শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নে পুরনো পথ বেছে নিতে হবে :সন্তু লারমা

আপডেট : ০২ ডিসেম্বর ২০১২, ২২:১৬
পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি’র চেয়ারম্যান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা ওরফে সন্তু লারমা পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন দাবি করে বলেছেন, চুক্তির বাস্তবায়ন হতেই হবে। দীর্ঘ ২০ বছর সংগ্রামের মধ্য দিয়ে সরকারকে বাধ্য করা হয়েছিল এই চুক্তি করতে। শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নে পদক্ষেপ দেখে মনে হচ্ছে, চুক্তির সময়ে যারা বিরোধিতা করেছিল এখন ক্ষমতাসীনরাও তাদের দলে যুক্ত হয়েছেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, ১৫ বছর আগে যে শান্তিচুক্তি করা হয়েছিল তা কি পাহাড়ে শান্তি ফিরিয়ে আনার জন্য, নাকি শুধু আমাদের আন্দোলনকে স্তব্ধ করার জন্য। চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য যে পথ অবলম্বন করা হয়েছিলো, চুক্তি বাস্তবায়নেও কি সেই একই পথ বেছে নিতে হবে? গতকাল রবিবার সকালে রাজধানীর রমনা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটের সেমিনার কক্ষে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ১৫তম বর্ষপূর্তি উপলক্ষে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি ও চুক্তি বাস্তবায়ন শীর্ষক আলোচনা সভায় তিনি একথা বলেন। পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি আলোচনা সভার আয়োজন করে। সন্তু লারমা পার্বত্য শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নে সরকারের আগ্রহ নেই বলে অভিযোগ করে বলেন, ১৬ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রীর সাথে আমি দেখা করে লিখিতভাবে চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য আবেদন করেছিলাম। তিনি আমাকে মৌখিকভাবে আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু আজ ১০ মাস অতিবাহিত হলেও কোন ধরনের পদক্ষেপ নেননি। তাহলে কি আমরা বুঝবো যে, এই চুক্তি কেবল জুম্ম জনগণের অস্ত্র কেড়ে নিতেই করা হয়েছিল? নাকি এই চুক্তির পিছনে কোন জাতীয় বা আন্তর্জাতিক বিরোধিতা ছিল? বোঝা যাচ্ছে, সরকার সহজে চুক্তি বাস্তবায়ন করবে না। কারণ বর্তমান জোট দুই মেয়াদে ক্ষমতায় থাকলেও এখন পর্যন্ত কেবল আশ্বাস দিয়েই যাচ্ছে। ১৫ বছরে বাস্তবায়নের তেমন কোন বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। প্রবীণ রাজনীতিবিদ পঙ্কজ ভট্টাচার্য বলেন, চুক্তি নিয়ে যদি হেলাফেলা করা হয় তাহলে তার ফলাফল কি হবে সেটাও সরকারের অজানা নয়। শান্তি চুক্তির রাজনৈতিক পন্থা আপনারা শাসকগোষ্ঠী পরিহার করেছেন কিনা তা দেশবাসী ও বিশ্ব্ববাসীকে জানান। সংসদ সদস্য ফজলে হোসেন বাদশা বলেন, শান্তিচুক্তির পক্ষে সেদিন যারা ছিলেন, আজো তারা বলছেন, শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন করা হোক। তাহলে দ্বিধা কোথায়? সরকার কি চুক্তি বাস্তবায়নে বিএনপি-জামায়াতের সমর্থন চান। আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং বলেন, আদিবাসীদের ধোঁকা দেয়ার জন্যই কী ১৫ বছর আগে শান্তিচুক্তি করেছিলেন? আদিবাসীরা তো সবসময় প্রস্তুত সহযোগিতা করতে। অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস বলেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আদিবাসীদের অপমান করেছেন। জাতিসংঘে গিয়ে বলেছেন, এদেশে কোনো আদিবাসী নেই, বাঙালিরাই আদিবাসী। স্বাগত বক্তব্যে জনসংহতি সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক শক্তিপদ ত্রিপুরা বলেন, ক্ষমতাসীন জোট নির্বাচনী ইশতেহারে বলেছিলো শান্তিচুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন করবে। ভূমি কমিশনের জটিলতা নিরসনের কথা থাকলেও তারা ভূমির জরিপ নিয়ে ব্যস্ত। দিপায়ন খীসার পরিচালনায় আরো বক্তব্য রাখেন আদিবাসী পরিষদের সভাপতি রবীন্দ্র সরেণ, সাংবাদিক আবু সাঈদ খান, ডা. অসিতবরণ রায়, নূরুল রহমান সেলিম, আবু হামিদ শাহবুদ্দিন, করিম শিকদার প্রমুখ। রাঙ্গামাটি প্রতিনিধি জানান, গতকাল রাঙ্গামাটিতে জনসংহতি সমিতি, আওয়ামী লীগ, সমঅধিকার আন্দোলন, পার্বত্য নাগরিক পরিষদ, পার্বত্য ছাত্র পরিষদ ও পার্বত্য ছাত্র ঐক্য পরিষদ পাল্টাপাল্টি মিছিল সমাবেশ ও মানববন্ধন করেছে। চুক্তি পূর্ণ বাস্তবায়নের দাবিতে রাঙ্গামাটি জিমন্যাশিয়াম প্রাঙ্গণে জনসংহতি সমিতির সমাবেশে সমিতির সহ-সভাপতি উষাতন তালুকদার প্রধান অতিথি হিসাবে বক্তৃতা করেন। অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন কমরেড শাহ আলম, প্রকৃতিরঞ্জন চাকমা। উষাতন তালুকদার বলেন, পার্বত্য শান্তিচুক্তির জন্য পাহাড়ের জনগণ অনেক রক্ত দিয়েছে। বাস্তবায়নে আবারো রক্ত দিতে পাহাড়ের জনগণ প্রস্তুত। রাঙ্গামাটি আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের সামনে আলোচনা সভায় জেলা সভাপতি ও পার্বত্য প্রতিমন্ত্রী দীপংকর তালুকদারের সভাপতিত্বে বক্তব্য রাখেন চিংকিউ রোয়াজা, পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান নিখিল কুমার চাকমা, রফিকুল মাওলা, জাহিদ আক্তার, শামসুল আলমসহ নেতৃবৃন্দ। পার্বত্য চুক্তিকে কালো চুক্তি আখ্যায়িত করে বাতিলের দাবি জানিয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম সমঅধিকার আন্দোলন, পার্বত্য বাঙালি ছাত্র পরিষদসহ সমমনা বাঙালি সংগঠনগুলো। চুক্তি বাতিলসহ সমঅধিকারের দাবিতে বাঙালিরা রাঙ্গামাটি জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সামনে মানববন্ধন করে। রাঙ্গামাটি পৌর টাউন হলে সমাবেশ করে পার্বত্য নাগরিক পরিষদ। এডভোকেট ইয়াকুব আলী চৌধুরীর নেতৃত্বে বিক্ষোভ মিছিল বের হয়ে শহর প্রদক্ষিণ করে জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি দেয়। বাঙালি নেতারা বলেন, এই চুক্তি বাস্তবায়নের নামে পাহাড়ের বাঙালিদের সঙ্গে বৈষম্য সৃষ্টির পাঁয়তারা মেনে নেয়া হবে না বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।