দেশে অর্ধলক্ষাধিক ভুয়া ড্রাগ লাইসেন্স

আপডেট : ০৫ ডিসেম্বর ২০১২, ২২:৪০
দেশে ড্রাগ লাইসেন্সের সংখ্যা ৯৮ হাজার। এর মধ্যে অর্ধলক্ষাধিকই ভুয়া। আর এসব ভুয়া ড্রাগ লাইসেন্স ইস্যু করেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর। এসব ভুয়া লাইসেন্সধারীরা নামে বেনামে সংশ্লিষ্ট রয়েছেন বিভিন্ন ওষুধের দোকানের সঙ্গে। এছাড়া দেশে আরও এক লাখ থেকে ৫ লাখ পর্যন্ত লাইসেন্সবিহীন ওষুধের দোকান রয়েছে। আইন অনুযায়ী কোন ফার্মেসি বা ওষুধের দোকান বৈধ ড্রাগ লাইসেন্স ছাড়া পরিচালনার সুযোগ নেই। তারপরেও বছরের পর বছর ধরে ভুয়া ড্রাগ লাইসেন্স নিয়ে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে সংঘবদ্ধ চক্র। এ ব্যাপারে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের বক্তব্য হচ্ছে, লোকবল সংকটে তারা ভুয়া ড্রাগ লাইসেন্সধারী ও অনুমোদনহীন ওষুধের দোকানের বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নিতে পারছেন না। ওষুধের দোকানের মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ কেমিস্ট এন্ড ড্রাগিস্ট সমিতির তথ্য মতে দেশে অন্তত:এক লাখ ৩০ হাজার ড্রাগ লাইসেন্স রয়েছে। তন্মধ্যে অর্ধেকই ফটোকপি অথবা জাল নিবন্ধনের সার্টিফিকেটের মাধ্যমে লাইসেন্স ইস্যু করানো হয়েছে। এ অনিয়মের সঙ্গে জড়িত আছেন ওষুধ প্রশাসনের একশ্রেণীর অসাধু কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট এলাকার ড্রাগ সুপার। তারা মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে এসব ভুয়া ড্রাগ লাইসেন্স ইস্যু করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল কর্মকর্তা। তার মতে, দেশে মোট ইস্যুকৃত ড্রাগ লাইসেন্সের সংখ্যা ৯৮ হাজার, এক লাখ ৩০ হাজার নয়। তবে তিনি স্বীকার করেন যে, দেশে কম-বেশি অর্ধলক্ষাধিক ড্রাগ লাইসেন্স রয়েছে সেগুলো যথাযথ সনদপত্র দিয়ে নেওয়া হয়নি। তবে অতিরিক্ত অর্থের বিনিময়ে এখন আর কোন লাইসেন্স দেয়া হচ্ছে না বলে জানান তিনি। এছাড়া কেমিস্ট এন্ড ড্রাগিস্ট সমিতির সভাপতি মো. সাদেকুর রহমান ইত্তেফাককে জানান, দেশের বিভিন্ন শহর, গ্রাম-গঞ্জে অনুমোদনহীনভাবে গড়ে ওঠা ওষুধের দোকান পাঁচ থেকে আট লাখ পর্যন্ত হতে পারে। তবে ওষুধ প্রশাসনের দাবি, অনুমোদনহীন ওষুধের দোকান এক লাখের বেশি হবে না। নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি ওষুধের দোকানে একজন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ফার্মাসিস্ট থাকা বাধ্যতামূলক। ওষুধের দোকানের জন্য ড্রাগ লাইসেন্স নেয়ার সময় উক্ত ফার্মাসিস্টের নিবন্ধন সনদের কপি জমা দিতে হয় ও নিবন্ধন নম্বর উল্লেখ করতে হয়। এ ব্যাপারে কেমিস্ট এন্ড ড্রাগিস্ট সমিতির সহসভাপতি আব্দুল হাই জানান, সাকুল্যে দেশে ৩০ থেকে ৪০ হাজারের বেশি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ফার্মাসিস্ট নেই। সে হিসেবে দেশে ভুয়া ড্রাগ লাইসেন্সধারী কমপক্ষে ৬০ হাজার হবে। অনুসন্ধানে জানা যায়, ভুয়া নিবন্ধন সনদ দিয়ে ড্রাগ লাইসেন্স নেয়ার কৌশল বেশ অভিনব। নিয়মানুসারে ফার্মাসিস্টের মূল নিবন্ধন সনদ ছাড়া ড্রাগ লাইসেন্স ইস্যু করার কথা নয়। তারপরও ড্রাগ লাইসেন্স মিলছে ভুয়া কাগজ-পত্র দিয়ে। আর এজন্য আগ্রহী ব্যক্তিকে লাইসেন্স প্রতি অতিরিক্ত ব্যয় করতে হয় ১০ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা। এমন তথ্য দিয়েছেন কেমিস্ট এন্ড ড্রাগিস্ট সমিতির কর্মকর্তাগণ। নিয়মানুসারে প্রতিটি জেলায় সিভিল সার্জনের নেতৃত্বে একটা কমিটি আছে। এই কমিটির সুপারিশসহ ড্রাগ লাইসেন্সের আবেদনপত্র প্রেরণ করা হয় ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরে। অধিদপ্তর কাগজপত্র যাচাই-বাছাইয়ের পর অনুমোদন দেয়। এরপর সংশ্লিষ্ট ড্রাগ সুপার ড্রাগ লাইসেন্স ইস্যু করেন। এক্ষেত্রে ড্রাগ সুপার, সিভিল সার্জন এবং সর্বশেষ ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জড়িত না থাকলে ভুয়া কাগজপত্র দিয়ে ড্রাগ লাইসেন্স ইস্যু করানো কোনভাবেই সম্ভব নয়। অতীতে ফটোকপি দেখে ড্রাগ লাইসেন্স ইস্যু করা হয়েছে বলে স্বীকার করেছেন ওষুধ প্রশাসন পরিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা। ফলে একজনের লাইসেন্সের ফটোকপি দিয়ে অনেকে ভুয়া ড্রাগ লাইসেন্স নিয়েছেন। এমনকি ড্রাগ লাইসেন্সের প্রতিটি ফটোকপি বিক্রয় হয়েছে ৩ হাজার টাকা থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত। উক্ত কর্মকর্তা আরও উদ্বেগজনক তথ্য দিয়েছেন। তার তথ্যমতে, ১৯৯৪ সালে তত্কালীন সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কেমিস্ট এন্ড ড্রাগিস্ট সমিতির সঙ্গে বিনা নিবন্ধন সনদে ২০ হাজার ড্রাগ লাইসেন্স দেয়ার চুক্তি করে। তখন থেকেই ভুয়া কাগজপত্র দেখিয়ে অথবা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ছাড়াই ড্রাগ লাইসেন্স প্রদানের অলিখিত সংস্কৃতি চালু হয়। তবে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর মূল সনদপত্র ছাড়া আর কোন ড্রাগ লাইসেন্স ইস্যু করা হচ্ছে না বলে তিনি জানান। মূলত: উক্ত বেআইনী চুক্তির কারণেই ড্রাগ লাইসেন্স প্রদানের নিয়মতান্ত্রিক পথ ভেঙ্গে পড়ে। শুরু হয় কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য। রাতারাতি প্রতিটি জেলায় গড়ে উঠে ফার্মাসিস্ট ট্রেনিং-এর কোচিং সেন্টার। অভিযোগ রয়েছে এই কোচিং সেন্টারের মাধ্যমে আদায়কৃত অর্থ, ড্রাগ লাইসেন্স প্রদান বাণিজ্য সবকিছু প্রকাশ্যে হলেও তত্কালীন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, ড্রাগ প্রশাসন অথবা কেমিস্ট এন্ড ড্রাগিস্ট সমিতির বিরুদ্ধে অজ্ঞাত কারণে কখনও তদন্ত হয়নি। কেমিস্ট এন্ড ড্রাগিস্ট সমিতির সভাপতি মো. সাদেকুর রহমান জানান, দেশের ২০ হাজার কোটি টাকার ওষুধের বাজার রয়েছে। এসব ওষুধের বাজার তৈরি হয়েছে ওষুধের দোকানের মাধ্যমে। এসব ফার্মেসির ক্ষেত্রে জরুরি ভিত্তিতে ফার্মাসিস্টদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হলে শুধু ওষুধ শিল্পই উপকৃত হবে তাই নয়, সরকারও পাবে শতকোটি টাকার রাজস্ব। তিনি দ্রুত ফার্মাসিস্টদের প্রশিক্ষণ ও পরীক্ষা চালুর দাবি জানান। সমিতির মাধ্যমে বেআইনিভাবে কোন আর্থিক সুবিধা নেয়া হয়নি বলে তিনি দাবি করেন এবং তারা ফার্মাসিস্টদের প্রশিক্ষণের জন্য সংগৃহীত অর্থ ব্যয় করে থাকেন বলে জানান।