দেশের পুরাতন সারগুদামগুলো মেরামতের জন্য ১৪৭ কোটি টাকা ব্যয় করা হলেও অধিকাংশেরই মেরামত কাজ মানসম্পন্ন হয়নি। মেরামতের অল্প সময়ের মধ্যে সেগুলোর অবস্থা নাজুক হয়ে পড়েছে। ১১৫টি সার গুদামের কোনোটির মেঝে মেরামত করা হয়নি। সার ব্যবস্থাপনায় সফটওয়্যার ক্রয় করা হলেও এটি চালু করা হয়নি। একটি আধুনিক গুদাম নির্মাণ, এর ভেন্টিলেশন ব্যবস্থা সম্পর্কে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তেমন ধারণা ছিল না বলে অভিযোগ করেছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) বিদ্যমান সার গুদামসমূহের রক্ষণাবেক্ষণ, পুনর্বাসন ও সার ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম জোরদারকরণ প্রকল্পটি শেষ হয়েছে ২০১৮ সালের জুনে। প্রকল্পটি সংশোধনের মাধ্যমে ২০১৩ সালের জুলাই থেকে ২০১৮ সালের জুন মেয়াদে, এই ছয় বছরে ১৪৭ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়ন করা হয়েছে। প্রকল্পটি শেষ হওয়ার পর এর মূল্যায়ন প্রতিবেদন তৈরি করেছে আইএমইডি।
আইএমইডির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রকল্পের মূল ডিপিপিতে মোট ৬৪টি জেলার ১১৩টি উপজেলাকে প্রকল্প এলাকা হিসেবে উল্লেখ করা হলেও প্রকৃতপক্ষে প্রকল্পের কার্যক্রম সম্পাদিত হয় ৬৭টি উপজেলায়। প্রকল্পের অন্যতম কাজ ছিল বিএডিসির ৮৪টি আঞ্চলিক অফিস ভবন ও ১১৫টি পুরাতন সার গুদাম মেরামত করা এবং ২০টি সেলস সেন্টার নির্মাণ করা। হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ, সিলেটের লাউয়াই, সুনামগঞ্জ সদর, চাঁপাইনবাবগঞ্জের রহনপুর, নওগাঁর আত্রাই ও মহাদেবপুর, নওগাঁ সদর, বগুড়ার বনানী, গাবতলী, সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ, উল্লাপাড়া বাজার, উল্লাপাড়া রেলস্টেশন এলাকার অফিস ও গুদাম মেরামত কার্যক্রম পরিদর্শন করেন আইএমইডির কর্মকর্তারা। পরিদর্শনে কিছু কিছু এলাকার অফিস মেরামত কাজ মানসম্মত মনে হলেও অধিকাংশ স্থানে গুদাম মেরামত কাজ মানসম্পন্ন হয়নি বলে অভিযোগ করা হয়েছে। হবিগঞ্জ ও সুনামগঞ্জে গুদাম মেরামত কাজ মোটামুটি সন্তোষজনক হলেও নওগাঁ সদর ও মহাদেবপুর, বগুড়ার গাবতলী, সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ, উল্লাপাড়া আরএস ও উল্লাপাড়া বাজারের গুদাম মেরামত মানসম্মত হয়নি। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, নওগাঁ সদরের গুদামটির প্রকৃতপক্ষে কোনো কোনো স্থানে মেরামত করা হয়েছে তা বোঝা যায় না-এটি মেরামত পূর্ব অবস্থায় রয়েছে বলেই মনে হয়। এই গুদামটির পিলার ভাঙা, জায়গায় জায়গায় প্লাস্টার খসে পড়ছে এবং মূল দরজায় লোহা ক্ষয় হয়ে বড় আকারের ছিদ্র তৈরি হয়েছে। সিরাজগঞ্জে মেরামতকৃত গুদামের দেয়াল স্যাঁতস্যাঁতে, গুদামের ছাদের সিলিংয়ের রড বের হয়ে আছে। বগুড়ার গাবতলীর গুদামটির মেরামত কাজ শেষ হলেও মাত্র ১ বছরের মধ্যে এর দেয়ালগুলো ড্যাম্প হয়ে গেছে। সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জে অবস্থিত সার গুদামটির অবস্থা অত্যন্ত নাজুক।
প্রকল্পটির শেষ তিন বছর পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন যুগ্ম পরিচালন মো. মোজাম্মেল হক। সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি ইত্তেফাককে বলেন, ৬০ ও ৭০ দশকে নির্মাণের পর সারগুদামগুলো দীর্ঘকাল কোনো মেরামত করা হয়নি। আলোচ্য প্রকল্পটির মাধ্যমে সীমিত বরাদ্দে সর্বোচ্চ কাজ করা হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। মানহীন কাজের অভিযোগের বিষয়টি নাকচ করে তিনি বলেন, যথাযথ মানে কাজ হয়েছে।
আইএমইডি’র প্রতিবেদনে বলা হয়, ১১৫টি সার গুদামের কোনোটির মেঝে মেরামত করা হয়নি। একটি আধুনিক গুদাম নির্মাণ, এর ভেন্টিলেশন ব্যবস্থা সম্পর্কে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তেমন ধারণা নেই, এমন অভিযোগ করে বলা হয়েছে, দীর্ঘ মেয়াদে ব্যবহারের জন্য নতুন গুদামগুলো কীভাবে তৈরি করা প্রয়োজন এই সম্পর্কে বিএডিসির সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা তৈরি করা প্রয়োজন। প্রকল্পটির মাধ্যমে ৫ কোটি টাকা ব্যয়ে সিসিটিভি ক্যামেরাসহ সার ব্যবস্থাপনা মোবাইল/কম্পিউটার সফটওয়্যার ক্রয় ও স্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু আঞ্চলিক অফিসগুলোতে কনেকটিভিটি না থাকায় সফটওয়্যারটি চালু হয়নি। ফলে সফটওয়্যারটি কীভাবে কাজ করছে এবং এর মাধ্যমে সার ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম কতটা জোরদার হয়েছে, এ সম্পর্কিত কোনো ধারণা অর্জন করা সম্ভব হয়নি। এ প্রকল্প হতে বিভিন্ন গুদাম ও অফিসে সর্বমোট ৯০০টি সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু এর ফুটেজগুলো ধারণ করার দিন হতে ৭ দিন পর্যন্ত সংরক্ষিত থাকে। আইএমইডি উল্লেখ করেছে, কোনো অপরাধ সংঘটনের তারিখ হতে ৭ দিন পার হয়ে গেলে আর ভিডিও ফুটেজ দেখা সম্ভব নয়। মেরামতের পর এত অল্প সময়ের মধ্যে গুদামগুলোর অবস্থা এত নাজুক অবস্থায় পৌঁছানোর কারণ বিএডিসি কর্তৃক খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেছে আইএমইডি।
