বিজয়ের স্মৃতি

প্রতিদিন বাড়ছিল লাশের স্তূপ

আপডেট : ০৬ ডিসেম্বর ২০১২, ২২:১৪
অসহযোগ আন্দোলনের সময় আমি দৈনিক বাংলায় কাজ করতাম। সেই সময় পত্রিকাটির নাম ছিল ‘দৈনিক পাকিস্তান’। নামে ‘পাকিস্তান’ হলেও পত্রিকাটি ওই উত্তাল সময়ে বাংলাদেশের সার্বিক মুক্তির লক্ষ্যে সর্বাত্মকভাবে নিয়োজিত ছিল। ফলে ওই সময় পাকি-স্তানি কর্তৃপক্ষের সুনজরে আমরা ছিলাম না। কিন্তু নামে পাকিস্তান থাকার কারণেই সম্ভবত ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের সেই ভয়াবহ রাতে পত্রিকাটি রক্ষা পায়। ২৫ মার্চ থেকে ২৭ মার্চ পর্যন্ত কারফিউ বলবত্ থাকায় এবং সেনাবাহিনীর পৈশাচিক অভিযান চলার কারণে পত্রিকার সকল সাংবাদিক ও কর্মচারী অফিসে আটকা পড়েছিল। ২৫ মার্চের গণহত্যার পর এটা পরিষ্কার হয়ে যায় যে, স্বাভাবিক-সুস্থ গণতান্ত্রিক পরিবেশ আর অতি সহজে ফিরে আসছে না। ফলে আমাদের মধ্যে এ চিন্তা দৃঢ়মূল হয়—দেশের মধ্যেই থাকি আর যেখানেই থাকি পাকিস্তানি অপশাসনকে রোখার একটা ব্যবস্থা করতেই হবে। মার্চের ২৭ তারিখে কারফিউ কয়েক ঘণ্টার জন্য তুলে নেয়ার সুযোগে আমরা অফিস থেকে বাড়ি ফিরতে পেরেছিলাম। সন্ধ্যার দিকে রেডিওতে খুব ক্ষীণ কণ্ঠে একটি ঘোষণা শোনা যায় বাংলাদেশের স্বাধীনতার। এই ঘোষণাটি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামেই বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণার কথা বলা হয়। ঘোষণার কণ্ঠস্বরটি মেজর জিয়াউর রহমানের ছিল। এই ঘোষণা শোনার পর স্বাভাবিকভাবেই আমাদের মধ্যে নতুনভাবে চিন্তা-ভাবনা করা তথা বাংলাদেশের স্বাধীনতার সপক্ষে কিছু করার চিন্তা দেখা দেয়। দেশের এই অবস্থায় আমরা ভাবতে থাকি—কীভাবে নিজেদের পথে এগুনো যাবে। গণহত্যায় বিধ্বস্ত দেশে প্রতিদিন মানুষের লাশের স্তূপ বাড়তে থাকে। এপ্রিলের শুরুতে এক রাতে পত্রিকার কাজ করার সময় আমরা বিশ্বনেতৃবৃন্দের কিছু বাণী রেডিওতে শুনতে পাই। এ বাণীতে বাংলাদেশে গণহত্যা বন্ধ এবং রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের আহ্বান জানানো হয়। ১৭ এপ্রিল মুজিব নগরের সরকারের ঘোষণা আমাকে অবিলম্বে কিছু করতে উদ্বুদ্ধ করে। এই সময় আমার পুরো পরিবার ঢাকা ছেড়ে কুমিল্লার চান্দিনা হয়ে আগরতলায় পৌঁছায়। যেখান থেকে পরে তারা কলকাতায় যায়। আমি তখনও ঢাকায়। আমি ভেবেছিলাম, সাধারণ কিছু কাজ শেষ করে আমিও চলে যাবো। ইতিমধ্যে ঢাকায় কল্যাণ ও সংহতি কমিটি নামে একটি সংগঠন গঠন করা হয়। এই কমিটিতে জামায়াতে ইসলামী ও মুসলিম লীগের লোকজন এবং সেনাবাহিনীর কিছু অবসরপ্রাপ্ত অফিসার ছিলেন। এদের নেতৃত্বে ছিলেন এককালে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের মার্শাল ল’ অ্যাডমিনিস্ট্রেটর মেজর জেনারেল ওমরাও খান। আলোচ্য সংগঠনটি সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং সাংবাদিকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে হুমকি দিতে থাকে। আমাদের পত্রিকা অফিসের ভবনে মর্নিং নিউজ পত্রিকাটির অফিস ছিল। এক রাতে অফিসে হাতবোমা নিক্ষিপ্ত হয়। পরদিন সকালে সেনাবাহিনীর লোকজন আমাদের অফিস ভবন বস্তুতপক্ষে ঘেরাও করে ফেলে। সেনাবাহিনীর কিছু সদস্য বিকালের দিকে নিউজরুমে এসে আমাদের এক সিনিয়র সাব-এডিটরকে নানা বিষয়ে প্রশ্ন করে ধমক দিতে থাকে। একপর্যায়ে তাকে তুলে নিয়ে যাওয়ার কথাও বলে। ইতিমধ্যে অফিসে আমার শুভানুধ্যায়ীরা আমাকে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য বলেন। কারণ তাদের কাছে খবর ছিল—এরপর সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় আর নাও আসতে পারে। পরদিন সকালে আমি এবং আমার ছোট ভাইসহ স্কুটারে করে ঢাকা থেকে চান্দিনা চলে যাই। আমার ভাই ঢাকার একটি বীমা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলেন। পথে নদী পার হয়ে তিনবার স্কুটার বদল করতে হয়। চান্দিনাতে আমার ছোট ভাইয়ের সহপাঠীর রাজাপুরের বাড়িতে চলে যাই। রাজাপুর ত্রিপুরা সীমান্তে। এখান থেকেই আমরা ত্রিপুরা হয়ে কলকাতায় যাই। এবার কলকাতায় আমি ‘শরণার্থী’ হয়ে এলাম। পশ্চিমবঙ্গের এক গ্রামে আমার বাবার বাড়ি। গ্রামটি সাতক্ষীরা সীমান্তে। নাম হাকিমপুর। কলকাতা থেকে আমরা হাকিমপুরে পৌঁছালাম। আমার পরিবারের অন্য সদস্যরা আগেই ওখানে পৌঁছেছিলেন। হাকিমপুর তখন কয়েক লাখ শরণাথীর এক মহাশিবিরে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন পাকিস্তান থেকে বিতাড়িত হাজার হাজার মানুষ অসহায়, নিঃসহ, কেউ কেউ স্বজন হারানোর মর্মজ্বালা নিয়ে এসে হাজির হচ্ছেন। ছোট্ট এই গ্রামে এমন কোনো বাড়ি ছিল না, যেখানে শত শত শরণার্থী অবস্থান না নিয়েছে। আমার বাবার বাড়িটি দোতলা পাকা। বাড়িটির তিনটি কক্ষ ছাড়া প্রতিটি ঘরে কোনো না কোনো পরিবার আশ্রয় নিয়েছিলেন। এরা সবাই সীমান্তের ওপারের গ্রামগুলো থেকে এসেছেন এবং পরিচিত। গ্রামে নেতৃস্থানীয় যারা ছিলেন তাদের চিন্তা-ভাবনা এরকম ছিল যে, এত শরণার্থী এ গ্রামে যদি এভাবে অবস্থান করে তাহলে সামগ্রিক পরিবেশের দূষণ দেখা দেবে। সাথে সাথে অন্যান্য রোগ-ব্যাধিও। এজন্য স্থির হলো, এসব শরণার্থীকে সীমান্ত ছাড়িয়ে অন্য জায়গায় পাঠানো হবে। ইতিমধ্যে মুজিবনগরে বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার শপথ গ্রহণ করেছে এবং সরকার মুক্তিযুদ্ধের জন্য সশস্ত্র বাহিনী ও মুক্তিবাহিনী গঠনের কাজ হাতে নিয়েছেন। এবং সকলকে এ কাজে সহযোগিতা করার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন। হাকিমপুর গ্রামকে বেছে নেয়া হলো মুক্তিযুদ্ধের গেরিলা সংগঠনের অন্যতম প্রশিক্ষণ শিবির হিসাবে। আমার নিজের ব্যক্তিগতভাবে লক্ষ্য ছিল, প্রত্যক্ষভাবে বাংলাদেশের মুুক্তি সংগ্রামে অংশগ্রহণ। আমার দুই ভাই মুুক্তিবাহিনীতে যোগদান করে। তারা বিহারে চাকুলিয়ায় প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছিলেন। কিছুদিন এই প্রশিক্ষণ শিবিরে সহায়ক হিসাবে কাজ করার পর আমার কাছে পরিষ্কার হলো—আমার নিজের পেশার ভিত্তিতেই আমাকে মুক্তিযুদ্ধের কাজে নিয়োজিত করতে হবে। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কার্যক্রম মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে চালু হয়ে গেছে। আমাকে একদিন খবর পাঠানো হলো, মুজিবনগর সরকারের তথ্য দপ্তর থেকে এবং নির্দেশ দেয়া হয়েছে স্বাধীন বাংলা বেতারে যাওয়ার জন্য। তখন স্বাধীন বাংলা বেতারে আমার পরিচিত বন্ধু-বান্ধব অনেকেই কর্মরত ছিলেন। আমিও একজন ভাষ্যকার হিসাবে যোগ দিলাম। এরপর ধারাবাহিকভাবে প্রতিদিনই ‘পিন্ডির প্রলাপ’ নামে একটি কথিকা প্রচার করেছি। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। এই বেতার তরঙ্গের শব্দ সৈনিকদের মধ্যে দুইজনের নাম সর্বাগ্রে উল্লেখযোগ্য। প্রথমজন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান—যার বাণী-বক্তৃতা ছিল স্বাধীন বাংলা বেতারের অপরিহার্য অঙ্গ। আরেকজন হলেন চরমপত্রের এম আর আখতার মুকুল। অন্য যাঁরা ছিলেন তারা সবাই প্রচণ্ড নিষ্ঠা এবং কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে নিজেদের দায়িত্ব সম্পাদন করেছেন। এখনও সেইসব দিনের কথা ভেবে আমি আলোড়িত হই। লেখক: স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শব্দ সৈনিক ও সাংবাদিক