আশুলিয়ার তাজরীন গার্মেন্টসে স্মরণকালের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানির ঘটনার পুরো দায়-দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে নিয়েছেন তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ। সংগঠনের সভাপতি শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন দৈনিক ইত্তেফাকের সাথে একান্ত সাক্ষাত্কারে বলেছেন, সকল দায় নিজেদের কাঁধে নিয়ে আমরা সমাধানের পথ খুঁজছি। দায় এড়ানোর চিন্তা করছি না।
আমরাও মানুষ। বিবেক দিয়ে শ্রমিকদের নিরাপত্তার বিষয়ে কাজ করবো। ভুল করলে সেটিকে শুদ্ধ বলার অভিপ্রায় আমাদের নেই।
তাজরীনের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় এত প্রাণহানির কারণ সম্পর্কে বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, আগুনের সূত্রপাত হলে সেদিন ফায়ার বেল বাজে। এতে সবার নেমে আসার কথা। কিন্তু শ্রমিকরা যখন সারিবদ্ধভাবে নেমে আসছিলেন তখন তাদের ফেরত পাঠানো হলো। আহত শ্রমিকদের সাথে আমি কথা বলে জেনেছি, যখন তারা বের হয়ে আসতে লাগল তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। ওই দাহ্য পদার্থের (সুতা) ধোঁয়ায় কার্বন মনোঅক্সাইড ও সালফার নির্গত হওয়ায় তারা টিকতে পারল না। এ বিষয়টি আমাদের ভাবিয়ে তুলেছে। কারণ প্রথমে তদন্তে দেখেছি সেখানে (যেখান থেকে আগুনের সূত্রপাত) ইলেকট্রিক্যাল ওয়্যারিং ছিল না।
তাজরীন গার্মেন্টস কমপ্লায়েন্সের অনেক শর্ত না মানলেও তাদেরকে বিজিএমইএ লাইসেন্স দিয়েছে-এমন অভিযোগের বিষয়ে সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন বলেন, লাইসেন্স দেয়ার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আমরা দেখি। ভবনের প্রাথমিক কাঠামোতে প্রয়োজনীয় অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা বা বের হওয়ার জন্য তিনটা সিঁড়ি আছে কি-না। এসবই ছিলো। কিন্তু পরে হয়ত একটি সিঁড়ি মালপত্র রেখে আটকে দেয়া হয়েছে। তবে বের হওয়ার সিঁড়ি কোথায় এসে শেষ হলো, সেখানে গোডাউন হলো কি-না সেটাও দেখতে হবে।
মালিকের অবহেলার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিষয়টি আমরা বিবেচনা করছি। ভয়াবহ দুর্ঘটনা এবং এতগুলো প্রাণহানির জন্য কারখানার মধ্যম সারির ব্যবস্থাপনা দায়ী কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটি সত্য। কিন্তু এই কথা বলে আমরা দায় এড়াতে চাই না। বিজিএমইএ’র ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট সেল ও ফায়ার সেফটি সেল এর দুর্বলতা নিয়ে তিনি বলেন, এটি ঠিক। আমাদের সক্ষমতা কম। আমাদের অগ্নি নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞের অভাব আছে। এই সীমাবদ্ধতা আমরা কাটিয়ে উঠতে চাই। শ্রমিকদের চার মাসের বকেয়া বেতন সম্পর্কে সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন বলেন, শ্রমিকদের নাম নিবন্ধনের জন্য চেষ্টা করছি। এর জন্য দুই-একদিন সময় লাগলেও চেষ্টা করছি যাতে প্রকৃত শ্রমিক বেতন থেকে বঞ্চিত না হন।
তাজরীনে কাজ হারানো শ্রমিকদের চাকরির ব্যবস্থা করা হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা শ্রমিকদের অন্য প্রতিষ্ঠানে চাকরির নিশ্চয়তা দিচ্ছি। মালিক যদি প্রতিষ্ঠান চালান তাহলে কত দ্রুত চালু করবেন সেটি সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আর যদি মনে করেন চালাবেন না তাহলে বিজিএমইএ’র উদ্যোগে অন্য প্রতিষ্ঠানে তাদের চাকরির ব্যবস্থা করা হবে। নিহতদের পরিবারের পুরো দায়িত্ব অন্তত ১০ বছর বিজিএমইএ নেবে উল্লেখ করে বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, তাদের পরিবারের জন্য বিজিএমইএ ১ লাখ টাকা, বিএবি (ব্যাংকারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ) ১ লাখ টাকা, প্রধানমন্ত্রীর তহবিল থেকে ২ লাখ টাকা দেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। আহতদের চিকিত্সা সেবা দেয়া হচ্ছে। তাদেরকেও আর্থিক সহায়তা দেয়া হবে। যেখান থেকেই যা পাবো পুরো টাকাটা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে এককালীন তাদের হাতে তুলে দেব। দেখুন কোন আইনে বলেনি নিহত শ্রমিকের পরিবারের পাশে ১০ বছর থাকার জন্য। আমরা সেই কাজটি করছি।
অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশের পোশাক শিল্প ভাবমূর্তি সংকটে পড়তে পারে এমন আশংকা ব্যক্ত করে বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, আমরা বায়ারদের (ক্রেতা) সাথে বৈঠক করেছি। তাদের অনেকগুলো ব্র্যান্ডের প্রতিনিধিরা এখানে এসেছেন। তাদের সহায়তা চেয়েছি। উভয়ে একসাথে সহযোগিতার ভিত্তিতে কাজ করলে এই অবস্থা থেকে দ্রুত বের হওয়া সম্ভব। তাদের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া গেছে। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ক্রেতারা বিজিএমইএকে সতর্ক করেছে বলে গণমাধ্যমে যে তথ্য এসেছে সে বিষয়ে বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, এখানে সতর্ক করার কিছু নেই। উভয়েই আমরা একটি সরবরাহ চেইনে কাজ করি। আমাদের বিবেচনায় যে কাজগুলো করা দরকার সে বিষয়ে তাদের পরামর্শ চেয়েছি। তারা আমাদের অনেক গঠনমূলক পরামর্শ দিয়েছেন। পোশাকের মূল্য কমিয়ে দেয়ার প্রবণতা থেকে সরে আসার জন্যও তাদের আহ্বান জানাই। মালিকপক্ষের আপত্তির কারণে শ্রম আইনের সংশোধন আটকে আছে-এ বিষয়ে তিনি বলেন, আমাদের আপত্তি নয়। আমরা কিছু প্রস্তাব দিয়েছি। সেগুলো সবাই মিলে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করব।
পরিকল্পিত উপায়ে শিল্প নগরী গড়ে তুললে এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানো যেতো কি-না? এমন প্রশ্নের জবাবে বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, আমরা কেবল আশ্বাসের পর আশ্বাস পেয়েছি। সভা হয়েছে। বিগত সরকারের সময় কাঁচপুরে এরকম একটি উদ্যোগ ছিল। সেই প্লট বরাদ্দের জন্য ১৯টি সভা হয়েছে। আমরা বলেছি জমি আমাদের দেন আমরাই অবকাঠামো তৈরি করবো। সেটি প্রাক মূল্যায়ন কমিটির সভায় পাস হলো। একনেকে যাওয়ার পর অর্থমন্ত্রী বললেন, এদেরকে আদমজী দিয়ে দেয়া হোক। কিন্তু সেই জমির যে দাম নির্ধারণ করে দেয়া হলো সেটি ছিল অত্যধিক বেশি।
বাউশিয়ায় (মুন্সীগঞ্জে শিল্প স্থাপনের জন্য সরকার নির্ধারিত স্থান) শিল্প স্থানান্তরে আপনাদের আগ্রহ নেই কেন? এমন প্রশ্নের জবাবে বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, আমাদের আগ্রহে কোন ঘাটতি নেই। সভার পর সভা হচ্ছে। আমরা কী করবো? আমরাতো যথাযথ কর্তৃপক্ষ নই। আমরা কমপ্লায়েন্সের প্রয়োজনে নিজস্ব উদ্যোগে যে যার মত ঢাকা, চট্টগ্রামের বাইরে শিল্প গড়ে তুলেছি। অবকাঠামো তো আমি তৈরি করে দিতে পারব না। এর জন্য প্রয়োজন সমন্বিত প্রয়াস।
