সহকারী জজ জাভেদের বিরুদ্ধে অভিযোগের অন্ত নেই

আপডেট : ০২ ডিসেম্বর ২০১২, ২২:৩৬
ফেনসিডিলসহ গ্রেফতার সিনিয়র সহকারী জজ জাভেদ ইমাম ছাত্র জীবন থেকেই মাদকাসক্ত ছিলেন। যশোরে বিচারক হিসাবে কর্মরত থাকাকালে তার বিরুদ্ধে নারী কেলেংকারি, ফেনসিডিল বিক্রি, ঘুষের বিনিময়ে আসামি জামিন, মামলার আলামত পাচারসহ নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠে। এ কারণে তাকে সেখান থেকে প্রত্যাহার করা হয়। মূলত যশোরে তিনি ফেনসিডিল ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। গত শনিবার রাতে ফেনসিডিল বিক্রি করার সময় রাজধানীর নিউ মার্কেট থানা পুলিশের হাতে গ্রেফতার হন তিনি। গতকাল রবিবার নিউ মার্কেট থানা পুলিশ তাকে সিএমএম আদালতে হাজির করলে আদালত তার জামিন নামঞ্জুর করে জেল হাজতে পাঠিয়ে দেন। তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নিয়েছে আইন মন্ত্রণালয়। এদিকে ফেনসিডিলসহ একজন বিচারকের গ্রেফতারের ঘটনায় বিচার বিভাগসহ বিভিন্ন মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। গ্রেফতার হলেন যেভাবে জাভেদ জিজ্ঞাসাবাদে জাভেদ পুলিশকে জানান, গত শনিবার ভোরে যশোর থেকে (ঢাকা মেট্রো-চ-৭০৯৬) মাইক্রো বাসযোগে জাভেদ ফেনসিডিল নিয়ে ঢাকায় রওয়ানা দেন। তিনি নিজেই মাইক্রোবাসটি চালাচ্ছিলেন। আর কেউ ছিলো না গাড়িতে। তিনি জানান, তার সন্তান নেই। স্ত্রীর বিদেশে চিকিত্সাবাদ ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা প্রয়োজন। টাকার জন্য তিনি যশোরে তার বন্ধু সুমনের কাছে গিয়েছিলেন। সুমন তাকে এক বস্তা ফেনসিডিল দিয়ে বলেন, আপনি ঢাকায় এক ব্যক্তির কাছে এ ফেনসিডিল পৌঁছে দিলে আপনাকে এক লাখ ২০ হাজার টাকা দেবে। টাকার জন্যই তিনি ফেনসিডিল নিয়ে ঢাকায় আসেন। পরে পুলিশের তদন্তে আরও চমকপ্রদ তথ্য বেরিয়ে আসে। যশোর থেকে দৌলতদিয়া ঘাটে আসার পর ঢাকার লিংকন নামে এক মাদক ব্যবসায়ীর সঙ্গে জজ কথা বলেছেন। লিংকন ফেনসিডিল নিবেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে আরও একজন ব্যবসায়ী একশ বোতল ফেনসিডিল ক্রয় করবেন বলে জাভেদকে জানিয়েছেন। শনিবার সন্ধ্যায় ঢাকা পৌঁছে জজ বিভিন্ন স্থানে ফেনসিডিল বিক্রি করার জন্য ঘুরতে থাকেন। প্রতি বোতল ফেনসিডিলের মূল্য ৪৫০ থেকে ৫শ টাকা নির্ধারণ করা হয়। রাফিন প্লাজার সামনে এক ক্রেতার জন্য অপেক্ষা করছেন জাভেদ গোপন সূত্রে এ সংবাদ পেয়ে পুলিশ মাইক্রোবাসসহ জাভেদকে গ্রেফতার করে। তার মাইক্রোবাস থেকে ৩৪২ বোতল ফেনসিডিল, একটি পিস্তল, ৯ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করে পুলিশ। পুলিশের কাছে নিজের পরিচয় ও তিনি ভোলায় কর্মরত আছেন এ তথ্য দেন। পুলিশের কাছে তার অস্ত্রের লাইসেন্সও দেখান। পুলিশ জাভেদের গ্রামের বাড়ি ঝিনাইদহ সদরে খোঁজ খবর নিচ্ছে। জানা গেছে, জাভেদের বাবা একজন আইনজীবী। তার নাম অ্যাডভোকেট খালিদ ইমাম। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিভাগে পড়াশোনা করেন জাভেদ ইমাম। দ্বিতীয় বর্ষেই তিনি ফেনসিডিলে আসক্ত হন বলে তার এক সহকর্মী জানান। ২০০৮ সালে জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট হিসাবে তিনি কুষ্টিয়ায় যোগ দেন। পরে যশোরে বদলি হন। জজ জাভেদকে সাময়িক বরখাস্তের সিদ্ধান্ত ফেনসিডিল ও অস্ত্রসহ আটকের ঘটনায় জাভেদ ইমামকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মোকদ্দমা দায়েরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। গতকাল রবিবার এ সংক্রান্ত প্রস্তাব অনুমোদনের জন্যে সুপ্রিম কোর্টে পাঠিয়েছে আইন বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়। আজ সোমবার জিএ কমিটিতে এ প্রস্তাব অনুমোদন পেতে পারে বলে জানা গেছে। আইন মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো প্রস্তাবে বলা হয়েছে, একজন বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তার এ ধরনের অনৈতিক কার্যকলাপ গুরুতর অসদাচরণের শামিল। কোন সরকারি কর্মচারী গ্রেফতার হলে তিনি সঙ্গে সঙ্গে সাময়িকভাবে বরখাস্ত হয়েছেন বলে গণ্য হওয়ার বিধান আছে। জাভেদ ইমামের নানা অনিয়ম দুর্নীতি আমাদের যশোর অফিসের আহমেদ সাঈদ বুলবুল জানান, জাভেদ ইমাম যশোরে দায়িত্ব পালনকালে নানা অভিযোগে অভিযুক্ত ছিলেন। তার বিরুদ্ধে নারী কেলেঙ্কারিসহ নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ এনে আইনজীবীরা সেপ্টেম্বর মাস থেকে তার আদালত বর্জন করেন। আইনজীবীরা প্রধান বিচারপতির কাছে দাবি জানান, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের। অব্যাহত আদালত বর্জনের মুখে ২৩ অক্টোবর যশোর থেকে তাকে প্রত্যাহার করে নেয়া হয়। গত সেপ্টেম্বর মাসে যশোরের ১৪৬ জন আইনজীবী জেলা বারের সভাপতিকে লেখা এক অভিযোগে ওই বিচারকের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট ১১টি অভিযোগসহ বেশকিছু অভিযোগ আনেন। অভিযুক্ত ম্যাজিস্ট্রেটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি সম্বলিত অভিযোগপত্রের অনুলিপি প্রধান বিচারপতি, আইন মন্ত্রী ও সচিব এবং জেলা ও দায়রা জজের কাছে প্রদান করা হয়। আইনজীবীদের লিখিত অভিযোগে বলা হয়, শার্শা ও বেনাপোল পোর্ট থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত ওই জুডিসিয়াল বিচারক তার আমলী আদালতের এবং বিচারাদালতের যেকোনো মামলায় তার সাথে যোগাযোগ করে সন্তষ্ট করলে কাঙ্ক্ষিত ফল লাভ করা যায়। তিনি অস্বাভাবিক এবং এখতিয়ার বহির্ভূতভাবে বিভিন্ন মামলায় জামিন এবং আলামত জিম্মায় প্রদান করে থাকেন। তার সীমাহীন দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতা আদালত অঙ্গনে সর্বজনবিদিত উল্লেখ করে অভিযোগ করা হয়, জেলা ও দায়রা জজ একটি দস্যুতা মামলার জামিন নামঞ্জুর করার পর অভিযুক্ত ম্যাজিস্ট্রেট ওই আসামির জামিন মঞ্জুর করেন। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ডের বিধান আছে এমন একটি মামলার একজন আসামিকেও (এক কেজি হেরোইনসহ আটক) তিনি জামিন দিয়েছেন। ৫০১ গ্রাম সোনার বারসহ আটক হওয়া একজন আসামি যার সর্বোচ্চ সাজা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে পারে এমন আসামিও তিনি জামিন দিয়েছেন। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে গ্রেফতারকৃত অপর এক আসামির রিমান্ডের আবেদন নামঞ্জুর করে একইদিন জামিন মঞ্জুরের নজিরবিহীন ঘটনাও তার আদালতে রয়েছে। একই মামলায় একই ফরোয়ার্ডিংয়ে ৪ জন আসামির মধ্যে ৩ জনের শুনানি পেন্ডিং রেখে অপর এক আসামির জামিন মঞ্জুরের মতো নজিরবিহীন ঘটনাও রয়েছে ওই আদালতের। অসংখ্য মাদকের মামলা, বিশেষ ক্ষমতা আইনের মামলাসহ গুরুত্বপূর্ণ মামলায় তিনি যোগাযোগের মাধ্যমে জামিন প্রদান করেন, রিমান্ড না-মঞ্জুর করেন এবং আলামত জিম্মায় প্রদান করেন। তার বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ তিনি মালখানার দায়িত্বে থাকাকালে মালখানার স্টাফদের সহায়তায় কোটি টাকার আলামত অবৈধ সুযোগ গ্রহণ করে বেআইনিভাবে হস্তান্তর করেছেন। মাদকের আলামত ধ্বংসের নামে গোপনে মাদক ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রয় করা হয়েছে বলেও তার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ আনেন আইনজীবীরা। অভিযোগে আরও বলা হয়, একজন মহিলা কনস্টেবলের সাথে যশোর শহরের প্রাণকেন্দে র আবাসিক হোটেলে অসামাজিক কাজ করার সময় তিনি ধরা পড়েন এবং তার আদালতে কর্মরত সিএসআই উজ্জ্বলের সহায়তায় ছাড়া পান। এ ব্যাপারে জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সম্পাদক অ্যাডভোকেট কাজী ফরিদউদ্দীন আহমেদ বলেন, ঢাকায় ফেনসিডিলসহ ধরা পড়ার ঘটনার মধ্য দিয়ে প্রমাণ হয় আমরা জাভেদ ইমামের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ করেছিলাম, তা সঠিক ছিল। কিন্তু তার দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে এখনও কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত হয়নি। অবিলম্বে তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান তিনি। কুষ্টিয়াতেও অসন্তোষ ছিল জাভেদ ইমামের চাকরি শুরু করেন কুষ্টিয়ায়,২০০৮ সালে। শুরুতেই তার দুর্নীতি ও অনিয়মের বিষয় কুষ্টিয়ার আইজীবীদের মধ্যে আলোচনায় আসে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কুষ্টিয়ার একাধিক আইনজীবী ইত্তেফাককে বলেন, তারা জাভেদ ইমামকে ‘খারাপ প্রকৃতির, আইনের বরখেলাপকারী ও ঘুষখোর’ হিসেবেই জানতেন। কুষ্টিয়ার আইনজীবীদের অসন্তোষ দানা বাঁধার আগেই তাকে বদলি করা হয় যশোরে। যশোরে অসন্তোষের তীব্রতায় তাকে বদলি হতে হয় ভোলায়। যশোরের টক অব দ্য টাউন জাভেদ ইমাম যশোরে দায়িত্ব পালনকালে নানা অভিযোগে আইনজীবীরা হতভম্ব হয়ে পড়েন। একপর্যায়ে চূড়ান্ত কর্মসূচি হিসেবে তার আদালত বর্জন এবং দুর্নীতি ও অনিয়ম তদন্তের দাবি জানান আইনজীবীরা। অধিকাংশ আইনজীবী এ ব্যাপারে ঐকমত্য পোষণ করলেও কেউ কেউ জাভেদ ইমামের পক্ষ নেন। এতে আইনজীবীরা দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েন। জাভেদ ইমামের পক্ষভুক্তরা জেলা আইনজীবী সমিতির নেতাদের ব্যবহার করে জাভেদ ইমামের বিরুদ্ধাচারণকারী সাত আইনজীবীকে বার থেকে বহিষ্কার করেন। এ নিয়ে ইত্তেফাকসহ জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিকে সংবাদ প্রকাশ হয়। শনিবার রাতে ঢাকায় ফেনসিডিলসহ তার গ্রেফতারের খবর ইলেকট্রনিক মিডিয়া ও স্থানীয় সংবাদপত্রে গুরুত্বের সাথে প্রকাশের পর গতকাল তা শহরের টক অব দ্য টাউনে পরিণত হয়। আদালতপাড়া ছাড়াও শহরের বিভিন্ন স্থানে এ ঘটনা আলোচনা হতে দেখা যায়। সেই গাড়ির কথা যে মাইক্রোবাসে ফেনসিডিলসহ জাভেদ ইমাম গ্রেফতার হয়েছেন, সেটি তিনি ১৩ লাখ টাকায় মাত্র ৫-৬ মাস আগে যশোর শহরের ব্যবসায়ী মারুফের কাছ থেকে কেনেন। গাড়িটি ঝিনাইদহ পূবালী ব্যাংকের লিগ্যাল এডভাইজার তার পিতার বলে সহকর্মীদের কাছে প্রচার করতেন। ঈদুল আজহার ২-৩ দিন পর তিনি গাড়ির কাজ করতে শহরের রবিউল মটরস এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কসে দেন। প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার রবিউল ইসলাম গতকাল ইত্তেফাককে জানান, তিনি জাভেদ ইমামের অনুরোধে শরাফত মটরস থেকে ১৪ হাজার টাকার মালামাল কিনে গাড়িতে লাগান এবং তারই অনুরোধে সম্পূর্ণ টাকা বাকি রেখে ড্রাইভারের কাছে ডেলিভারি দেন। কিন্তু তার পর থেকে বহুবার মোবাইলে রিং করে এবং এসএমএস পাঠিয়েও তার কোনো সাড়া পাননি।