আর সামনেইতো রয়েছে মেয়েদের পড়াশোনা, তারপর উপযুক্ত পাত্র দেখে বিয়ে দেয়া। জাহানারা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলে, ‘আর মানুষগানেরে আনি দো খালি, আঁরতুন আর কিচ্ছু ন লাইব...’। সামনে ভবিষ্যতের অথৈ সমুদ্র।
ইয়াছিন হাজী বাড়ী এলাকার বাড়াবাড়ীতে থাকে স্বামী হারা মোসাম্মাত্ সাহারা বেগম। সে মানুষের বাড়ীতে ঝিয়ের কাজ করে। তার স্বামী সিরাজুল ইসলাম বহদ্দারপুকুর পাড়ে ঠেলা গাড়ীতে করে সকাল থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত বিক্রি করতো তরিতরকারি। তারা নওগাঁ থেকে চট্টগ্রাম এসছিলো প্রায় ১৫ বছর আগে। সংসারে রয়েছে তিন শিশু কন্যা শিউলি, লাকি এবং সীমা। টাকার অভাবে এদের স্কুলে পাঠাতে পারেনি তারা। এই শিশুরা সংসারে মায়ের কাজে সাহায্য করেই দিন কাটাচ্ছে। অভাবের সংসার কেটে যাচ্ছিলো কোনো রকমে। শীত পড়েছে। সাহারা সন্ধ্যায় ছোটো মেয়ে সীমাকে দিয়ে স্বামীর জন্য পাঠায় সোয়েটার, মাফলার। সিরাজ কন্যা সীমাকে দিয়ে কিছু বাজারও পাঠায় ঘরের জন্য। কিন্তু কিছুক্ষণ পরই যেনো পুরো হাজী বাড়ীর মাটি কেঁপে উঠলো প্রচণ্ড শব্দে। এরপর সব শেষ। জেলা প্রশাসন থেকে লাশ শনাক্তের পর ২০ হাজার টাকা দেয়া হয়েছে বলে জানায় সাহারা। কিন্তু সাহারা টাকা চায় না। সে চায় তার স্বামীকে ফেরত। এই টাকা দিয়ে আর ক’দিনই বা চলবে। এরপর কি করবে, কোথায় যাবে এই সব সন্তান সন্ততিদের নিয়ে এই কথা বলতে বলতে অশ্রু সজল হয়ে উঠে সাহারার চোখ। সামনে বুঝি আশার আলো নেই। সাহারা জানায় অল্প আয়ে তাদের সংসার নিয়ে তারা সুখেই ছিলো। এই ক্ষতি কেন হলো, কীভাবে হলো, কি জন্য হলো এই প্রশ্নের উত্তর তাকে কেউ দিচ্ছে না।
