সেনা সমর্থিত সরকারের আমলের ইসির সীমানায় নির্বাচন চায় আওয়ামী লীগ

আপডেট : ০৫ ডিসেম্বর ২০১২, ২২:৩৭
সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে গঠিত নির্বাচন কমিশনের (ইসি) প্রণীত ২০০৮ সালে নির্বাচনী সীমানায় আগামী দশম সংসদ নির্বাচন চায় ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। নির্বাচন কমিশনের সংলাপে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একমাত্র আওয়ামী লীগই ২০০৮ সালের সীমানা হুবুহু বহাল রাখার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। এ সংক্রান্ত একটি আইনের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে আওয়ামী লীগ ২০১৮ সাল পর্যন্ত বর্তমান সীমানা বহাল রাখার প্রস্তাব দিয়েছে। এছাড়া কোন দলের বিদ্রোহী প্রার্থী যাতে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে না পারে সে বিষয়ে আইন প্রণয়নের দাবি জানিয়েছে দলটি। দল থেকে মনোনয়ন বঞ্চিত প্রার্থীরা নির্বাচনে অংশগ্রহণের চেষ্টা করলে ওই সদস্যের পরবর্তী দু’টি নির্বাচনে অংশগ্রহণের উপর নিষেধাজ্ঞার প্রস্তাব দিয়েছে আওয়ামী লীগ। গতকাল বুধবার বিকালে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সংলাপে আওয়ামী লীগের এই লিখিত প্রস্তাব তুলে ধরেন দলটির সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী। সংলাপে দলের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামসহ ১৩ সদস্যের প্রতিনিধি দল অংশ নেন। লিখিত প্রস্তাবে সাজেদা চৌধুরী বলেন, জাতীয় সংসদের পরবর্তী নির্বাচনের জন্য কিছু সংখ্যক নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণ করার জন্য বিভিন্ন মহলের দাবি উঠেছে। আওয়ামী লীগ মনে করে যে, নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে অর্থাত্ মাত্র ৪ বছর পূর্বে যে সীমানা নির্ধারণ করা হয়েছিল তা এতো শীঘ্র পরিবর্তনের প্রয়োজন নেই। সংসদীয় আসনের সীমানা নির্ধারণ সংক্রান্ত অধ্যাদেশ ১৯৭৬-এর ৮ ধারা অনুযায়ী ১০ বছর পর পর আদমশুমারি শেষ করার অব্যবহিত পরে অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য পুনরায় জাতীয় সংসদের আসনসমূহের সীমানা নির্ধারণ করার বিধান রয়েছে। তার প্রেক্ষিতে আওয়ামী লীগের সুচিন্তিত মতামত হচ্ছে, ২০০৮ সালে নির্বাচন কমিশন কর্তৃক প্রণীত পদ্ধতি অনুসরণের ফলে ঢাকাসহ মোট ১৩০টি আসনের সীমানায় যে পরিবর্তন আনা হয়েছিল তা দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ক্ষেত্রে অপরিবর্তিত রেখে ১০ বছর পরে অর্থাত্ ২০১৮ সালে পুনর্নির্ধারিত হতে পারে। এ পর্যন্ত ২৫টির মতো রাজনৈতিক দল সংলাপে অংশ নেয়। সংলাপে অংশ নেয়া সবকয়টি দলই সীমানা পুনর্নির্ধারণের বিষয়ে অভিমত দিয়েছে। আওয়ামী লীগ ছাড়া কোন দলই ২০০৮ সালের সীমানা বহাল রাখার দাবি জানায়নি। নির্বাচনী আইন বিশেষজ্ঞরা আওয়ামী লীগের এই প্রস্তাবকে আইনের ভুল ব্যাখ্যা বলে আখ্যায়িত করেছেন। এ প্রসঙ্গে সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী এডভোকেট মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান ইত্তেফাককে বলেন, সীমানা নির্ধারণ সংক্রান্ত ১৯৭৬ সালের অধ্যাদেশের ৮ ধারায় দশ বছর পর পর সীমানা নির্ধারণের কোন নির্দেশনা নেই। বরং ওই ধারায় প্রত্যেক আদমশুমারির পর সীমানা নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে। ইতিমধ্যেই আদমশুমারি সম্পন্ন এবং তার প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। সুতারাং সীমানা নির্ধারণ করার ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনের উপরে আইনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তিনি বলেন, কমিশন প্রণীত নীতিমালা জনসংখ্যার ভিত্তিতে আসন বন্টনের যে নির্দেশনা রয়েছে, সে অনুযায়ী আসন বন্টন করলে ঢাকার আসন ২০টি থেকে ২৫টিতে উন্নীত করতে হবে। ২০০৮ সালের আগে ঢাকা জেলার আসন ছিল ১৩টি। ফলে ওই নীতিমালা না বদলালে একদিকে গ্রামের আসন কমে যাবে, অন্যদিকে আইনগত জটিলতা তৈরি হবে। এদিকে, সংলাপে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দিন আহমেদ বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলাপ-আলোচনা শেষে সংসদীয় আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণের কাজ শুরু হবে। প্রাথমিকভাবে খসড়া প্রকাশ করে তার উপর শুনানি ও আপত্তি গ্রহন শেষে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হবে। বিদ্রোহী প্রার্থীদের কাছে দলীয় প্রার্থীদের হেরে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে গতকাল সংলাপে আওয়ামী লীগের লিখিত প্রস্তাবে বিদ্রোহী প্রার্থীদের নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণার সুপারিশ করা হয়। এ সংক্রান্ত আওয়ামী লীগের প্রস্তাবণায় বলা হয়, কোন রাজনৈতিক দল যখন কোন নির্বাচনে কোন কর্মী বা নেতাকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্যে মনোনয়ন দান করে, তখন বহু বিষয় বিবেচনায় নিয়ে, সর্বোপরি দল ও মানুষের সর্বোচ্চ কল্যাণদৃষ্টে তা করে থাকেন। পরে দলের কোন কর্মী যখন এই মনোনয়ন অগ্রাহ্য বা অমান্য করেন তখন দলের শৃঙ্খলাই শুধু নয়, গণতন্ত্রের ভীতও নড়ে যায়। এমতাবস্থায়, কোন রাজনৈতিক দলের চিহ্নিত বা নিবন্ধিত কর্মী দলের মনোনয়ন অগ্রাহ্য করে নিজে কোন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন না বা দলের অন্য কোন কর্মী বা নেতার প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সহযোগিতা করতে পারবেন না, যদি করেন তবে দল কর্তৃক তিনি বহিস্কৃত হবেন এবং পরবর্তী এক বা একাধিক নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবেন না। এ বিষয়ে দলটির সুপারিশে বলা হয়, রাজনৈতিক দলগুলি তাদের সকল প্রার্থীর মনোনয়নপত্র অগ্রিম নিয়ে রাখবে এবং যথাসময়ে একজন প্রার্থীর নাম ঘোষণা করে অন্যদের প্রার্থিতা বাতিল করবে। এর ফলে দল কর্তৃক মনোনীত প্রার্থীই শুধু নির্বাচন করতে পারবেন। যদি তার প্রার্থিতা বা মনোনয়নপত্র বাতিল হয় সে ক্ষেত্রে বিকল্প প্রার্থী দলের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে বিবেচিত হবেন, কিন্তু কোন অবস্থাতেই বিকল্প প্রার্থীসহ অন্যান্য যারা দলীয়ভাবে মনোনয়ন প্রার্থনা করেছেন তারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন না। যদি করেন তবে তিনি দল কর্তৃক বহিস্কৃত হবেন এবং পরবর্তী দুটি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন না। এই মর্মে নির্বাচন কমিশনকে আরপিও-তে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনায়নের প্রস্তাব দেয়ার জন্য অনুরোধ করে আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি দল। উন্মুক্ত আলোচনায় আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা মন্ডলীর সদস্য আমির হোসেন আমু বলেন, সীমানা নির্ধারণ করতে গেলে জটিলতা হবে, এমনটি কেউ দেখতে চায় না। সে বিষয়টি বিবেচনায় রেখে আমরা বিদ্যমান সীমানায় অপরিবর্তিত রাখার সুপারিশ করেছি। উপদেষ্টা মন্ডলীর সদস্য তোফায়েল আহমেদ বলেন, বর্তমান কমিশন দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রায় ৬ হাজার নির্বাচন অনুষ্ঠান করেছে। প্রতিটি নির্বাচনই সুষ্ঠু ও অবাধ হয়েছে। বর্তমান কমিশনের অধীনে আগামী জাতীয় নির্বাচনও সুষ্ঠু হবে দেশবাসী বিশ্বাস করে। বর্তমান কমিশনের অধীনে সুষ্ঠু অবাধ নির্বাচন হওয়া সম্ভব বলেও মত দেন তিনি। উপদেষ্টামন্ডলীর সদস্য ও দপ্তরবিহীন মন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেন, বর্তমান কমিশনের অধীনে আরপিও সংশোধনের যে ইতিহাস তৈরি হয়েছে দক্ষিণ এশিয়ায় অনেক দেশই তা পারেনি। দলের সাধারণ সম্পাদক ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলেন, সকল রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে দশম সংসদ নির্বাচন সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হবে। সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন অনুষ্ঠান ও গণতান্ত্রিক চর্চায় বর্তমান ইসি যে ধরনের উদ্যোগ নেবে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে তাতে সর্বাত্মক সহযোগিতা করার অঙ্গীকার করছে। বিগত ইসির সময়ে বেশ কিছু উদ্ভট পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। আওয়ামী লীগ সর্বদা সহযোগিতা করে এসেছে। সাবেক মন্ত্রী ও দলের কেন্দ্রীয় নেতা মোহাম্মদ নাসিম গণমাধ্যমের সামনে অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা বলে বিব্রত না হওয়ার জন্য কমিশনকে আহবান জানান। আওয়ামী লীগের পক্ষে সংলাপে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন, সভাপতিমন্ডলীর সদস্য ও কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী, কাজী জাফর উল্লাহ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহাবুব-উল-আলম হানিফ, দপ্তর সম্পাদক এবং গৃহয়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী এডভোকেট আব্দুল মান্নান খান, সাবেক সচিব রশিদুল আলম ও উপ-দপ্তর সম্পাদক মৃণাল কান্তি দাস। প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সভাপতিত্বে সংলাপে নির্বাচন কমিশনের পক্ষে অংশ নেন নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মোবারক, মোহাম্মদ আবু হাফিজ, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মোঃ জাবেদ আলী, মো ঃ শাহ নেওয়াজ, ইসি সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব মোঃ সিরাজুল ইসলাম, যুগ্ম সচিব জেসমিন টুলি, বিশ্বাস লুত্ফুর রহমান।