মুক্তিযুদ্ধের বীর সৈনিক ওডারল্যান্ড

আপডেট : ০৪ ডিসেম্বর ২০১২, ১৮:০৯
দেশপ্রেম স্বাজাত্যবোধ ছাপিয়ে যখন একাত্মবোধে অভীক তখনই ইতিহাস তাকে অমর করে রাখে। আজকের এই আসরে তোমাদের এক গল্প বলব। গল্পটি নির্ভীক এক বীরের। এই বীর হয়তো বেঁচে নেই। আবার বেঁচে আছে শত বাঙালির হূদয়ের আঙিনায়। বেঁচে আছে তার সাহসিকতার মাঝে। ১৯১৭ সালের ৬ ডিসেম্বর নেদারল্যান্ডের আমস্টারডাম শহরে জন্মগ্রহণ করেন এই নায়ক। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর সৈনিক ওডারল্যান্ড। ডব্লিউ এ এস ওডারল্যান্ড সি, ওডারল্যান্ডের পুত্র। শিক্ষার ধরাবাধা জীবনে বেশিদিন এগোয়নি এ বীরের। মাত্র ১৭ বছর বয়সে জীবিকার তাগিদে সামান্য সু-সাইনার হিসেবে যোগদান করেন নেদারল্যান্ডের বাটা সু-কোম্পানিতে। মাত্র দু’বছর সে চাকরি করার পর পরবর্তীতে তিনি যোগ দেন সেনাবাহিনীতে। সেনাবাহিনীতে তখন তাঁর পদ ছিল রাজকীয় সিগন্যাল কোরের একজন সার্জেন্ট। ১৯৪০ সালে তিনি ছেড়ে দেন সে চাকরি। যোগ দেন জার্মান যুদ্ধ ফেরত ক্যাম্পের তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে। ফ্যাসিবাদের প্রতিবাদস্বরূপ ১৯৪১ সালে হিটলারের জার্মানের বিরুদ্ধে নেদারল্যান্ডের মুক্তিবাহিনীর হয়ে কাজ করেন। সেখানে তার প্রথম কাজ ছিল যুদ্ধক্ষেত্রে যুদ্ধ পরিচালনা। ১৯৪৩-এ যোগ দেন মুক্তিবাহিনীর কমান্ডো বাহিনীতে। একজন কমান্ডো হওয়ার কারণে তিনি শান্তির অন্বেষায় এশিয়া ও ইউরোপ মহাদেশের নিভৃত অঞ্চলগুলোতে যুদ্ধ করেন। জীবন বাজি রেখে তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নেদারল্যান্ডের একজন রেডিও টেকনিশিয়ান, গোলা-বারুদ ও সমর বিশেষজ্ঞ হিসেবে পান ব্যাপক পরিচিতি। একজন মানবতাবাদী হিসেবে তার সামগ্রিক প্রেরণার উত্স ছিলেন যুগোশ্লাভিয়ার প্রয়াত রাষ্ট্রপ্রধান বলকান শার্দূল ‘ফিল্ড মার্শাল টিটো’। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রথম পর্যায়ে তিনি অংশ নেন একজন গোয়েন্দা হিসেবে। বিদেশি হওয়ার কারণে এবং একটি বৃহত্ বিদেশি কোম্পানির কর্ণধার হওয়ার সুবাদে তাঁর অবাধ যাতায়াত ছিল সর্বত্র। কর্মসূত্রে তার সঙ্গে আগেই পরিচয় ছিল পশ্চিম পাকিস্তানস্থ বাটা সু-কোম্পানির পার্সেনাল ম্যানেজার পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বেলুচ রেজিমেন্টের অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল নেওয়াজের। সেই সূত্র ধরে ওডারল্যান্ড কর্নেল নেওয়াজকে ঢাকায় আমন্ত্রণ জানান। এভাবে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সঙ্গে তার গড়ে উঠে হূদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক। কিছুদিন বাদে ঢাকায় আসেন কর্নেল নেওয়াজ এবং তাকে নিয়ে যান ঢাকা সেনানিবাসে। তাকে সেনা হেড কোয়ার্টারে বিবেচনা করা হয় সম্মানীত মেহমান হিসেবে। এই সূত্র ধরেই সেনাসদরের দরজা তাঁর জন্য হয়ে যায় উন্মুক্ত। তার বেশ কিছুদিন পরেই কর্নেল নেওয়াজের মাধ্যমেই তাঁর সাথে জেনারেল টিক্কা খান, জেনারেল নিয়াজী ও পুলিশ কমিশনার চৌধুরীসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন সামরিক ও বেসামরিক পদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে পরিচয় ঘটে। এ কারণেই যুদ্ধের সময় পাক সেনাবাহিনীর গুরত্বপূর্ণ তথ্যগুলো সহজেই পেয়ে যান এবং মুক্তিকামী বাঙালীদের যুদ্ধের পক্ষে তা কাজে লাগান। একাত্তরের পঁচিশে মার্চের ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞের পর তিনি কায়দা করে সংগ্রহ করেন চব্বিশ ঘন্টার জন্য সান্ধ্য আইন পাস। যখন খুশি সেনাসদরে যাবার পাস। এসব পাস কাজে লাগিয়ে তিনি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে পাকবাহিনীর অনেক গোপন তথ্য বের করে সরবরাহ করেছেন। তার এ কর্মকান্ডে কোন বাধ সাধেনি তখনকার অস্ট্রেলীয় হাই কমিশন এবং কমিশনের মদদেই তিনি এগিয়ে গেছেন তাঁর কর্মকান্ড নিয়ে। যুদ্ধকালীন এবং যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে তাঁর সার্বক্ষণিক সঙ্গী ছিলেন বাটার প্যার্সোনাল ম্যানেজার এ.কে.এম আব্দুল হাই। এছাড়া বাটার কর্মকর্তা আব্দুল সালাম, হুমায়ুন কবির খান, নূরুল ইসলাম, ডা. হাফিজুল ইসলাম ভুঁইয়া (কুসুম ডা.) ও আই সি.ডি আর বি-র কর্মকর্তা অ্যামেরিকান নাগরিক ট্রাকার প্রমুখকে নিয়ে একটি টিমওয়ার্ক গড়ে তোলেন। এদের মধ্যে আব্দুস সালাম এবং হুমায়ুন কবির খানকে তিনি গেরিলা ট্রেনিং নেওয়ার জন্য ত্রিপুরার আগরতলায় পাঠান। শুধু তাই নয়, ঝুঁকিপূর্ণ যুদ্ধকালীন মুহূর্তে তিনি পাক রণকৌশল ও পদ্ধতি সম্পর্কিত যাবতীয় তথ্য জেড ফোর্সের অধিনায়ক মেজর জিয়াউর রহমান ও মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি জেনারেল এমএ. জি ওসমানের কাছে সরবরাহ করেছেন। এ.কে.এম আবদুল হাই এর মাধ্যমে পাশাপাশি সি. ওডারল্যান্ড সক্রিয়ভাবেও যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে যুদ্ধকালীন মুহূর্তে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ ও সমর কৌশলের উপর ক্লাসও নিতেন। এছাড়াও তিনি নানাভাবে সক্রিয় ছিলেন আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে। সুযোগ বুঝে বিচক্ষতার সহিত পাকিস্তানিকে অ্যামবুশ করতেন। পাওয়ার লাইন, যোগাযোগ ব্যবস্থা উড়িয়ে দিতেন। পূর্বের বহু অভিজ্ঞতা এ যুদ্ধে তিনি সুদক্ষভাবে ব্যবহার করেন। এছাড়াও যুদ্ধের বিভিন্ন কলাকৌশল শিক্ষা দান, অর্থসাহায্য, ওষুধপত্র, গরম কাপড়, জুতা, কারিগরি সাহায্য, আগ্নেয়াস্ত্র ইত্যাদি দ্বারা মুক্তিযুদ্ধে আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। ডব্লিউ.এ.এস. ওডারল্যান্ডের এমন সাহসীচেতা এবং বাংলাদেশের জনগণের সাথে একাত্মতার এরূপ বিরল ঘটনার জন্য তিনিই মহান মুক্তিযুদ্ধে একমাত্র বীরপ্রতীক খেতাবে ভূষিত বিদেশি। বীরপ্রতীক উপাধিতে ভূষিত হওয়ার সংবাদ শুনে আনন্দিত হয়েছেন। বাংলাদেশের মানুষের সাথে যেন আরো মিশে গেলেন। তার মতে, বাংলাদেশের মত এমন লড়াকু মনোভাব সম্পন্ন জাতি তিনি পৃথিবীর কোথাও দেখেননি। যে জাতি ভাষার জন্য লড়াই করে, স্বাধীনতার জন্য বারবার লড়াই করে, সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য লড়াই করে। মহান মুক্তিযুদ্ধের এ রীব সৈনিক ২০০১ সালের ১৮ই মে স্বদেশে প্রাণত্যাগ করেন। তার মৃত্যুতে বাংলাদেশ একজন প্রকৃত বন্ধুকে হারিয়েছে। আমরা তাঁকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি।