বাংলাদেশের বৃহত্তম কর্মসংস্থান ক্ষেত্র আমাদের তৈরি পোশাকশিল্প খাত। পোশাকশিল্পের কল্যাণে দেশের হাজার হাজার নারী-পুরুষ বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তি পেয়েছে। বিশেষ করে নারী শ্রমিক যারা ত্রিশ বছর আগে কল্পনাও করতে পারেননি এমন একটি কর্মসংস্থান পাবেন। আজকের কিশোরী, তরুণীর পক্ষে যা সহজলভ্য দুই দশক আগে তা ছিল স্বপ্নের অতীত।
সেই স্বপ্নের ঠিকানায় পৌঁছে তাঁরা বিবিধ কারণে হোঁচট খাবেন—আগুনে পুড়ে মরার মতো মর্মান্তিক এবং শোকাবহ ঘটনার কেন্দ্রবিন্দু হবেন তা হয়তো ভাবেননি— ভাবেননি বলেই তাদের এত হাহাজারি, এত কান্না, এত দীর্ঘশ্বাস। দীর্ঘশ্বাসকে দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর করার লোকেরও অভাব নেই যেন। ফুলকিকে আগুনে পরিণত করতে ফুঁ দিচ্ছে অনেকে। শ্রমিক অসন্তোষ ছাড়াই কেন কারখানায় কারখানায় এত অগ্নিকাণ্ড? সুমি বেগমদের মতো লোককে দু’টাকার লোভ দেখিয়ে কারা লাভবান হচ্ছে, হতে পারছে এই জঘন্য কর্ম তা অবশ্যই তদন্ত করে উদঘাটন করতে হবে। এসবের পেছনে যে গভীর এবং হীনষড়যন্ত্র কাজ করছে না তাইবা কে বলতে পারে? কোনো দেশকে, দেশের জনগণকে হতদরিদ্র রাখলে যাদের লাভ তাদের দুরভিসন্ধিও এর পেছনে ইন্ধন জোগাতে পারে।
এ ব্যাপারে শ্রমিকের চেয়ে মালিকপক্ষই সচেতন থাকবেন এটাই হওয়া উচিত। কারখানাটি মালিকের। এটির রক্ষণাবেক্ষণ করার দায়-দায়িত্বও তাঁরই। শত-সহস্র শ্রমিক কারখানায় কাজ করছে, শ্রম বিনিয়োগ করে নিজেরা উপকৃত হচ্ছে, উপকার করছে মালিকদেরও। কারণ হতদরিদ্র পরিবারের ঐ ছেলেটি অথবা মেয়েটি সস্তায় শ্রম বিনিয়োগ করছে বলেই তিনি প্রত্যাশার চেয়ে অধিক মুনাফার মুখ দেখছেন। এই একটি মাত্র কারণ—সস্তা শ্রম ক্রয়ের জন্য বাংলাদেশের পোশাকশিল্প শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে গেছে। সস্তা শ্রম বিক্রি করতে এসে তারা পুড়ে আংড়া কয়লা হোক এটা নিশ্চয়ই কেউ চাইবেন না। কেননা কত পরিশ্রমে, কত ক্ষতি পুষিয়ে একজন আনাড়ি অদক্ষ শ্রমিক কর্মদক্ষ হয়েছে। সেই শ্রমিক যখন ফ্যাক্টরিসহ পুড়ে ছাই হয়ে যায় তখন কষ্ট রাখার জায়গা থাকে না। শ্রমিক ফ্যাক্টরির প্রাণ। তাদের বাঁচিয়ে রাখা, সুস্থ রাখাও মালিকের কর্তব্য। ছোটবেলায় দেখেছি চা বাগানের কুলিদের স্বাস্থ্য রক্ষায় ডাক্তার, কমপাউন্ডার, মিডওয়াইফ, ওষুধ-পথ্য, দুধ ইত্যাদির বন্দোবস্ত রাখা হতো। কারণ একটাই—কুলি ছাড়া বাগানের মালিক অচল। কুলি বাগানের প্রাণ, কুলি না বাঁচলে বাগান বাঁচবে না।
সমগ্র জাতির এখন একটাই চাওয়া— পোশাকশিল্পের সঙ্গে যাঁরা সংশ্লিষ্ট আছেন তাঁরা অবশ্যই সচেতন হবেন, যাতে কোনোক্রমেই, কোনো পরিস্থিতিতেই দেশের বৃহত্তম এ শিল্পখাত ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। তা হলে জাতি অর্থনৈতিক দিক দিয়ে যতটুকু এগিয়েছে, তারচেয়ে বেশি পিছিয়ে পড়বে। আমাদের সবাইকে বুঝতে হবে, গার্মেন্টসশিল্প দেশের আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে বিশাল বিপ্লব ঘটিয়েছে।
বাংলাদেশের এমন কোনো শিল্প-কারখানা আছে কি, যেখানে শতকরা আশিজন নারী শ্রমিক কাজ করে? এইভাবে দফায় দফায় আগুন লেগে গার্মেন্টসগুলো ধ্বংস হলে এদের কর্মসংস্থান কোথায় হবে? এমন সংস্থা আছে কি? যাতে আবার শত-সহস্র শ্রমিক বেকারত্বের অভিশাপে না পড়ে সেদিকে সবিশেষ যত্নবান হতে হবে। শিক্ষিত-অশিক্ষিত বলে কথা নেই, প্রশিক্ষিত দুই হাতে তারা বাংলাদেশের জন্য আনছে মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা। কর্মঠ এই হাত দুটো সচল থাক।
গার্মেন্টস এমন এক শিল্প যার চাহিদা বাড়বেই, কমবে না। সারা জীবনে একজন মানুষ কত সেট কাপড় পরে নিজেও জানে না। বস্ত্র ছাড়া তো চলা যাবে না। রসিকতা করে বলা হলেও কথাটি সত্য—আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেছেন, দর্জি পোশাক তৈরি করে দিয়ে মানুষকে শালীন এবং ভদ্র করেছে। গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি দর্জিরই কারখানা। সুতরাং ভদ্র ও শালীন থাকতে হলে দর্জিকে মেরে নয় বরং তাকে রক্ষা করতে হবে যে কোনো মূল্যে।
ঢাকা
