বাংলাদেশে দুর্নীতির ব্যাপকতা বেড়েছে

আপডেট : ০৫ ডিসেম্বর ২০১২, ২২:৪২
আন্তর্জাতিক দুর্নীতি বিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের করা ‘দুর্নীতির ধারণাসূচকে’ বাংলাদেশের অবস্থান গত বছরের তুলনায় ২৪ ধাপ পিছিয়েছে। বিশ্বের ১৭৬টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৪৪তম। নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সরকারের কাজ না করা, পদ্মা সেতু, রেলওয়ের ঘুষ কেলেঙ্কারি, শেয়ার বাজার কেলেঙ্কারি, হলমার্ক, ডেসটিনির মতো বহুল আলোচিত দুর্নীতির ‘বহর’-এর কারণে বাংলাদেশের এই অবনতি ঘটেছে। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী উচ্চ পর্যায় এবং ক্ষমতাশালীদের সম্পদের হিসেব প্রকাশ না করা এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের স্বাধীনতা এবং কার্যকারিতা হ্রাস পাওয়াও এর কারণ বলে টিআই-এর ‘দুর্নীতির ধারণাসূচক-২০১২’ শীর্ষক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশগুলোর দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান গত বছরের মতো ১৩তম অবস্থানে বহাল রয়েছে। অর্থাত্ জরিপে উল্লেখিত দেশগুলোর মধ্যে অন্তত ১২টি দেশের দুর্নীতির পরিস্থিতি বাংলাদেশের চেয়েও উদ্বেগজনক। গত বছর মোট ১০০ স্কোরের মধ্যে ২৭ স্কোর পেলেও এ বছর বাংলাদেশের প্রাপ্ত স্কোর ২৬। সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে আফগানিস্তান ও বাংলাদেশ ছাড়া বাকি দেশগুলোর দুর্নীতি পরিস্থিতির উন্নতি ঘটেছে। গতকাল বুধবার রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর পক্ষ থেকে এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানানো হয়। টিআই পরিচালিত ‘দুর্নীতির ধারণাসূচক ২০১২’ প্রতিবেদনটি বাংলাদেশে প্রকাশ করেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। টিআইবি ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারপারসন অ্যাডভোকেট সুলতানা কামালের সভাপতিত্বে সংবাদ সম্মেলনে আরো উপস্থিত ছিলেন টিআইবি ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য এম. হাফিজউদ্দিন খান। ড. ইফতেখারুজ্জামান জানান, টিআই-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশে দুর্নীতির ব্যাপকতা বেড়েছে। গত বছর (২০১১) বিশ্বের ১৮৩টি দেশের পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে যে সূচক করা হয়েছিল তাতে ঊর্ধ্বক্রম অনুযায়ী (ভাল থেকে খারাপ) বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১২০ নম্বরে। আর এবার ২৪ ধাপ পিছিয়ে ২০১২ সালে ১৭৬টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৪৪তম। অবশ্য উল্টো দিক থেকে বিবেচনা করলে সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ১৩ নম্বরে। এই বিবেচনায় গতবছরও একই অবস্থানে ছিল বাংলাদেশ। প্রতিবেদন অনুযায়ী এ বছর একই স্কোর পেয়ে বাংলাদেশের সাথে ১৩তম অবস্থানে রয়েছে ক্যামেরুন, মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র, কঙ্গো রিপাবলিক, সিরিয়া ও ইউক্রেন। বার্লিনভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল গতকাল বুধবার সারাবিশ্বে একযোগে এই প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কম দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ ভুটান, তাদের প্রাপ্ত স্কোর ১০০-তে ৬৩, ঊর্ধ্বক্রম তালিকায় অবস্থান ৩৩তম। ৪০ স্কোর নিয়ে শ্রীলংকা রয়েছে ৭৯তম অবস্থানে। ৩৬ স্কোর করে ভারতের অবস্থান ৯৮তম। একই স্কেলে ২৭ স্কোর নিয়ে নেপাল ১৪১ ও পাকিস্তান রয়েছে ১৪৩তম অবস্থানে। অন্যদিকে আফগানিস্তনের স্কোর মাত্র ৮, অবস্থান ১৭৪তম। এবারের সূচক অনুযায়ী বিশ্বের সবচেয়ে কম দুর্নীতির দেশ ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড ও নিউজিল্যান্ড। এই তিন দেশের স্কোর ১০০-তে ৯০। ৮৮ স্কোর পেয়ে তালিকার দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে সুইডেন এবং তৃতীয় স্থানে রয়েছে সিঙ্গাপুর যার স্কোর ৮৭। প্রতিবেদন অনুযায়ী কোন দেশই ১০০ স্কোরের মধ্যে ১০০ পায়নি। গত বছর ভালোর তালিকার শীর্ষে ছিল নিউজিল্যান্ড। ডেনমার্ক ও ফিনল্যান্ড ছিল দুই নম্বরে। এবার সবচেয়ে বেশি দুর্নীতির দেশ হিসেবে এসেছে আফগানিস্তান, কোরিয়া ও সোমালিয়ার নাম। দেশগুলোর স্কোর ১০০-তে মাত্র ৮। গত বছর সর্বশেষ অবস্থানে ছিল সোমালিয়া ও উত্তর কোরিয়া। এই সূচক অনুযায়ী ২০০১ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ ছিল বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ। বিভিন্ন দেশের দুর্নীতির পরিস্থিতি নিয়ে প্রতি বছর এই ধারণাসূচক প্রকাশ করে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল। সংস্থাটির দাবি, এই সূচক প্রামাণ্য কোনো বিষয় না হলেও এতে দুর্নীতির বিস্তারের একটি ধারণা পাওয়া যায়। টিআই প্রতিবেদন অনুসারে ২০১১ সালের তুলনায় কম স্কোর পেয়েছে, এ রকম ৩১টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ একটি। একইভাবে উচ্চক্রম অনুসারে নিজেদের অবস্থান নেমেছে এমন ৫৭টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ রয়েছে। নিম্নক্রম অনুসারে বাংলাদেশ আগের অবস্থানে থাকার পরও দুর্নীতির মাত্রা বেড়েছে। এর কারণ জানতে চাইলে ইফতেখারুজ্জামান সাংবাদিকদের বলেন, অন্য দেশ ভালো বা মন্দ করায় এটি হতে পারে। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে স্কোর ও উচ্চক্রমে নেমে যাওয়া। দুর্নীতির ধারণাসূচকে অবস্থানের উন্নতি করতে এসব বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার সুপারিশ করে টিআইবি। সুপারিশমালার মধ্যে রয়েছে দুদককে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেয়া, প্রশাসন ও আইন-শৃংখলা বাহিনীকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার না করে তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে হস্তক্ষেপ না করা, সরকারি ক্রয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সংসদ সদস্যরা যাতে সংসদ অধিবেশন বর্জন করতে না পারে এজন্য আইন করতে হবে। সংসদীয় কমিটিগুলোকে কার্যকর করতে হবে। এক প্রশ্নের জবাবে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বাংলাদশে যদি মধ্যম পর্যায়েও দুর্নীতি প্রতিরোধ করতে পারে তাহলে ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি বাড়বে। অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল বলেন, বাংলাদেশ মানব উন্নয়নসহ অনেক সূচকে পৃথিবীর অনেক দেশের থেকে ভালো অবস্থানে। তার মানে এই নয় দুর্নীতির চিত্র গোপন করতে হবে। বরং এর তথ্য প্রকাশ করে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। দুর্নীতি কমিয়ে আনতে হবে। যত বেশি আলোচনা হবে তত বেশি সংশোধন হবো। তাই আলোচনা-সমালোচনাকে সরকারকে ইতিবাচক হিসেবে নিতে হবে। বাংলাদেশে দুর্নীতির ব্যাপকতা উদ্বেগজনক উল্লেখ করে ড. ইফতেখারুজ্জামান সাংবাদিকদের আরো বলেন, যদিও দুর্নীতি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সুশাসন ও দারিদ্র্য দূরীকরণের পথে কঠিনতম অন্তরায়, তথাপি দেশের আপামর জনগণ দুর্নীতিগ্রস্ত নয়। তারা দুর্নীতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ও ভুক্তভোগী মাত্র। ক্ষমতাবানদের দুর্নীতি ও তা প্রতিরোধে দেশের নেতৃত্ব ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানসমূহের ব্যর্থতার কারণে দেশ বা জনগণকে কোনোভাবেই দুর্নীতিগ্রস্ত বলা যাবে না। টিআইবি জানায়, এ বছর দুর্নীতির ধারণাসূচক নির্ণয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল নির্ণয়ন পদ্ধতির ক্রমবর্ধমান উত্কর্ষতা ও সূচকের সহজতর বোধগম্যতার জন্য নতুন স্কেল ব্যবহার করেছে। ১৯৯৫ সাল থেকে ব্যবহূত ০-১০ এর স্কেলের পরিবর্তে দুর্নীতির ধারণার মাত্রাকে ০-১০০-এর স্কেলে দেখানো হয়েছে। এই পদ্ধতি অনুসারে এবার স্কেলের শূন্য অবস্থানকে দুর্নীতির ব্যাপকতার ধারণায় সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত এবং ১০০ অবস্থানকে দুর্নীতির ব্যাপকতার ধারণার মাপকাঠিতে সবচেয়ে কম দুর্নীতিগ্রস্ত বা সর্বোচ্চ সুশাসন প্রতিষ্ঠিত দেশ বলে ধারণা করা হয়। দুর্নীতির ধারণাসূচক ২০১২-এর জন্য বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তথ্যসূত্র হিসেবে ৭টি প্রতিষ্ঠানের যথাক্রমে বার্টেলসমান ফাউন্ডেশন কর্তৃক পরিচালিত ট্রান্সফরমেশন ইনডেক্স ২০১২, ইকোনোমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট কর্তৃক পরিচালিত কান্ট্রি রিস্ক রেটিংস, গ্লোবাল ইনসাইটের কান্ট্রি রিস্ক রেটিংস, পলিটিক্যাল রিস্ক সার্ভিসেস-এর ইন্টারন্যাশনাল কান্ট্রি রিস্ক গাইড, বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি পলিসি অ্যান্ড ইনস্টিটিউশনাল অ্যাসেসমেন্ট ২০১১, ওয়ার্ল্ড ইকোনোমিক ফোরামের এক্সিকিউটিভ ওপিনিয়ন সার্ভে ২০১২ এবং ওয়ার্ল্ড জাস্টিস প্রজেক্ট পরিচালিত রুল অব ল ইনডেক্স-এর রিপোর্টসমূহ জরিপে ব্যবহূত হয়েছে।