পার্বত্য শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নে বড় বাধা সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের ভূমির মালিকানা সংক্রান্ত বিরোধ। ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। সেই থেকে পার্বত্য এলাকার শান্তি প্রতিষ্ঠায় সরকার চুক্তি বাস্তবায়নে বেশকিছু সিদ্ধান্ত কার্যকর করেছে। কিন্তু মূল বিরোধের নিষ্পত্তি না হওয়ায় পাহাড়ে অশান্তির আগুন মাঝে মাঝেই জ্বলছে। চুক্তির ১৫ বছর পর জনসংহতি সমিতির সভাপতি শন্তু লারমা বলছেন, পাহাড়ে আবারও অশান্তির আগুন জ্বলবে। তাঁর দাবি, সরকারের চলতি মেয়াদের অবশিষ্ট সময়ে আন্তরিকভাবে কাজ করলে শান্তি চুক্তির বাস্তবায়ন সম্ভব।
আওয়ামী লীগ দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নে সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করে। এ কমিটি প্রথমেই শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের পথে ভূমি বিরোধকে অন্যতম বাধা হিসাবে চিহ্নিত করে পার্বত্য ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইনে ১৩টি সংশোধন প্রস্তাব করে। কিন্তু এসব সংশোধন করা হলে দেশের সার্বভৌমত্ব প্রশ্নের মুখে পড়বে-এমন শঙ্কা ব্যক্ত করে ভূমি মন্ত্রণালয় সংশোধনীর বিরোধিতা করে। প্রায় তিন বছর এরকম অচলাবস্থার পর গত ৩০ জুলাই আইন মন্ত্রীর নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত এক আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় ১৩টি সংশোধনী প্রস্তাব মেনে আইন সংশোধন করার সিদ্ধান্ত হয়। এর পর ৪ মাস পেরিয়ে গেছে, ওই সভার সিদ্ধান্তই অনুমোদন হয়নি। এ সভায় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ভূমি মন্ত্রী রেজাউল করিম হীরা, আইন প্রতিমন্ত্রী কামরুল ইসলাম, ভূমি প্রতিমন্ত্রী মুস্তাফিজুর রহমান ফিজার, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী দীপংকর তালুকদার, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা গওহর রিজভী, ভূমি সচিব মোখলেসুর রহমান, আইন সচিব আবু সালেহ শেখ মোঃ জহিরুল হক, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব নব বিক্রম কিশোর ত্রিপুরা, ভারত প্রত্যাগত শরণার্থী ও অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু বিষয়ক টাস্কফোর্সের চেয়ারম্যান যতীন্দ লাল ত্রিপুরাসহ সংশ্লিষ্টরা।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের সচিব মোখলেসুর রহমান গতকাল রবিবার ইত্তেফাককে অবশ্য বলেছেন, আইন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছে। চলতি সপ্তাহে হয়তো রেজুলেউশন অনুমোদন হয়ে ভূমি মন্ত্রণালয়ে আসবে। তারপর সেটি পরীক্ষা নিরীক্ষা করে বিল আকারে মন্ত্রিসভায় উত্থাপন করা সম্ভব হবে। মন্ত্রিসভার অনুমোদন হলে সেটি আগামী ২৫ জানুয়ারি শুরু হতে যাওয়া জাতীয় সংসদের শীতকালীন অধিবেশনে সংশোধিত আইন উত্থাপনের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে আইন মন্ত্রণালয়ের একটি ঘনিষ্ঠ সূত্র বলছে, সরকার ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইনের সংশোধনীগুলো আরও ভালোভাবে পরীক্ষা করে দেখতে চাইছে। সে জন্য আরো কিছুটা সময় লাগতে পারে।
প্রসঙ্গত গত ৩০ জুলাই আইনমন্ত্রীর নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় যেসব সংশোধনীর পক্ষে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে, পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন থেকে একটি ধারার শর্ত বিলুপ্ত করাসহ ১৩ ধারার সংশোধন। এসব উদ্যোগের ফলে পার্বত্য অঞ্চলের দীর্ঘদিনের ভূমি বিরোধের নিষ্পত্তি ও শান্তিচুক্তির বাস্তবায়ন সহজতর হবে বলে আশা করা হয়। তবে আইনের ধারা ৬(১) গ-এর শর্তাংশ তুলে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়ায়, পার্বত্য অঞ্চলে অধিগ্রহণ করা ভূমি, রক্ষিত বনাঞ্চল, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন শিল্প কলকারখানা, কাপ্তাই জলবিদ্যুত্ প্রকল্প এলাকা, বেতবুনিয়া ভূ-উপগ্রহ এলাকা এবং সরকার বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নামে রেকর্ডকৃত ভূমি-এলাকার মালিকানা দাবি করে যে কোনো পার্বত্য এলাকার নাগরিক বিরোধ তৈরি করতে পারবেন এবং কমিশন তা আমলে নিয়ে নিষ্পত্তির উদ্যোগ নিতে পারবেন বলে আশংকাও প্রকাশ করা হয়। বিদ্যমান ২০০১ সালের কমিশন আইনে এসব এলাকার কোনো বিরোধ তৈরি বা তা নিষ্পত্তি কমিশনের কর্তৃত্ববহির্ভূত রয়েছে। যদিও স্থানীয় সরকার ( পার্বত্য জেলা পরিষদ) আইনে আলোচ্য এলাকা নিয়ে কোনো আপত্তি উত্থাপনে বিধিনিষেধ রয়েছে। কিন্তু কমিশন চলবে পৃথক আইনে সেখানে স্থানীয় সরকার আইনটি কার্যকর হবে কী না-তা নিশ্চিত নয়।
গত ২৮ মে অনুষ্ঠিত শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন কমিটির সভায় ভূমি কমিশন বিরোধ নিষ্পত্তি আইনের ৬(১)গ-এর শর্ত রহিত করার প্রস্তাব করা হয়। এ সভায় বলা হয়, মূল চুক্তির ‘ক’ খণ্ডের ২৬(ক) ধারায় এ বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে। ফলে আইন থেকে শর্ত বাতিল করলে জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষণে কোনো অসুবিধা হবে না এবং মূল চুক্তির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে না।
দীর্ঘদিন থেকে জনসংহতি পরিষদ, আঞ্চলিক পরিষদ কমিশন আইনের ১৩টি ধারা সংশোধনসহ আলোচ্য শর্তাংশ তুলে দেয়ার দাবি করে আসছিলো। ওই শর্তাংশ তুলে দেয়াসহ ১৩টি ধারার সংশোধনী নিয়ে সকলেই একমত হন। আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বলেন, ৬(১) গ ধারার শর্তাংশটি পুরোপুরি স্থানীয় সরকার (পার্বত্য জেলা পরিষদ) আইনের ৬৪ ধারায় সংযুক্ত করা আছে। সুতরাং দুই জায়গায় একই বক্তব্য রাখার কোনো যৌক্তিকতা নেই। তিনি বলেন, এখন পার্বত্য এলাকার জরিপ কাজ শুরু করা যাবে এবং ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি সহজ হবে।
প্রসঙ্গত, ধারার ১(খ) ধারায় বলা আছে পরিষদের নিয়ন্ত্রণ ও আওতাধীন কোন প্রকারের জমি, পাহাড় ও বনাঞ্চল পরিষদের সঙ্গে আলোচনা এবং পরিষদের সম্মতি ছাড়া সরকার অধিগ্রহণ ও হস্তান্তর করতে পারবে না।
মূল চুক্তিতে উল্লেখ করা ‘এ যাবত্ পুনর্বাসিত শরণার্থী’ শব্দগুচ্ছের মধ্যে ‘এযাবত্’ বলতে ১৯৯৭ সালের ৯ মার্চ তারিখ পর্যন্ত বুঝানো হয়েছে। এ তারিখে শান্তিচুক্তি কার্যকর করা হয়। অর্থাত্ এ তারিখ পর্যন্ত শরণার্থীদের মধ্যে সংঘটিত ভূমি বিরোধকে বুঝানো হয়েছে। এখন ১৯৯৭ সালের ৯ মার্চ এবং তত্পরবর্তীতে পুনর্বাসিত শরণার্থী শব্দ সংযোজন করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয় সভায়। কমিশন আইনের ৭(৩) ধারা সংশোধন করে এখন করা হবে চেয়ারম্যান ও অপর তিন জন সদস্যের সমন্বয়ে সভার কোরাম গঠন করা হবে। ৭ (৫) ধারার সংশোধন করে চেয়ারম্যানসহ সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সিদ্ধান্তে বিরোধ নিষ্পত্তি হবে। বিদ্যমান আইনে সভা একমত না হলে চেয়ারম্যানের সিদ্ধান্ত দেয়ার একক ক্ষমতা রয়েছে।
৩০ জুলাইয়ের বৈঠকে চাকমা রাজা ও ভূমি কমিশনের সদস্য রাজা দেবাশীষ রায় বলেছিলেন, তারা আনন্দিত। সভার সিদ্ধান্ত, বিশেষ করে শান্তি চুক্তি বাস্তবায়ন কমিটির সকল সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সকলেই ঐকমত্যে পৌঁছেছে।
এ প্রসঙ্গে বৈঠকে উপস্থিত পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের সদস্য গৌতম কুমার চাকমা ইত্তেফাককে বলেছিলেন, কাপ্তাই জলবিদ্যুত্ ২৫৬ বর্গ মাইল এলাকা নিয়ে গঠিত। এই এলাকার মধ্যে বহু মানুষের সম্পত্তি, জলাধার (ফ্রিজ ল্যাণ্ড) ভাসমান জলা রয়েছে। ৬(১)গ-ধারার শর্তাংশ তুলে দেয়ার সিদ্ধান্ত হওয়ায় এ এলাকায় যদি কোনো প্রকৃত মালিক থাকেন তিনি সে ফ্রিজ ল্যান্ড দাবি করতে পারবেন। তিনি বলেন, এখনো ৪০ গ্রামের মানুষ ঘরে ফিরতে পারেনি। তাদের জমি বেদখল হয়ে আছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সরকার স্থানীয় পরিষদের সম্মতি নিয়ে জমি অধিগ্রহণ করতে পারবে। আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, শরণার্থী পুনর্বাসন ও ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির আগে ভূমি জরিপ করার সুযোগ নেই। তিনি বলেন, সরকারের সিদ্ধান্তে তারা খুশি। ভূমি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে উপস্থিত কর্মকর্তারা বৈঠকে বলেছিলেন, আইনের শর্ত বাতিল করা হলে তা শান্তিচুক্তির পরিপন্থি হবে। ১৯৫৮ সালের ভূমি অধিগ্রহণ আইন, প্রাদেশিক সরকারের রাজস্ব দপ্তরের ১৯৭১ সালের ১৬ সেপ্টেম্বরের আদেশ, ১৯৭৯ সালের ৩১ মার্চ ভূমি মন্ত্রণালয়ের জারি করা আদেশে গৃহীত সকল অধিগ্রহণ, ভূমি সংক্রান্ত কার্যক্রম অবৈধ হয়ে যাবে। জনস্বার্থে পার্বত্য অঞ্চলসহ অন্যান্য অঞ্চলের উন্নয়নের জন্য অধিগ্রহণ করা ভূমি ব্যক্তির মালিকানায় চলে যাবে। এই শর্ত বিলুপ্ত করা হলে, প্রযোজ্য আইনের অধীনে অধিগ্রহণ করা ভূমি এবং রক্ষিত বনাঞ্চল, কাপ্তাই জলবিদ্যুত্ প্রকল্প এলাকা, বেতবুনিয়া ভূ-উপগ্রহ কেন্দ , রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন শিল্প কারখানা, সরকার বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নামে রেকর্ডকৃত ভূমির অস্তিত্ব বিলুপ্ত হবে।
