সাঈদীর বিচার শেষ যে কোন দিন রায়

আপডেট : ০৬ ডিসেম্বর ২০১২, ২২:১৬
মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে আনীত মামলার বিচার কাজ শেষ হয়েছে। যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের চেয়ার-ম্যান বিচারপতি নিজামুল হক গতকাল বৃহস্পতিবার বিচার কাজের সমাপ্তি টেনে বলেছেন, যেকোন দিন মামলার রায় ঘোষণা করা হবে। এ সংক্রান্ত আদেশে বলা হয়েছে, ট্রাইব্যুনালে সুবিধাজনক যেকোন দিন এ রায় ঘোষণা করা হবে। গতকাল এ মামলায় যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ করে আসামিপক্ষ। পরে অল্প সময়ের জন্য প্রত্যুত্তর দেয় রাষ্ট্রপক্ষ। উভয়পক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল-১ সাঈদীর মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখে। ২০১০ সালের ২৫ মার্চ মানবতাবিরোধী অপ-রাধের বিচারে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠিত হওয়ার পর এই প্রথম কোন মামলা চূড়ান্ত নিষ্পত্তির অপেক্ষায়। এদিকে গতকাল শুনানির শেষ পর্যায়ে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী কোরআন স্পর্শ করে নিজেকে নির্দোষ দাবি করে ট্রাইব্যুনালের উদ্দেশে বলেন, এই বিচার দুই পর্বে শেষ হবে। এক পর্বে আপনারা বিচারক আমি আসামি। দ্বিতীয় পর্বে আরেকটি বিচার হবে কেয়ামতের মাঠে যেখানে বিচারক হবেন আল্লাহ্। ওই বিচারের দিন আমি থাকবো বাদী। আপনাদের করবো বিবাদী। জবাবে ট্রাইব্যুনাল বলে, আল্লাহ্ যে দায়িত্ব আমাদেরকে দিয়েছেন তা যেন আমরা পালন করতে পারি। আমরা সাক্ষ্য প্রমাণ দেখেই এ মামলার রায় দেব। কাগজপত্রে যা আছে তার মধ্যে নিজেদেরকে রেখে রায় দেব। আদালতের কার্যক্রম শেষে প্রসিকিউটর সৈয়দ হায়দার আলী সাংবাদিকদের বলেন, গত বছরের ৭ ডিসেম্বর থেকে এ মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। বৃহস্পতিবার সব কার্যক্রম শেষে ট্রাইব্যুনাল মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রেখেছে। তিনি বলেন, আসামির বিরুদ্ধে আনা ২০টি অভিযোগের মধ্যে ১৯টি প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছি। আমাদের দাখিলকৃত দালিলিক প্রমাণ এবং সাক্ষীদের জবানবন্দির মাধ্যমে আশা করছি তার সর্বোচ্চ শাস্তি হবে। এর আগে রাষ্ট্রপক্ষে যুক্তি উত্থাপনকালে তিনি ট্রাইব্যুনালের কাছে সাঈদীর সর্বোচ্চ শাস্তি প্রার্থনা করেন। অন্যদিকে সাঈদীর আইনজীবী মিজানুল ইসলাম বলেন, সাঈদীর বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণে রাষ্ট্রপক্ষ ব্যর্থ হয়েছে। তাদের আনীত অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট। এ অভিযোগে সাঈদীর একদিনের জন্যও শাস্তি হতে পারে না। তিনি বলেন, দেলাওয়ার হোসেন শিকদার নামের এক রাজাকারের বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগ সাঈদীর ওপর চাপানোর চেষ্টা করেছে রাষ্ট্রপক্ষ। শিকদার এবং সাঈদী এক নয়। শিকদার ভিন্ন ব্যক্তি। রাষ্ট্রপক্ষ তার অভিযোগ সাঈদীর নামে চালিয়ে দিচ্ছে। প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশনের মহাসচিব সৈয়দ রেজাউল হক চাঁদপুরীর দায়ের করা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার অভিযোগে একটি মামলায় সাঈদীকে ২০১০ সালের ২৯ জুন গ্রেফতার করা হয়। ওই বছরের ২ আগস্ট তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়। গত বছরের ১১ জুলাই সাঈদীর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে প্রসিকিউশন। পরে ১৪ জুলাই তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নেয় ট্রাইব্যুনাল। অভিযোগের বিষয়ে শুনানি শেষে ৩ অক্টোবর সাঈদীর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে এই মামলার আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়। সাঈদীর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনকালে মুক্তিযুদ্ধকালে পিরোজপুর জেলায় হত্যা, গণহত্যা, ধর্ষণ এবং এ ধরনের অপরাধে সাহায্য করা ও জড়িত থাকার ঘটনায় ২০টি অভিযোগ আনা হয়। গত বছরের ২০ ও ২১ নভেম্বর রাষ্ট্রপক্ষের সূচনা বক্তব্য (ওপেনিং স্টেটমেন্ট) উত্থাপন করেন চিফ প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপু ও প্রসিকিউটর সৈয়দ রেজাউর রহমান। এ মামলায় সাঈদীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয় গত বছরের ৭ ডিসেম্বর। প্রায় সাড়ে চার মাসে তদন্ত কর্মকর্তাসহ ২৮ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দেন। তাদের মধ্যে ঘটনার বিষয়ে ২০ জন এবং ৭ জন জব্দ তালিকার বিষয়ে সাক্ষ্য দেন। ২ সেপ্টেম্বর থেকে সাঈদীর পক্ষের সাক্ষীদের সাফাই সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। এর আগে সাঈদীর পক্ষে সাফাই সাক্ষ্য দিতে আসামিপক্ষ ৪৮ জনের নামের তালিকা দিলেও ২০ জন সাক্ষীকে সাক্ষ্য দেয়ার জন্য অনুমোদন দেয় ট্রাইবুনাল। ২০ জনের মধ্যে আসামিপক্ষের ১৭ জন হাজির হয়ে সাফাই সাক্ষ্য দেন। গত ২৩ অক্টোবর তারা আর কোনো সাফাই সাক্ষী আনতে না পারায় সেদিনই সাফাই সাক্ষ্যগ্রহণ বন্ধ করে যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের তারিখ ধার্য করে ট্রাইবুনাল। সাঈদীর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগঃ মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিন হাজারেরও বেশি নিরস্ত্র ব্যক্তিকে হত্যা বা হত্যায় সহযোগিতা, নয়জনেরও বেশি নারীকে ধর্ষণ, বিভিন্ন বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে লুটপাট, ভাঙচুর এবং ১০০ থেকে ১৫০ হিন্দুকে ধর্মান্তরে বাধ্য করার ২০টি ঘটনার অভিযোগ আনা হয় সাঈদীর বিরুদ্ধে। অভিযোগে বলা হয়, সাঈদী ছিলেন আরবি ও উর্দু ভাষায় পারদর্শী এবং বাকপটু। এটাকে ব্যবহার করে পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে তিনি সখ্য এবং পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন এজাজের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করেন। এ কারণে তিনি রাজাকার বাহিনীর কমান্ডার হতে সক্ষম হন। তার নেতৃত্বে এবং তার সহযোগিতায় পিরোজপুরের পারেরহাট বন্দরসহ বিভিন্ন এলাকায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং রাজাকার বাহিনী হত্যাযজ্ঞ, অগ্নিসংযোগ, লুট, ধর্ষণসহ বিভিন্ন অপরাধ সংঘটিত করে। রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ, সাঈদীর আসল নাম দেলোয়ার হোসেন শিকদার। একাত্তরে তিনি পিরোজপুরে এ নামেই পরিচিত ছিলেন। লোকে তাকে ‘দেইল্লা রাজাকার’ নামেও চিনতেন। স্বাধীনতার পর তিনি নিজের অপরাধকে আড়াল করার জন্য বোরকা পরে গরুর গাড়িতে চড়ে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যান। পরে অস্ত্রসহ যশোরের মো. রওশন আলীর বাড়িতে আত্মগোপন করেন। অনেকদিন পর তার অপরাধের কাহিনী জানাজানি হলে তিনি পরিবার নিয়ে অন্যত্র চলে যান। এরপর ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের পর রাজনৈতিক পট-পরিবর্তনের পর তিনি আত্মগোপন অবস্থা থেকে বের হয়ে আসেন এবং ভুয়া মাওলানা পরিচয়ে ওয়াজ মাহফিল শুরু করেন। নিজের নাম পাল্টে করেন দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী। এভাবেই তিনি আল্লামা মাওলানার পরিচয়ে নিজের অপরাধ ঢাকার চেষ্টা করেন। এ মামলায় সাঈদীর পক্ষে শুনানি করেন ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক, মিজানুল ইসলাম, তাজুল ইসলাম, ব্যারিস্টার তানভীর আহমেদ আল আমিন, মনজুর আহমেদ আনসারি এবং রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন চীফ প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপু, রানা দাশগুপ্ত, সৈয়দ হায়দার আলী, জেয়াদ আল মালুম, মোখলেছুর রহমান বাদল প্রমুখ। প্রতিটি অভিযোগ মিথ্যা ঃ সাঈদী নিজের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের আনা প্রতিটি অভিযোগই মিথ্যা বলে দাবি করেছেন জামায়াতের নায়েবে আমীর দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী। গতকাল বৃহস্পতিবার যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের অনুমতি নিয়ে তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের দ্বারা প্ররোচিত হয়ে পিরোজপুরের বর্তমান এমপির সঙ্গে যোগসাজশ করে আমার বিরুদ্ধে এসব মিথ্যা অভিযোগ আনা হয়েছে। সাঈদী ট্রাইব্যুনালের উদ্দেশ্যে ন্যায় বিচার করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, আমার বিরুদ্ধে আনা একটি অভিযোগও যদি সত্য হয়, তবে আমি আল্লাহর নামে শপথ করে পবিত্র কোরআন ছুঁয়ে বলছি, এই বিচার দুই পর্বে সম্পন্ন হবে। আমি আশা করবো, আপনারা হক বিচার করবেন। পরম করুণাময়ের কাছে দোয়া করি, তিনি আপনাদের হেদায়েত করুন। যদি আপনারা হক বিচার না করেন, তবে আমার সন্তান, আমার প্রিয়জন, আমার ভক্ত সবার অভিশাপের চোখের পানি একদিন অগ্নিশিখা, বহ্নিশিখা হয়ে জ্বলবে। এর আগে সাঈদীর আইনজীবী মিজানুল ইসলাম এ বিষয়ে ট্রাইব্যুনালের কাছে সময় চেয়েছিলেন। চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হক তাকে জিজ্ঞাসা করেন, আপনি কি নিশ্চিত করতে পারবেন তিনি (সাঈদী) কাউকে কটাক্ষ করে, কাউকে হেয়প্রতিপন্ন করে কথা বলবেন না? এ সময় সাঈদী আসামির কাঠগড়ায় উঠে দাঁড়িয়ে বলেন, ‘আমি যা বলবো, সত্য কথা বলবো। কাউকে কটাক্ষ করে বা হেয় করে কথা বলবো না।’ এরপর ট্রাইব্যুনাল সময় দিলে সাঈদী তার তিন মিনিটের বক্তব্যে বলেন, ‘আমি দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ৫৬ হাজার বর্গমাইলের এই বাংলাদেশের সর্বত্র একটি মাত্র নাম। অথচ তদন্ত কর্মকর্তা আমাকে কখনও দেলোয়ার হোসেন, কখনও দেলু, কখনও দেইল্যা আবার কখনও রাজাকার বলে অভিহিত করেছেন। আমার বিরুদ্ধে চুরি, ব্যভিচার, লুটপাট ইত্যাদি অভিযোগ এনেছেন। বর্তমান সরকারের প্ররোচনায় তদন্ত কর্মকর্তা ১২-১৪ বার পিরোজপুরে গেছেন। তিনি বর্তমান এমপির (আব্দুল আওয়াল) সঙ্গে যোগসাজশ করে আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ এনেছেন। যিনি মুসলমান, যিনি বিশ্বাস করেন কেয়ামত আছে, আল্লাহর প্রতি যার প্রেম আছে, তিনি কোনো মুসলমানের বিরুদ্ধে এতো মিথ্যা অভিযোগ আনতে পারেন না।’ ‘সঠিক রায় দেয়ার চেষ্টা করবো’: ট্রাইব্যুনালের আদেশে বলা হয়, আজ ৬ ডিসেম্বর। গত বছরের ৭ ডিসেম্বর এই মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়েছিল। ঠিক এক বছরের মাথায় সাক্ষ্যগ্রহণ ও যুক্তিতর্ক শেষ হলো। আমরা আগেও বলেছি, এখনও বলছি, আল্লাহ আমাদের যে মহান দায়িত্ব দিয়েছেন, সে দায়িত্ব আমরা সঠিকভাবে পালন করবো। আমরা সাক্ষ্য ছাড়া আর কোনও দিকে তাকাবো না। নথিপত্রের বাইরে আর কিছু দেখা হবে না। ট্রাইব্যুনালের ওপর বিশ্বাস রাখেন। আমরা কাগজপত্র, সাক্ষী, যুক্তিতর্ক ইত্যাদির ভিত্তিতে সঠিক রায় দেয়ার চেষ্টা করবো।