নির্বাচন কার অধীনে হবে তা নিয়ে দেশ এক গভীর সংকটের সম্মুখীন। সরকারি দল আওয়ামী লীগ বলছে তারা অনির্বাচিত কারো হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করবে না। অন্যদিকে বিরোধী দল বিএনপি বলছে নির্বাচিত-অনির্বাচিত যাই হোক না কেন নির্বাচন অবশ্যই নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে হতে হবে। প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের মতামতের সমন্বয় করলে আমরা একটি ‘নির্বাচিত নিরপেক্ষ সরকার’ ব্যবস্থার ধারণা পাই।
বাস্তবে ‘নির্বাচিত নিরপেক্ষ সরকার’ ধারণাটি যথাযথভাবে সম্ভব নয়। আমরা এ ধারণার কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করেছি একটি রূপরেখার মাধ্যমে—
অন্তর্বর্তীকালীন জাতীয় সরকার
বর্তমান সরকারের মেয়াদ ৫ বছর পূর্ণ হওয়ার পরে এই সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে।
এই সরকারের সদস্যসংখ্যা হবে ৩০ জন।
এই সরকারের মেয়াদ হবে ৯০ দিন।
গঠন প্রক্রিয়া
১। আমাদের জাতীয় সংসদের সর্বশেষ দুটি সংসদ নির্বাচনে (অর্থাত্ ৮ম ও ৯ম) ৬০০ সংসদীয় আসনের প্রাপ্ত ফলাফলের ভিত্তিতে যে ৬০০ জন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে সর্বোচ্চ (শতকরা হারের ভিত্তিতে) ভোটপ্রাপ্ত প্রথম ১৪ জন সাবেক সংসদ সদস্য এই সরকারের সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হবেন এবং
২। সর্বশেষ দুটি সংসদ নির্বাচনে (অর্থাত্ ৮ম ও ৯ম) ৬০০ সংসদীয় আসনের প্রাপ্ত ফলাফলের ভিত্তিতে যে ৬০০ জন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে সর্বোচ্চ ভোটের ব্যবধানে (শতকরা হারের ভিত্তিতে) নির্বাচিত প্রথম ১৩ জন এই সরকারের সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হবেন।
৩। উল্লিখিত পদ্ধতিতে নির্বাচিত ২৭ জনের অন্ততপক্ষে তিন-চতুর্থাংশ সদস্যের মতৈক্যের ভিত্তিতে একজন নিরপেক্ষ ও অরাজনৈতিক ব্যক্তিকে এই সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে নির্বাচিত করা হবে, যাঁর অধীনে অবশ্যই জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় থাকবে এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও আইন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালনের জন্য আরো দু’জন নিরপেক্ষ ও অরাজনৈতিক ব্যক্তিকে উপদেষ্টা হিসেবে নির্বাচিত করা হবে।
৪। সদস্যদের মতৈক্যের ভিত্তিতে নির্বাচিত প্রধান উপদেষ্টা এই সরকারের ২৭ জন সদস্যের মধ্যে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের দপ্তর বণ্টন করবেন।
৫। যদি কোনো কারণে সদস্যদের মতৈক্যের অভাবে প্রধান উপদেষ্টা ও অন্যান্য উপদেষ্টার নিয়োগ দেয়া সম্ভব না হয় তাহলে দেশের সকল অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি যাঁরা জীবিত আছেন তাঁদের নিয়ে একটি কমিশন গঠন করে এই কমিশনের সদস্যদের তিন-চতুর্থাংশের মতৈক্যের ভিত্তিতে প্রধান উপদেষ্টা ও অন্যান্য উপদেষ্টাকে নিয়োগ দেয়া হবে।
শর্তসমূহ
১। এমন একাধিক সাবেক সংসদ সদস্য পাওয়া যাবে যাঁরা সর্বশেষ দুটি সংসদ নির্বাচনেই সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন, সেক্ষেত্রে তাঁরা দুটি নির্বাচনের মধ্যে শতকরা হারের ভিত্তিতে যে নির্বাচনে বেশি ভোট পেয়েছেন সেটিকে বিবেচনায় আনা হবে, অন্যটিকে বিবেচনায় আনা হবে না।
২। যদি কোনো সাবেক সংসদ সদস্য সর্বোচ্চ ভোটপ্রাপ্তির ভিত্তিতে এই সরকারের সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন, তবে তাঁকে সর্বোচ্চ ভোটের ব্যবধানের ভিত্তিতে নির্বাচন প্রক্রিয়ায় বিবেচনায় আনা হবে না।
৩। যেসব আসনে উপ-নির্বাচন হয়েছে সেসব সংসদীয় আসনের ফলাফলকে বিবেচনায় আনা হবে না।
৪। রাজনৈতিক দলের প্রধানরা এই সরকারের সদস্য হতে পারবেন না, অর্থাত্ তাঁদের নির্বাচনী ফলাফল বিবেচনায় আনা হবে না।
৫। আদালত বা নির্বাচন কমিশন কর্তৃক কোনো নির্বাচনী আসনের ফলাফল বাতিল ঘোষণা করলে সেই সংসদীয় আসনের ফলাফল বিবেচনায় আনা হবে না।
৬। এই সরকারের প্রতিটি সদস্যকে ন্যূনতম স্নাতক পাস হতে হবে। অর্থাত্ যেসব সাবেক সংসদ সদস্যের স্নাতক সনদ নেই তাঁদের বিবেচনায় আনা হবে না।
৭। এই সরকারের ২৭ জন সাবেক সাংসদ বর্তমান নির্বাচনেও অংশগ্রহণ করতে পারবেন, তবে তাঁদের অবশ্যই নির্বাচন শুরু হওয়ার ৪৮ ঘণ্টা আগে তাঁদের নির্বাচনী এলাকা ত্যাগ করতে হবে।
সদস্যসংখ্যা আধিক্যের যৌক্তিকতা
এই সরকারের সদস্য সংখ্যার আধিক্যের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিতে পারে। কারণ আগে আমাদের নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সদস্যসংখ্যা ছিল মাত্র ১১ জন। কিন্তু আমরা দেখেছি ছোট মন্ত্রিসভার কারণে রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমের স্বাভাবিক গতিশীলতা আমরা হারিয়ে ফেলেছিলাম। আর তাই প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে নির্বাচন অনুষ্ঠানের মধ্যবর্তী ৯০ দিন আমাদের রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমে স্থবিরতা অপসারণের লক্ষ্যেই এই সরকারের সদস্যসংখ্যা যৌক্তিক পর্যায়ে রাখা হয়েছে।
নির্বাচিত-অনির্বাচিত বিতর্ক
এই সরকার নিয়ে বিতর্ক উঠতে পারে যে, এটি নির্বাচিত সরকার, নাকি অনির্বাচিত সরকার। এই সরকারের ৩০ জন সদস্যের ২৭ জন বিগত দুটি সংসদ থেকে নির্বাচিত, যারা জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন এবং বাকি ৩ জন সদস্যও সেসব নির্বাচিত সদস্যের দ্বারা নির্বাচিত, অর্থাত্ পরোক্ষভাবে জনগণের দ্বারা নির্বাচিত। সেই অর্থে আমরা এটিকে একটি নির্বাচিত সরকার হিসেবে ধরে নিতে পারি। এরপরও প্রশ্ন থেকে যায় যে, এই সদস্যরা আগের সংসদ থেকে নির্বাচিত সদস্য, বর্তমান সংসদ থেকে নয়, সেই অর্থে তাঁদের নির্বাচিত বলাটা সমীচীন কিনা। তথাপি আমাদের মনে রাখতে হবে, জনগণই এক সময় তাঁদের নির্বাচিত করেছিল।
সর্বশেষ দুটি সংসদ নির্বাচনকে বিবেচনায় আনার যৌক্তিকতা
আমাদের সংসদ নির্বাচনের ফলাফলগুলোর দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই যে, নির্বাচনী ফলাফলে রাজনৈতিক দলগুলোর কোনো ধারাবাহিকতা নেই। এক দল একবার দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় তো পরবর্তী নির্বাচনে সেই দলের ভরাডুবি হয়। তাই শুধুমাত্র সর্বশেষ সংসদ নির্বাচনের ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে এই সরকার গঠিত হলে দলীয় সরকারের মতোই একটি একদলীয় সরকার দাঁড়ায়। তাই সব দলের অংশগ্রহণে একটি জাতীয় সরকার গঠনের লক্ষ্যে সর্বশেষ দুটি সংসদ নির্বাচনের ফলাফল বিবেচনায় আনা যৌক্তিক।
নিরপেক্ষ নাকি দলীয় সরকার
এই সরকারকে নিরপেক্ষ নাকি দলীয় সরকার হিসেবে অভিহিত করা হবে তা নিয়ে বিতর্ক দেখা দিতে পারে। এই সরকারের অধিকাংশ সদস্য দলীয় হলেও সরকারের নীতিনির্বারণী পর্যায় নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের হাতেই থাকছে। ফলে সরকারে দলীয় ব্যক্তিরা অন্তর্ভুক্ত থাকলেও সরকার পরিচালিত হবে নিরপেক্ষভাবে, যা আমরা আশা করতে পারি।
অনির্বাচিত তিনজন সদস্যের অন্তর্ভুক্তির যৌক্তিকতা
এই সরকারের তিনজন সদস্য অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। আমাদের সংবিধানের ৫৬(২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে, মন্ত্রিসভার মোট সদস্যের অনধিক এক-দশমাংশ সংসদ সদস্য নির্বাচিত হবার যোগ্য ব্যক্তিদের মধ্য থেকে মনোনীত করা যাবে। তাই নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করার স্বার্থে নির্বাচনের সময় নির্বাচনের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত সবচেয়ে স্পর্শকাতর মন্ত্রণালয়গুলোতে দায়িত্ব পালনের ও সরকারের নিরপেক্ষ চরিত্র বজায় রাখার জন্য অনির্বাচিত নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের নিয়োগ যৌক্তিক।
দলীয় প্রধানদের এই সরকারের অন্তর্ভুক্ত না করার যৌক্তিকতা
আমরা অতীতে দেখেছি, নির্বাচিত সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজনৈতিক দলের প্রধানরা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, সেহেতু কারো অধীনে এই সরকারের সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্তি তাঁদের মর্যাদার জন্য হানিকর হতে পারে—এই বিবেচনায় তাঁদের এই সরকারে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
ঢাকা
