দুর্ঘটনা নয়—হত্যাকাণ্ড

আপডেট : ০৪ ডিসেম্বর ২০১২, ২০:০৯
গত ২৪ নভেম্বর সন্ধ্যা ৭টায় আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুরের তাজরিন ফ্যাশন লিমিটেডে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অগ্নিকাণ্ডের মাধ্যমে হত্যা করা হয় ১২৪ জন তরতাজা শ্রমিককে। পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে কোটি কোটি মানুষের হূদয়। তবে নিষ্ঠুর, নির্দয় ও না-মানুষেরা হতবাক ও হতবিহ্বল হয়নি। এমন নিষ্ঠুরতা কি কখনো আমরা দেখেছি? প্রায় প্রতিটি সংবাদ মাধ্যমে প্রচারিত ও প্রকাশিত সেই ছবিটি— যে ছবিতে দেখা গেলো সহকর্মীর লাশ বস্তায় ভরে ঘাড়ে নিয়ে অসহায় শ্রমিকটি শ্মশানময় তাজরিন কারখানা থেকে বেরিয়ে আসছে। এই দৃশ্য দেখার পর কেঁদেছি। হূদয় ভেঙে খান খান হয়ে গেছে। একবার সবাই ভাবি তো বস্তায় পোড়া লাশটি আমার স্ত্রী বা স্বামী বা ছেলে বা মেয়ে বা বাবা বা মা এবং পোড়া লাশটি বহনকারী বালকটি আমি নিজে। অথবা পত্রিকায় প্রকাশিত অসহায় শ্রমিক স্বাতীর অনুভূতি ও অভিজ্ঞতা আমাদের হূদয়ে কি রক্তক্ষরণ সৃষ্টি করেছে? আগুনের লেলিহান শিখা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ায় স্বাতী বোনকে ফোন করে বলেছিল, “আমি (স্বাতী) দুনিয়া থাইক্যা চইলা যাচ্ছি। চারপাশে আগুন। আমার বাচ্চা দুইডারে দেহিস।” তখন তার বোন অন্য পাশে চিত্কার দেয়ায় স্বাতীর সন্তান দু’টিও কান্না শুরু করে দেয়। কান্নার আওয়াজ ফোনে শোনার পর স্বাতী স্থির থাকতে পারেনি— “বাচ্চা দুইডার গলা শুইন্যা শইল্যে বল পাইছি। তহন ভাবলাম যেমনে পারি বাইর অইতে হইবো। ” কত হূদয়বিদারক এই অভিজ্ঞতা! এমন হাজারও শ্রমিকের আর্তনাদে ভারী হয়ে গিয়েছিল সেখানকার পরিবেশ। তাদের গগনবিদারী আর্তচিত্কার কেন আমাদের হূদয়ে পৌঁছায়নি? কেন অসহায় আত্মীয়স্বজনের বেদনা আমরা উপলব্ধি করতে পারিনি? পারলে কি এমন ঘটনা বার বার ঘটতে পারতো? তিন দশক আগে স্বল্প পরিসরে গড়ে ওঠা উদ্যোগটি আজ আমাদের শিল্প। আমাদের প্রধান আয়ের উত্স। যে ব্যবসায়ীরা বিলাসী জীবনযাপন করছেন, তার পুরো কৃতিত্ব এই শ্রমিকদের। রাজনৈতিক নেতারা স্বার্থসিদ্ধির জন্য যে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির গল্প শোনান তার কৃতিত্ব এই শ্রমিকদের। এই পোশাকশিল্প ছাড়া আর কোনো শিল্প কি আমরা স্বাধীনতার পর গড়ে তুলতে পেরেছি? ২৪ নভেম্বরের আগুনের ফলে শ্রমিকদের গগনবিদারী আর্তচিত্কারে বাংলার আকাশ বাতাস প্রকম্পিত হয়ে উঠেছিল। এই অগ্নিকাণ্ড আমাদের স্বাধীনতার স্বাদকে কি একটুও আঁচড় দেয়নি? আমাদের দুঃখ যাঁরা রাজনীতি করেন জনগণের জন্য তাঁরা কেউ এমন ভয়ানক পরিস্থিতিতে উদ্ধার তত্পরতায় অংশগ্রহণ করেননি। বরং তাঁরা রাজনৈতিক স্বার্থ উদ্ধারে একে অপরের বিরুদ্ধে কাদা ছোড়াছুড়ির খেলায় মেতে উঠেছেন। শোকের নামে পরিহাস করেছেন তাঁরা। এ কেমন নির্মম ও নির্দয় আচরণ তাঁদের? কেবল একটি কথাই শুনি— ‘কোনো কুচক্রী মহল বা স্বার্থান্বেষী মহল’ এমন ঘটনা ঘটিয়েছে। যদি আমরা জানি এ কাজ কুচক্রী বা স্বার্থান্বেষী মহল করেছে , তবে কেন তাদের বিচারের মুখোমুখি করতে পারছি না? এটি দুর্ঘটনা নয়— এটি হত্যাযজ্ঞ। কারণ প্রথমত, বিভিন্ন সময়ে অগ্নিকাণ্ডসহ নানা দুর্ঘটনায় বহু শ্রমিক মারা যাবার পরও কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি দুর্ঘটনা রোধে। নেয়া হয়নি কোনো শাস্তিমূলক পদক্ষেপ দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে। প্রতিটি দুর্ঘটনার পর পর কীভাবে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে, কীভাবে প্রতিকার করা যায় বা যাবে তা নিয়ে আলোচনা হলেও কখনো কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয় না বা হয়নি। ফলে প্রতিটি দুর্ঘটনায় হতাহতের ধরন ও প্রকৃতি একই। কিন্তু গগনবিদারী চিত্কার কখনো হূদয়ে পৌঁছায়নি বলে এর প্রতিকারের জন্য আমরা কিছুই করিনি। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক কাদা ছোড়াছুড়ি ছাড়া আর কিছুই করতে পারেননি নেতারা। তৃতীয়ত, দেশ ধ্বংসাত্মক কাজে স্বাধীনতার পর থেকে যারা সক্রিয় ভূমিকা রেখেছে তাদের কেউ থামায়নি। বরং ব্যবসা করা হয় দুর্ঘটনাকবলিত মানুষের লাশ নিয়ে। চতুর্থত, আমরা সাধারণ মানুষ নিজেদের অধিকার রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ মঞ্চ গড়ে তুলে এমন ন্যাক্কারজনক কাজের প্রতিবাদ বা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারিনি। তাই সার্বিক বিষয়গুলোই বলে দিচ্ছে এটি দুর্ঘটনা নয়— এটি হত্যাকাণ্ড। পরিশেষে বহু পুরানো ও প্রচলিত মিথ্যাবাদী রাখালের গল্প দিয়ে শেষ করবো। মিথ্যাবাদী রাখাল বালকটি প্রতিদিন বাঘ বাঘ বলে চিত্কার দিতো। গ্রামবাসীও প্রতিদিন সহজ সরল মনে সাহায্যের জন্য ছুটে আসতো। কিন্তু এসে দেখতো বালকটি সবার সঙ্গে কেবল মজা করার জন্যই এমন করেছে। একদিন সত্যি সত্যি বাঘ এলো, কিন্তু তার চিত্কারে কেউ এলো না। বাঘ বালকটিকে খেয়ে ফেললো। তাই আমাদের নেতাদের মনে রাখতে হবে ‘কুচক্রী ও স্বার্থন্বেষী মহল’ একদিন সত্যি সত্যি বারোটা বাজাবে সেদিন আত্মসমর্পণ ছাড়া কিছুই করার থাকবে না। সময় থাকতে আমাদের বোধোদয় হোক। ঢাকা