আমাদের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর

আপডেট : ০৪ ডিসেম্বর ২০১২, ১৮:০৮
প্রাচীন সভ্যতার দেশ হিসেবে বাংলাদেশের সুনাম সর্বজনবিদিত। সেই অতীত থেকে এই অঞ্চলের মানুষ যুগে যুগে সভ্যতার নির্মাণে অবদান রেখে চলেছেন। খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতক থেকে দ্বাদশ শতক পর্যন্ত এই অঞ্চলে মৌর্য, গুপ্ত পাল ও সেন বংশীয় রাজারা দেশ শাসন করেছেন। পালযুগে বাংলার সভ্যতার আরো উন্নতি ঘটে। সুলতানী আমলে বাংলায় শিল্প-সাহিত্য বিশেষভাবে বিকশিত হয়। ষোড়শ শতকে বাংলা মোগল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৭৫৭ সালে ২৩শে জুন পলাশীর যুদ্ধের পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এ অঞ্চলের কর্তৃত্ব লাভ করে। ১৮৫৭ সালে সিপাহী যুদ্ধের পর বাংলা ইংরেজদের শাসনভুক্ত হয়। ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে ভারত উপমহাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে। আমাদের পূর্ব বাংলার নাম হয়ে যায় পূর্ব পাকিস্তান এবং আমরা হয়ে যাই পাকিস্তান নামক একটি দেশের বাসিন্দা। কিন্তু আমাদের শাসন ও শোষণ শুরু করে পশ্চিম পাকিস্তানের মানুষেরা। তারা আমাদের মাতৃভাষা বাংলাকে বিলুপ্ত করার ষড়যন্ত্র করে। ষাটের দশকে শুরু হয় স্বায়ত্ত শাসনের আন্দোলন। ১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দে শুরু হয় প্রবল আন্দোলন এবং গণঅভ্যুত্থান। ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দের নির্বাচনে বাঙালির বিপুল বিজয় ঘটে। কিন্তু পাকিস্তানি শাসকেরা ক্ষমতা অর্পণ না করে পঁচিশে মার্চ দিবাগত কালো রাতে বাঙালি নিধনে মত্ত হয়ে ওঠে। বন্দী করে বাংলার অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। ২৬শে মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয় এবং প্রতিরোধে এগিয়ে আসে বাংলার স্বাধীনতাকামী মানুষ। গঠিত হয় মুজিবনগর সরকার এবং পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে হঠানোর জন্য শুরু হয় সর্বাত্মক মুক্তিযুদ্ধ বা স্বাধীনতার যুদ্ধ। এই যুদ্ধ ন’মাস চলে। অবশেষে ষোলই ডিসেম্বর পাকবাহিনী আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে এদেশের মানুষের বিজয় সূচিত হয়। বিশ্বের মানচিত্রে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস বড়ই করুণ ও বেদনাদায়ক। সেই যুদ্ধে আমরা হারিয়েছি আমাদের ত্রিশ লক্ষ স্বজন। সম্ভ্রম হারিয়েছেন আমাদের মা-বোনেরা। লক্ষ মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে শরণার্থী হয়েছিলো ভারতে। গোটা দেশকেই একটা ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছিলো পাক হায়েনারা। সেই যুদ্ধে বাঙালির বীরত্বের কথাও বিশ্ববাসীর জানা। তাঁদের আত্মত্যাগে ও শৌর্য-বীর্যের কাহিনী ইতিহাসের স্বর্ণালি পাতায় লিপিবদ্ধ হয়েছে। লক্ষ-কোটি বছর পরও সেই যুদ্ধের কথা জানতে পারবে বাঙালি জাতির উত্তরাধিকারীরা। আর প্রত্যক্ষ করতে পারবে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্মারক- স্মৃতিসৌধ্য, বধ্যভূমি, গণকবর এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে নির্মিত ভাস্কর্যগুলো। আর জাদুঘরে গিয়ে দেখতে পাবে সপ্রমাণ তথ্যাদি অর্থাত্ সংগৃহীত মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক নিদর্শন। তাই অন্যান্য জাদুঘর থেকে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর বিষয়-বৈশিষ্ট্যে সম্পূর্ণ আলাদা। স্বাধীনতার ২৫ বছর পর অর্থাত্ ১৯৯৬ খ্রিষ্টাব্দে ২২শে মার্চ ঢাকায় ৫-সেগুন বাগিচায় প্রতিষ্ঠিত হয় বাঙালির জাতিসত্তার স্মৃতিবাহী প্রতিষ্ঠান মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। এটি উদ্বোধন করেন শহীদ বুদ্ধিজীবী রশিদুল হাসান এর নাতনী আর্চি। বিশ্বের মুক্তিকামী জনগণ এবং ধর্ম-বর্ণ-সম্প্রদায়গত বিভেদের নামে নৃশংসতার শিকার সকল মানুষের উদ্দেশে উত্সর্গীত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। মুক্তি ও স্বাধীনতার স্পৃহায় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ মানুষ যে পারে সকল বাধা-বিপত্তি দূর করে এগিয়ে যেতে তার পরিচয় মেলে ধরেছে এই জাদুঘর। সর্বোপরি বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের দীর্ঘ সংগ্রামে অকুতোভয় জনগণের বিপুল আত্মদান ও মুক্তির স্বপ্নকে বহন করেছে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। শত শত মানুষ প্রতিদিন এই জাদুঘরটি পরিদর্শন করেন। ছুটে আসেন বিদেশিরা এবং আমাদের গ্রামবাংলার সাধারণ মানুষেরা। তোমরা যারা মুক্তিযুদ্ধের পরে বাংলার মুখ দেখেছো, তারা এখানে বসে প্রথমেই দেখবে নজর কাড়া চারকোণা কালো মার্বেলের পাথরে কেন্দ্রীয় অংশে প্রজ্বলিত ‘শিখা অনির্বাণ’। তার সামনে কালো বোর্ডে খোদিত এই পঙতিমালা ‘সাক্ষী বাংলার রক্তেভেজা মাটি/ সাক্ষী আকাশের চন্দ্রতারা/ ভুলি নাই শহীদের কোনো স্মৃতি। ভুলব না কিছুতেই আমরা।’ দোতলা দালানের মধ্যে ছয়টি গ্যালারিতে বা কক্ষে ছয় রকমের স্মৃতি সংরক্ষণ করা হয়েছে। নিচতলার প্রথম গ্যালারিতে দেখা যাবে ১৭৫৭ সালে পলাশীর আম্র কাননে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য কিভাবে কারা জোর করে ডুবিয়ে দিয়ে অন্ধকারের ইতিহাস সৃষ্টি অধ্যায় শুরু করে। ১৯৪৭ সালের ভারত বিভাগ ও পাকিস্তান সৃষ্টির ধারাবাহিক ইতিহাসের জন্ম দিয়েছে। তার স্বাক্ষর সুন্দর পরিপাটি করে সাজানো আছে। আরো আছে বাঙালির সুপ্রাচীন ঐতিহ্য, বিভিন্ন অঞ্চলের ভূমিকা গঠনের প্রাচীন তত্ত্বের নিদর্শন। ময়নামতি, পাহাড়পুর, ষাটগম্ভুজ মসজিদ মডেল’। পলাশী প্রান্তরের নকশা, সিপাহী বিদ্রোহ, টিপু সুলতান, তিতুমীরের অংকিত চিত্র, ক্ষুদিরাম, প্রীতিলতা, মাওলানা মোহাম্মদ আলী, শওকত আলী ও ঢাকা ভার্সিটি কমিটির আলোকচিত্র এবং রবীন্দ্রনাথের ছোট ভাস্কর্য, অবিভক্ত ভারত ও বাঙালি জাতির ইতিহাস, ঐতিহ্যের চমত্কার সব প্রমাণ। দ্বিতীয় গ্যালারিতে দেখতে পাবে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকে ১৯৬৯ পর্যন্ত পাকিস্তানিদের বৈষম্য, অত্যাচার, শোষণ ও নির্মমতার কঠিন চিহ্ন। এ সব আলোকচিত্র ও মুদ্রিত হরফে দেখানো হয়েছে। এই ঘরটিতেই সংগ্রহ করা হয়েছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ব্যবহূত পোশাক, কলম, পাইপ, রুমাল ও চিঠিপত্র। তৃতীয় গ্যালারির প্রদর্শন সূচিই হয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চ ১৯৭১-এর উদাত্ত আহ্বানের দ্বারা। এই আহ্বান ছিলো বাঙালি জাতির মুক্তির জন্য সংগ্রামের ডাক। এর মাধ্যমে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে জনতার অভূতপূর্ব অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়। এখানে ২৫ মার্চ কালরাত্রি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা এবং পরে কালুরঘাটস্থ বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে ২৭শে মার্চ জিয়াউর রহমানের ঘোষণার উপস্থাপন রয়েছে। ছবি, পেপার কাটিং এবং অন্য তথ্যাদির মাধ্যমে লক্ষ্য শরণার্থীর দুর্গতির চিত্র রয়েছে। এছাড়া রয়েছে ১৭ এপ্রিল অস্থায়ী সরকারের ঐতিহাসিক শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান। দর্শক সিঁড়ি দিয়ে ওপর তলায় ওঠার সময় দেখবেন দেয়ালে রয়েছে মুক্তিযোদ্ধাদের সদস্যভুক্তি, প্রশিক্ষণ ও প্রাথমিক প্রতিরোধ পর্যায়ের অনেক ছবি, যা মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বহন করে। পাকিস্তান বাহিনীর নৃশংস গণহত্যাযজ্ঞের প্রমাণাদি বারান্দায় বিভিন্ন পেপারকাটিং এর মাধ্যমে প্রদর্শিত হয়েছে। চতুর্থ গ্যালারিতে দেখতে পাবেন বেশ ক’টি শোকেস। এখানে বিভিন্ন শহীদের ব্যবহূত পোশাক ও অন্যান্য জিনিসপত্র সংরক্ষণ করা আছে। সম্মানিত শহীদদের নাম শহীদ শামসুল করিম খান, রাজশাহী পুলিশ কর্মকর্তা মামুন মাহমুদ, শহীদ শফিকুল আনোয়ার, শহীদ কাজী শামসুল হক, শহীদ ডা. এ,কে এম ফারুক, পিরোজপুরের পুলিশ কর্মকর্তা শহীদ ফয়জুর রহমান আহমেদ (কথাশিল্পী হুমায়ূন আহমেদের বাবা), লে. আনোয়ারুল আজিম, মোশাররফ তাজউদ্দিন আহমেদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিখ্যাত মধুদা। এছাড়া আরো আছে বিদেশের পত্র-পত্রিকায় গণহত্যা সম্পর্কিত বিভিন্ন প্রতিবেদন। ঘরের দক্ষিণ দিকের দরোজা পেরিয়ে করিডোরে দেয়ালে টাঙানো আছে বাংলাদেশের মানচিত্রে চিহ্নিত ছবিসহ তাদের পরিচিতি। পঞ্চম গ্যালারিটি মুক্তিযুদ্ধে সাধারণ মানুষের অবদানের সাক্ষ্য বহন করে। এ ছাড়াও রয়েছে গেরিলা যুদ্ধ, স্বাধীন বাংলা বেতার, নৌ-কমান্ডো, বিমান বাহিনী, নারী সমাজ, মুক্তিযুদ্ধে ব্যবহূত অস্ত্রশস্ত্র, বৈদেশিক সমর্থন এবং বিশেষ করে ভারতীয় জনসাধারণের সমর্থনের প্রতিচ্ছবি। ষষ্ঠ গ্যালারিটি সর্বশেষ কক্ষ। দর্শক এখানে একাত্তরের পরম ত্যাগ ও বেদনার দংশন অনুভব করবেন। এখানে সেই মা দেশপ্রেমিকদের আলোকচিত্র দেখতে পাবেন, যাদেরকে আমরা স্বাধীনতা সংগ্রামে হারিয়েছি। আরো রয়েছে যুদ্ধের চূড়ান্ত পর্বে আমাদের সাথে ভারতীয় বাহিনীর ব্যাপক অংশগ্রহণ ও আত্মত্যাগের পরিচয়। সবশেষে রয়েছে পাকবাহিনীর আত্মসমর্পণের চিত্র এবং পাকবাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকার, আলশামস ও আল-বদরের কাপুরুষোচিত জঘন্যতম হত্যাকান্ডের নিদর্শন। এছাড়া রয়েছে বাংলার বীর যোদ্ধাদের আত্মদানের গৌরবের পরিচয়। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের বিভিন্নমুখি কর্মকান্ডের অন্যতম দিক আউটার কর্মসূচি। ওই কর্মসূচি শুরু হয়েছে ১৯৯৭ খ্রিষ্টাব্দে। এই কর্মসূচির আওতায় তৈরি করা হয়েছে প্রামাণ্য চিত্র ‘বাঙালির মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাস (১৯৪৭-১৯৭১), যা নিয়মিত প্রদর্শন করা হয়। মক্তিযুদ্ধের বাস্তবধর্মী ইতিহাস ও স্বাধীনতা সংগ্রামের চেতনা সম্পর্কে ভবিষ্যত্ প্রজন্মকে অবহিত করা আমাদের কর্তব্য। আসুন আমরা এ দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট হই। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরটি স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠার জন্য বর্তমান সরকার ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালের উত্তর পাশে পশ্চিম আগারগাঁও-এ জমি প্রদান করেছেন। বর্তমানে জাদুঘর নির্মাণের কাজ চলছে। আলোকচিত্র :মোস্তাফিজুর রহমান মিন্টু