আওয়ামী লীগের সতর্ক প্রতিক্রিয়া বিএনপি দুষছে সরকারকে

আপডেট : ০৬ ডিসেম্বর ২০১২, ২২:১৫
পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির তদন্ত পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ায় অভিযুক্তদের নাম সংযোজন-বিয়োজন নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ দলের আলোচনা কার্যত ভেস্তে যাওয়ার বিষয়ে সতর্ক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন আওয়ামী লীগ নেতারা। তারা বলছেন, পদ্মা সেতু প্রকল্প বাস্তবায়ন হবে না-এ রকম চূড়ান্ত কথা বলার সময় এখনও আসেনি। তবে দুদক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের ঐকমত্য না হওয়ার জন্য সরাসরি সরকারকে দুষছে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি। তাদের ভাষ্য, সরকার দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত মূল হোতাদের আড়াল করার চেষ্টা করার কারণেই পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্পের ভাগ্য অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। জাতীয় পার্টির (জেপি) মতে, সন্দেহ-অবিশ্বাস দূর করতে সরকারকেই আরও কার্যকরভাবে আন্তরিক হতে হবে, নিতে হবে বিশ্বাসযোগ্য পদক্ষেপ। অবশ্য ওয়ার্কার্স পার্টি মনে করছে, বিশ্বব্যাংক আরও আগেই অর্থায়ন না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এখন যা বলছে সবই অজুহাত। আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, আসলে ঐকমত্য হয়েছে নাকি হয়নি তা স্পষ্টভাবে বলতে পারবে দুদক ও বিশ্বব্যাংক। এরসঙ্গে সংশ্লিষ্ট অর্থ মন্ত্রণালয়ও বিষয়টি জানতে পারে। এর বাইরে অন্য যারা মন্তব্য-বক্তব্য দিচ্ছেন তা তাদের নিজস্ব বিষয়। এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী হানিফ বলেন, ‘পদ্মা সেতু নির্মাণ করার বিষয়টি আমাদের নির্বাচনী অঙ্গীকার। এজন্য অর্থ ও যোগাযোগ মন্ত্রণালয় দায়িত্বপ্রাপ্ত। কোথায় কী অনিয়ম হয়েছে কী হয়নি, সংশ্লিষ্টরাই এ ব্যাপারে অবহিত। গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, দুদকের তদন্তে সন্তুষ্ট হতে পারেনি বিশ্বব্যাংকের আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ দল। বিশেষ করে পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্পে অনিয়ম বা দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িত সন্দেহভাজনদের কারও কারও বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিতে দুদক সম্মত না হওয়ায় ক্ষুব্ধ হয় বিশ্বব্যাংকের বিশেষজ্ঞ প্যানেল। আর এনিয়ে ঐকমত্য না হওয়ায় পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্পে নতুন করে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়। এ ব্যাপারে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ইত্তেফাককে বলেন, বিশ্বব্যাংক, অর্থ মন্ত্রণালয় ও দুদকের কথাবার্তায় পরিষ্কার যে, এই প্রকল্পে দুর্নীতি হয়েছে। আর এতে জড়িত সরকারের প্রভাবশালী মহল। প্রকৃত রহস্য যেন জনসমক্ষে উন্মোচিত হতে না পারে সেজন্যই সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন ও প্রধানমন্ত্রীর অর্থ উপদেষ্টা ড. মশিউর রহমানকে আইনি পদক্ষেপের বাইরে রাখার চেষ্টা করছে সরকার। এটি বুঝতে পেরেছে বিশ্বব্যাংক। তাদের পাঠানো বিশেষজ্ঞ দলের কাছে প্রতীয়মান হয়েছে যে, সরকার প্রকৃত অপরাধীদের রক্ষা করতে চাচ্ছে। এজন্যই বিশ্বব্যাংক আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। এর মধ্য দিয়ে পদ্মা সেতু নির্মাণ আর না হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। আর এরজন্য সম্পূর্ণ দায়ী সরকারের উপর মহল। তবে যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের গতকাল সাংবাদিকদের বলেছেন, পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্প ঝুলে গেছে-নিশ্চিতভাবে একথা বলার সময় এখনও আসেনি। পুরো বিষয়টি স্পষ্ট হওয়ার জন্য ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে বলে জানান তিনি। তদন্ত করে দুদক যখন বলছে যে, পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্পে দুর্নীতির ষড়যন্ত্র হয়েছে এবং এজন্য তদন্ত প্রতিবেদনে সংস্থাটি ৭ থেকে ১০ জনের নামও উল্লেখ করেছে তখন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দল শরিক বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন সম্পূর্ণ দায় চাপিয়েছেন বিশ্বব্যাংকের উপরই। তিনি ইত্তেফাককে বলেন, আমি শুরু থেকেই বলছি- পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্পের চুক্তি বাতিলের ঘটনা বিশ্বব্যাংকের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। দুর্নীতি বা অনিয়মের ষড়যন্ত্রের অভিযোগ একটি অজুহাত। প্রকৃত কথা হচ্ছে, বিশ্বব্যাংক এ প্রকল্পে আর অর্থায়ন করবে না, এই সিদ্ধান্ত তা আরও আগেই নিয়েছে, এখন শুধু অজুহাত ধরছে। জাতীয় পার্টি-জেপি মহাসচিব শেখ শহীদুল ইসলাম মনে করছেন, পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়নে বাংলাদেশ সরকার ও বিশ্বব্যাংক উভয়েই আগ্রহী। বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধি দল দু’বার বাংলাদেশে এসেছে, এর মধ্য দিয়েই তাদের আগ্রহ প্রকাশ পায়। সুতরাং এ প্রকল্পের অনিশ্চয়তা কাটানোর জন্য সরকারের উচিত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া। যতদ্রুত এ পদক্ষেপ নেয়া হবে ততোই দেশ ও প্রকল্পের জন্য মঙ্গলজনক। তিনি বলেন, আমরা মনে করি যে, সরকারের সর্বোচ্চ মহলসহ সংশ্লিষ্ট সকলে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন যাতে পদ্মা সেতু প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে সন্দেহ ও অনিশ্চয়তার অবসান ঘটে। এদিকে, দুদকের সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের ঐকমত্য না হওয়ার বিষয়টিকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেছেন সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী ও প্রাক্তন বিএনপি নেতা ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা। তিনি ইত্তেফাককে বলেন, সরকার একজন উপদেষ্টা ও সাবেক একজন মন্ত্রীর পক্ষে অবস্থান নেয়ার কারণেই প্রকল্পের ভাগ্য অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে। এখানে সরকার মনে করছে উপদেষ্টা ও সাবেক মন্ত্রী অপরাধী সাব্যস্ত হলে এর দায় পড়বে পুরো মন্ত্রিসভার ওপর, অর্থাত্ রাষ্ট্রের নির্বাহী প্রধান হিসাবে এর দায়িত্ব নিতে হবে প্রধানমন্ত্রীকে। এ জন্যই সরকার তাদের পক্ষ নিয়েছে। এদিক থেকে সরকারের অবস্থান সঠিক। কিন্তু সরকার কিংবা দুদকও শেষ পর্যন্ত স্বীকার করেছে যে, দুর্নীতি হয়নি, ষড়যন্ত্র হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের কাছে এই ষড়যন্ত্রের চেষ্টাও অপরাধ হিসাবে গণ্য। দুর্নীতি হোক কিংবা দুর্নীতির ষড়যন্ত্র হোক, দুটিই বিশ্বব্যাংকের মানদণ্ডে ক্ষমার অযোগ্য। এ বিবেচনায় বিশ্বব্যাংকের অবস্থানও সঠিক। যেখানে সরকার ও বিশ্বব্যাংক যে যার অবস্থান থেকে সঠিক সেখানে ভূমিকা রাখার সুযোগ ছিল দুদকের। সরকার কী মনে করলো- সেদিকে না তাকিয়ে একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসাবে দুদক যদি সঠিক ভূমিকা রাখতে পারতো তাহলে হয়তো সুরাহার কিংবা মতৈক্য সৃষ্টির সুযোগ তৈরি হতো। কিন্তু এক্ষেত্রে দুদক এখন পর্যন্ত ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে।