মুক্তিযুদ্ধের প্রজন্মরা বয়সে এখন প্রবীণ। বর্তমান প্রজন্মের কাছে চেতনা ও আদর্শ তুলে ধরা এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রতি শ্রদ্ধা ও দেশপ্রেম জাগ্রত করায় আমাদের মায়েদের রয়েছে অনেক দায়িত্ব। কারণ, পারিবারিক শিক্ষালয়ই শিশুর প্রথম বিকাশ কেন্দ্র। আর এসব বিষয় নিয়ে বর্তমান সময়ের মায়েদের চিন্তা-ভাবনা ও ভূমিকা নিয়ে লিখেছেন— লাবিব নাজমুছ ছাকিব
মুক্তিযুদ্ধ বাঙালি জাতির গর্ব ও অহংকারের বিষয়। এ যুদ্ধের মাধ্যমেই আমরা স্বাধীন হয়েছি। এর পেছনে রয়েছে এ জাতির রক্তমাখা ত্যাগ, বহু প্রাণের বিসর্জন আর বহু নারীর সম্ভ্রম ত্যাগের ইতিহাস। মুক্তিযুদ্ধকালীন যে প্রজন্ম যুদ্ধের সাথে, মৃত্যুর সাথে নিজেদের প্রাণ নিয়ে লড়েছেন আজ তারা অনেকেই প্রবীণ। বর্তমান তরুণ ও শিশু প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধ এখন শুধুই গৌরবময় স্মৃতি কথা। আর এই স্মৃতি কথাগুলোকে সন্তানের মাঝে ভালোবাসা, সম্মান আর শ্রদ্ধা নিয়ে উপস্থাপনের মহান ও মহত্ দায়িত্ব হচ্ছে আমাদের মায়েদের। উত্তরায় বসবাসকারী গৃহবধূ নাজমুন নাহার নাজু জানান, আমার বাবা ও শ্বশুর দু’জনই মুক্তিযোদ্ধা। দু’জন একসাথেই যুদ্ধ করেছেন। যুদ্ধকালীন বিভীষিকাময় দিনগুলো আমি দেখেছি অনেক কাছ থেকে। কাজেই মুক্তিযুদ্ধের প্রতি আমার শ্রদ্ধাটা অন্যরকম। আমি মনে করি সব বাঙালিই মুক্তিযুদ্ধকে অনেক বেশি শ্রদ্ধা করে এবং ভালোবাসে। আমি আমার সন্তানদেরকেও এমন শিক্ষাই দিচ্ছি। তিন সন্তানের এই জননী বলেন, শহীদ দিবস, স্বাধীনতা দিবস বা বিজয় দিবসের মতো দিবসগুলো আমরা বাসায় উদযাপন করি। দেশের জন্য, শহীদদের আত্মার উদ্দেশ্যে দোয়া করি। আমার সন্তানরা এই দেশ, দেশের মানুষ, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অনেক গর্ব করে। তার বড় মেয়ে নুহা বলে, আমি কখনো মিথ্যা বলি না। কারণ, আমার দাদু নানু দু’জনই মুক্তিযোদ্ধা। আমি দেশকে অনেক ভালোবাসি। আর সত্যিকার দেশপ্রেমিক কখনো মিথ্যা বলে না। জুনিয়র ল্যাবরেটরি স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণীর শিক্ষার্থী রাহি বলে, যারা আমাদের দেশের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেছে আমি তাদেরকে অনেক শ্রদ্ধা করি। আর যারা পাকিস্তানিদের পক্ষে ছিল তাদেরকে আমি ঘৃণা করি। পাকিস্তানিরা আমাদের দেশের অনেক মানুষকে মেরেছে, কষ্ট দিয়েছে। গৃহবধূ ফৌজয়া জাহানের ছেলে রিফাত ওয়েস্ট ধানমন্ডি ইউসুফ হাই স্কুলে পড়ছে। তিনি বলেন, সব মায়ের উচিত সন্তানদের মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে জানানো। এতে করে সন্তানরা দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হবে। দেশের মানুষকে ভালোবাসবে। রিফাত বলে, আম্মুর কাছে যখন মুক্তিযুদ্ধের গল্প শুনি তখন যারা দেশের জন্য যুদ্ধ করেছে, শহীদ হয়েছে তাদের জন্য অনেক কষ্ট হয়। ইচ্ছে হয় তাদের মতো মহত্ হই। আম্মু আমায় মুক্তিযুদ্ধকে, মুক্তিযোদ্ধাদেরকে সম্মান করতে শিখিয়েছে। তুমি তখন থাকলে যুদ্ধ করতে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে এ ছোট্ট শিশুটি বলে ‘আমিও যুদ্ধ করতাম, আমি ভয় পাই না’।
আমাদের স্বাধীন হওয়ার ইতিহাস দীর্ঘ। বহু যুগ আমরা অন্যের দ্বারা শাসিত হয়েছি। অন্যায়ভাবে নিষ্পেষিত, নিগৃহীত হয়েছে আমাদের পূর্বপুরুষরা। কিন্তু কখনো কারো কাছে বশ্যতা স্বীকার করেনি। আমাদের রক্তে মিশে আছে প্রতিবাদের রক্ত। আমাদের মাঝে আছে অনেক বড় আর মহত্ স্বপ্ন দেখার হূদয়। যে স্বপ্নগুলোর একটির বাস্তবায়ন মহান মুক্তিযুদ্ধ। আমাদের শিশুরা যখন এ বিষয়গুলো জানবে, তখন বাংলাদেশের মতো ক্ষুদ্র আর দারিদ্র্য পিষ্ট দেশে জন্মেছে বলে সে হীনমন্যতায় ভুগবে না। বরং তার মুক্তিযুদ্ধ,সংগ্রামের ইতিহাস তাকে শেখাবে বীরত্ব । তৈরি করবে আত্মবিশ্বাসী । শিশুরা কখনো ‘বাংলাদেশ’ ‘বাঙালি’ শব্দগুলোকে অবহেলা ভরে অপব্যবহার করবে না। বরং মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতার চেতনা সন্তানদের করবে অনেক বেশি দায়িত্বশীল দেশপ্রেমিক। তাই আমাদের মায়েদের উচিত এ বিষয়ে সচেতন ও দায়িত্বশীল হওয়া। সন্তানকে জানানো তার দেশ, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের কথা। এবং উদ্বুদ্ধ করবে দেশকে ভালবাসতে, শ্রদ্ধা করতে মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধা আর শহীদদের এবং সন্তানদের স্বপ্ন দেখাতে একজন সত্যিকার বাঙালি মানুষ হওয়ার।
