মুক্তিযুদ্ধের ৪১ বছর পরও নীলফামারী জেলার সৈয়দপুরে নির্মিত হয়নি কোন স্মৃতিসৌধ। একাধিকবার স্মৃতিসৌধ নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হলেও অর্থ, স্থান সঙ্কট ও সংশ্লিষ্টদের সমন্বয়হীনতার কারণে তা বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে পাক-হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসরদের বর্বরতা ও নির্মম হত্যাযজ্ঞের স্মারক চিহ্নগুলো হারিয়ে যেতে বসেছে। বর্তমানে এসব বধ্যভূমি বলে না দিলে বোঝারই উপায় নেই যে, এ স্থানে প্রাণ দিয়েছেন শত শত লোক। উত্তরাঞ্চলের অবাঙালি (উর্দুভাষী) অধ্যুষিত সৈয়দপুর শহরে ৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধের দৃশ্যপট ছিল দেশের অন্যান্য এলাকার তুলনায় একেবারে ভিন্ন। ৪৭’এর দেশ বিভাগের পর থেকে এই সৈয়দপুর শহরে বিপুল সংখ্যক অবাঙালি এসে আস্তানা গাড়ে। মুক্তিযুদ্ধকালে শহরের বাঙালিরা অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। সৈয়দপুর শহরের পার্শ্ববর্তী চিরিরবন্দর থানার আলোকডিহি ইউনিয়ন পরিষদের তত্কালীন চেয়ারম্যান মাহতাব বেগ বন্দুক নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন বাঙালিদের উদ্ধারে। কিন্তু শহরে ঢোকার প্রাক্কালে হানাদার বাহিনী মিস্ত্রিপাড়া এলাকায় তাকে গুলি করে নির্মমভাবে হত্যা করে। তিনিই মূলত এই অঞ্চলের প্রথম শহীদ মুক্তিযোদ্ধা। স্বাধীনতাকামী ঠিক কতজন মানুষ সৈয়দপুরে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন তার সঠিক হিসাব না থাকলেও বিভিন্ন সূত্রমতে এ সংখ্যা সহস্রাধিক। শুধুমাত্র ’৭১-এর ২৩ মার্চ একদিনেই পাকবাহিনী হিন্দু ও মাড়োয়ারী পরিবারের ৩শ’ ৫০জনকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।
এসব মানুষকে ভারতে পৌঁছে দেয়ার কথা বলে সৈয়দপুর রেলওয়ে স্টেশনে একটি বিশেষ ট্রেনে তুলে শহরের অদূরে গোলাহাট এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাদের ট্রেন থেকে নামিয়ে সারিবদ্ধ করে ব্রাশফায়ার করে হত্যা করা হয়। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এটি মূলত সবচেয়ে বড় গণহত্যা।
উল্লেখ্য, এখানে স্মৃতিসৌধ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়ে দু’একবার কমিটিও গঠন করা হয়। সংগ্রহ করা হয় যত্সামান্য অর্থ। স্মৃতিসৌধের নকশাও করা হয় দু’বার দেশের খ্যাতনামা শিল্পীদের দিয়ে। কিন্তু স্মৃতিসৌধ নির্মাণের জায়গা নির্ধারণের জটিলতা ও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের সমন্বিত উদ্যোগের অভাবে দীর্ঘদিনেও তা আর বাস্তবায়িত হয়নি। গত ২০০০ সালের ৯ অক্টোবর শহরের ওয়াপদা মোড়ের সড়ক দ্বীপে মহান মুক্তিযুদ্ধের অমর শহীদ স্মৃতি ভাস্কর্য ‘স্বাধীনতা’ নির্মাণের ভিত্তি ফলক উন্মোচন করা হয়। নামকরণ করা হয় ‘স্বাধীনতা শহীদ স্মৃতি ভাস্কর্য’। ভাস্কর হাবিবা সুলতানা বেলী সরকার এর নকশা করেন। এর আগেও একবার স্মৃতিসৌধ নির্মাণের নকশা করা হয়েছিল। সে সময় নকশাটি করেছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বাংলাদেশ টেলিভিশনের প্রধান শিল্প নির্দেশক জি এম এ রাজ্জাক। স্মৃতিসৌধটি নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ৬০ লাখ টাকা। আর সর্বশেষ যে ভাস্কর্য নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয় তাতে ব্যয় ধরা হয় ৪২ লাখ ৩৭ হাজার ৩শ’ ৯৮ টাকা। এ শহীদ ভাস্কর্য নির্মাণের কাজ এখনো শুরু হয়নি। কিন্তু ইতিমধ্যেই চুরি গেছে শহীদ ভাস্কর্য নির্মাণের ভিত্তি ফলকটি। এদিকে শহীদ ভাস্কর্য স্বাধীনতা নির্মিত না হলেও প্রজন্ম-৭১ ছোট্ট পরিসরে স্মৃতি অম্লান নির্মাণ করেছে। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ শিশুপার্কে নিজস্ব অর্থায়নে শহীদ স্মৃতিফলক ও রেলওয়ে কারখানার অভ্যন্তরে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করে প্রশংসিত হয়েছে। সর্বশেষ সৈয়দপুর ক্যান্টনমেন্ট সড়কের ডাকবাংলোর বিপরীতে শহীদ স্মৃতিস্তম্ভের ফলক উন্মোচন করা হয় ঘটা করে। এভাবে বার বার থেমে যাচ্ছে শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের কাজ।
