সংশয় নির্বাচন নিয়ে

নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের দাবিতে অনড় খালেদা জিয়া

আপডেট : ০২ ডিসেম্বর ২০১২, ২২:২৮
বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকার তথা নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে অনড়। এই দাবিতে তিনি কোন আপোস করতে রাজি নন। ২০১১ সালের ৩০ জুন জাতীয় সংসদে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিল হওয়ার পর থেকে আন্দোলন করছে বিএনপি। ইতিমধ্যে এই দাবিতে বিএনপি ৬টি হরতাল করেছে। এই গত বছরের ৫ জুন হরতালের সূচনা ঘটে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের পরিকল্পনার প্রতিবাদে। এরপর জুনের ১২ ও ১৩ তারিখ ৩৬ ঘন্টা এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুন:প্রতিষ্ঠার দাবিতে ৬, ৭, ৮ জুলাই-৪৮ ঘন্টার লাগাতার হরতাল পালন করেছে। বেগম খালেদা জিয়া ৬ বিভাগে রোড মার্চ করেছেন। দাবি আদায়ে গণমিছিল-গণঅনশন, রোডমার্চ-সমাবেশ-গণসংযোগ করেছে। সর্বশেষ পর্যায়ে বেগম খালেদা জিয়া চূড়ান্ত আন্দোলনের পরিকল্পনা করছেন। আগামী বছরের শুরু থেকে হরতাল-অবরোধসহ বিভিন্ন কর্মসূচির পালন করা হবে বলে গত ২৮ নভেম্বর ঢাকার জনসভা থেকে ঘোষণা দিয়েছেন। এই দাবির জোর ভারি করতে ৪ দলীয় জোট সম্প্রসারণ করে ১৮ দলীয় জোট গড়া হয়েছে। রাজপথে দাবি জানানোর পাশাপাশি কূটনৈতিক চ্যানেলে জোরালো লবিং করছেন বিএনপি নেতারা। বেগম জিয়া প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে সে দেশ সফর করে এসেছেন। ভারতের প্রতি চিরাচরিত ’কঠোর’ বক্তব্য থেকে সরে এসেছেন তিনি। গত ১২ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সংলাপে যোগ দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহালের দাবি জানান খালেদা জিয়া। রাষ্ট্রপতিকে তিনি বলেন, অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, অংশগ্রহণমূলক একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের লক্ষ্যে সর্বাগ্রে নির্দলীয়, নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল করতে হবে। এর জবাবে রাষ্ট্রপতি মোঃ জিল্লুর রহমান তার সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতার কথা জানান। তার আগে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা পুনর্বহাল করার দাবিতে গত বছরের শেষ ভাগে সিলেট অভিমুখে রোডমার্চ শুরু করেন খালেদা জিয়া। পর্যায়ক্রমে অন্য বিভাগগুলোতে রোড মার্চ শেষে ১২ মার্চ ’ঢাকা চলো মহাসমাবেশ’ করা হয়। খালেদা জিয়া বলেছেন, নিজেদের অধীনে নির্বাচন করলে আওয়ামী লীগ মস্ত বড় ভুল করবে। তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা পুনর্বহাল করে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ব্যবস্থা সরকারকেই করতে হবে। তত্ত্বাবধায়ক ছাড়া কোনো রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশ নেবে না। একই সঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক পুনর্বহাল না করে নির্বাচন কমিশন গঠনকে 'ভাওতাবাজি' বলে অভিহিত করেন তিনি। তিনি এই নির্বাচন কমিশন বাতিল করে সকলের মতামতের ভিত্তিতে সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য একটি কমিশন গঠনের দাবি করছেন। বেগম জিয়া জনসভায় বক্তৃতার পাশাপাশি গত মার্চ মাসে জাতীয় সংসদে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি তুলে ধরেন। খালেদা জিয়া বলেন, জনগণের মতামতের তোয়াক্কা না করে সংবিধানে পঞ্চদশ সংশোধনী তারা ব্রুট মেজরিটির জোরে পাস করেছেন। কিন্তু জনগণ এই সংশোধনী গ্রহণ করেনি। তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদের নির্বাচন চায়। এটা শুধু বিরোধী দলের নয়, আজ এটা জাতীয় দাবিতে পরিণত হয়েছে। তবে বেগম জিয়া এই অবধি নির্দলীয় সরকারের কোন রুপরেখা দেননি। গঠন প্রক্রিয়ার কথাও বলেননি। কেবল বলছেন, সংসদে নিরপেক্ষ সরকারের পদ্ধতির বিল পাস করতে হবে। এদিকে জামায়াতকে নিয়ে বিএনপি আছে বড় চাপে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে স্বচ্ছতা দাবি করে আসছেন বেগম খালেদা জিয়া। তিনি বারবার বলছেন, জামায়াত এক সময় আওয়ামী লীগের সঙ্গে থেকে বিএনপির বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছে। তখন তারা তাদের চোখে যুদ্ধাপরাধী ছিল না। এখন আমাদের (বিএনপি) সঙ্গে এসেছে এজন্য তাদের যুদ্ধাপরাধী বলা হচ্ছে। সরকার এবং বাম বলয় থেকে জামায়াতের সঙ্গ ত্যাগের জবাবে বেগম জিয়ার বক্তব্য হচ্ছে-’তারা জামায়াতকে আমাদের জোট থেকে বের করে নিয়ে একদলীয় নির্বাচন করতে চায়। সেখানে জামায়াতকে রাখতে চায় সরকার। এই কারণে জামায়াতের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রহসন চলছে। জামায়াতের সঙ্গে সরকারের লোকেরা তলে তলে যোগাযোগ করছে।’ বেগম খালেদা জিয়া বর্তমান বিচার বিভাগ ও দুদকের ওপর পুরোপুরি আস্থা হারিয়ে ফেলেছেন। তিনি প্রায় প্রতিটি সমাবেশে বলছেন, বিচার বিভাগ দলীয়করণ করা হয়েছে। সেখানে দুই রকম বিচার চলছে। সরকারের লোকদের জন্য এক বিচার আর বিরোধী দলের আরেক বিচার। বিচারবিভাগে ন্যায় বিচার পাওয়া যায় না। দলীয় লোক বসানো হয়েছে। দুদকের চেয়ারম্যানসহ কর্মকর্তাদের বিচারের মুখোমুখি হতে প্রস্তুত হওয়ার জন্য বলেছেন খালেদা জিয়া। তিনি বলেছেন, এই দুদক আছে কেবল দুর্নীতিবাজ মন্ত্রী এমপিদের সত্ চরিত্রের সার্টিফিকেট দেয়ার জন্য। তারা বিরোধীদলের নেতাদের নামে মামলা করছেন আর সরকারের দুর্নীতিবাজদের রক্ষা করতে সার্টিফিকেট দিচ্ছেন। পদ্মা সেতুতে তারা এতো দিন দুর্নীতি পায়নি। এখন বিশ্বব্যাংক তদন্তে আসার পর তারা দুর্নীতির গন্ধ পাচ্ছে। তিনি বলেন, জোট সরকার ক্ষমতায় এলে প্রথমেই দুদককে ধরা হবে। বেগম খালেদা জিয়া সরকারের দুর্নীতি নিয়ে বক্তব্য বিবৃতিতে সবচেয়ে বেশী উচ্চকণ্ঠ। প্রতিটি জনসভায় তিনি প্রায় অভিন্ন কণ্ঠে দুর্নীতির কথা তুলে ধরছেন। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে তার ভাষণের পুরোভাগ জুড়ে থাকছে-হলমার্ক, ডেসটিনি, পদ্মাসেতু, কুইক রেন্টাল, শেয়ার বাজার কেলেংকারির চিত্র। বিএনপি সূত্র জানিয়েছে, বিএনপির একটি সেল প্রধানমন্ত্রী ও তার পরিবারের ’দুর্নীতি’র নিয়ে একটি গ্রন্থপঞ্জি ও তথ্যচিত্র নির্মাণে হাত দিয়েছে। এদিকে সরকারকে অচিরেই এক ঘরে করার জন্য বেগম জিয়া বারবার সরকারের সাথে থাকা দলগুলোকে চলে আসার আহ্বান জানাচ্ছেন। এমনকি সরকারের সাথে থাকলে আগামীতে দুর্নীতির ’সহযোগী’ হিসাবে বিচারের মুখোমুখি হতে হবে বলেও এক ধরনের প্রচ্ছন্ন হুমকি দিচ্ছেন।