গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধ

আপডেট : ০৭ ডিসেম্বর ২০১২, ২০:৫৬
নদীবেষ্টিত বরিশাল জেলার স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস এ অঞ্চলের মানুষের বীরত্বের মহিমায় ভাস্বর। কিন্তু এই ইতিহাসের প্রতিটি পাতা রঞ্জিত পাক হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসরদের হাতে নির্মমভাবে নিহত হাজারো মানুষের রক্তে, তাদের স্বজনদের চোখের জলে। ১৯৭১-এর ৮ ডিসেম্বর বরিশাল মুক্ত হয় হানাদারদের কবল থেকে। ৯ মাসের দীর্ঘ সংগ্রামের হয় অবসান। বরিশালবাসীর সেই সংগ্রামের কাহিনীই তুলে ধরেছেন ইত্তেফাকের বরিশাল ব্যুরো প্রধান লিটন বাশার ব রি শা ল ১৯৭১ সালের ৮ ডিসেম্বর বরিশালসহ দক্ষিণাঞ্চলের অধিকাংশ জেলা পাক হানাদার মুক্ত হয়। ৭ ডিসেম্বর সীমান্তে মিত্র বাহিনী আক্রমণ শুরু করার পর সন্ধ্যা থেকেই পাক সেনারা বরিশাল ত্যাগের প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। বরিশাল শহরমুখী সড়ক পথগুলো মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ায় নৌযানে করে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী, পাক মিলিশিয়াসহ দালাল ও রাজাকাররা বরিশাল ত্যাগ করে। পাক বাহিনীর শহর ত্যাগের খবরে ৮ মাস অবরুদ্ধ থাকা মুক্তিকামী মানুষ বিজয়ের আনন্দে শ্লোগান দিয়ে দলে দলে রাস্তায় নেমে আসে। সকাল ৮টায় মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার সুলতান মাস্টারের কাছে রাজাকার ও আলবদররা আত্মসমর্পণ করে। ১৭ ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধাদের অন্যতম সংগঠক তত্কালীন জাতীয় পরিষদের সদস্য নূরুল ইসলাম মঞ্জুর ও লে. মাহফুজ আলম বেগের কাছে বরিশাল ওয়াপদায় ও গৌরনদীতে পাকিস্তানি ঘাঁটিতে লুকিয়ে থাকা পাক সেনা ও তাদের দোসররা আত্মসমর্পণ করে। যুদ্ধের প্রস্তুতি পর্ব: বরিশালের মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করতে প্রথম বৈঠক বসে নূরুল ইসলাম মঞ্জুরের বাড়িতে। সেখানে সংক্ষিপ্ত বৈঠক করে তত্কালীন জেলা প্রশাসক আইয়ুবুর রহমান সিএসপি, পুলিশ সুপার ফখরুদ্দিন আহমেদ, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক কাজী আজিজুল ইসলাম সরকারি কর্মকর্তাদের সহায়তায় ২৫ মার্চ শেষরাতে পুলিশ বাহিনীর অস্ত্রাগার থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের রাইফেল সরবরাহ করা হয়। স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রথম সচিবালয় গড়ে তোলা হয় পেশকার বাড়ি সংলগ্ন সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে। ২৬ মার্চ মুক্তিযুদ্ধ ও প্রশাসন পরিচালনার জন্য শক্তিশালী সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে দায়িত্ব বণ্টন করা হয়। এরমধ্যে বেসামরিক বিভাগে নূরুল ইসলাম মঞ্জুর, প্রতিরক্ষা বিভাগে মেজর এমএ জলিলসহ বিভিন্ন বিভাগের দায়িত্ব পান তত্কালীন আব্দুল মালেক খান, মহিউদ্দিন আহমেদ, এডভোকেট আমিনুল হক চৌধুরী, আমির হোসেন আমু, শামসুল হক, এডভোকেট ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন, এডভোকেট হাসান ইমাম চৌধুরী, এডভোকেট সরদার জালাল উদ্দিন, ডাঃ হুরমত আলী, এডভোকেট হেমায়েত উদ্দিন আহমেদ, মাকসুদ আলী বাদল, এম এ বারেক ও লুত্ফর রহমান। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ প্রদান করেন ক্যাপ্টেন নূরুল হুদা হিরু, লে. মেহেদি, আলী ইমাম, লে. নাসির, লে. অধ্যাপক সামসুদ্দিন খান, মাহফুজ আলম বেগসহ কয়েকজন। নৌপথে পাক সেনাদের আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য জুনাহার নদীতে মুক্তিবাহিনীর একটি শক্তিশালী ঘাঁটি স্থাপন করে তা পরিচালনার দায়িত্ব দেয়া হয় ফ্লাইট সার্জেন্ট ফজলুল হককে। আক্কাস হোসেনের নেতৃত্বে শিল্পীরা দেশাত্মবোধক গান ও সংগীত পরিবেশন করে যুদ্ধে প্রেরণা যুগিয়েছেন। সংগ্রাম পরিষদের অনুমোদিত বাংলাদেশ নামের একটি অর্ধসাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশনার দায়িত্ব পালন করেন এসএম ইকবাল, মিন্টু বসু ও হেলাল উদ্দিন। পাক বাহিনীর আক্রমণ: ১৮ এপ্রিল ৬টি পাক জঙ্গি বিমান এসে বরিশাল শহরের বেলসপার্কে (বঙ্গবন্ধু উদ্যান) প্রশিক্ষণরত মুক্তিযোদ্ধাদের লক্ষ্য করে গুলি চালায়। বৃষ্টির মত গুলিবর্ষণে আতংকে শহর ছেড়ে পালায় অনেক মানুষ। লোকজন গ্রামে আশ্রয় নিয়ে মাটি খুঁড়ে বাংকার তৈরি করে থাকে। ২৫ এপ্রিল মাহফুজ আলম বেগের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধাদের ৩৫ জনের একটি দল বানারীপাড়া থানায় আক্রমণ চালিয়ে লুট করে নেয় সব অস্ত্র। কিছুদিন পরই বাউকাঠী এলাকায় দু’জন নারীযোদ্ধাসহ মুক্তিযোদ্ধাদের ৩৭ জনের একটি দল পাক সেনাদের একটি লঞ্চে গুলিবর্ষণ করে। নিহত হয় ৭/৮ জন পাক সেনা। বর্বরতা: ঝুনাহার নদী দিয়ে পাক বাহিনী নৌপথে বরিশালে প্রবেশের পর থেকেই তারা শুরু করে নিরীহ মানুষের ওপর নির্যাতন, খুন, ধর্ষণ, লুটপাট। পাক বাহিনী বিভিন্ন স্থান থেকে মুক্তিযোদ্ধাসহ নিরীহ লোকজনদের ধরে নিয়ে গৌরনদী কলেজের অস্থায়ী ক্যাম্পে হাত-পা, চোখ বেঁধে তাদের ওপর নির্মম নির্যাতন চালায়। দড়ি দিয়ে ঝুলিয়ে তাদের পেটায়, বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে রক্তাক্ত করে। পাক বাহিনীর অমানুষিক নির্যাতনে বেঙ্গল রেজিমেন্ট থেকে পালিয়ে আসা সিপাহী আনোয়ারসহ অনেক মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। ঝালকাঠীর ফিরোজ কবিরকে গুলি করে হত্যা করে পাক বাহিনী। সম্মুখ যুদ্ধ: এপ্রিল মাসের শেষদিকে পাক হানাদার বাহিনী ভূরঘাটার ইল্লা গ্রামে ঢুকে পড়ে। তারা সেখানে একটি কালিপূজার অনুষ্ঠানে গিয়ে এলোপাতাড়ি গুলি চালায়। নিহত হন দু’জন পুরোহিত। দু’জন অধ্যাপক গুরুতর জখম হন। এ সময়ে সেখানে এসে পাক সেনাদের ওপর আক্রমণ করে মুক্তিযোদ্ধারা। বেধে যায় দু’পক্ষের মধ্যে সম্মুখ যুদ্ধ। পাকবাহিনীর ভারি মেশিনগানের গুলিতে সেখানে ৫ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। এছাড়া গৌরনদী, আগৈলঝাড়া, পয়সার হাট, কোটালীপাড়ায় সম্মুখ যুুদ্ধে অর্ধশত মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। মে মাসের শুরুতে গৌরনদী থেকে পাকবাহিনীর একটি দল বরিশাল শহরে ঢুকতে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের গুলিতে মারা পড়ে। ৩ মে মেদাকুল পাক সেনাদের ঘাঁটি থেকে ৪ সৈন্য পূর্ব নবগ্রামে ঢুকে সিদ্ধেশ্বর সরকারের বাড়িতে লুটপাট চালায়। গ্রামবাসী ধারালো অস্ত্র নিয়ে ঐ ৪ সৈন্যকে খতম করে। ১৪ জুন রাতে হরিণাহাটি নামক স্থানে মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে সম্মুখ যুদ্ধে পিছু হটে পাক বাহিনী। কোটালীপাড়া থানায় আশ্রয় নিয়ে তারা রাজাকার-আলবদর ও পুলিশের সহায়তায় মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর পাল্টা গুলিবর্ষণ করে। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধাদের প্রবল আক্রমণের মুখে টিকতে না পেরে একপর্যায়ে পালানোর চেষ্টা করে তারা। খালের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ে দু’ শতাধিক পাক সেনা, রাজাকার-আলবদর ও পুলিশ। পরদিন খালে ভাসমান অবস্থায় তাদের ৫০টি মৃতদেহ পাওয়া গিয়েছিল। বন্দী করা হয়েছিল শত্রুপক্ষের ১৮ জনকে। পরদিন পাক সেনারা লঞ্চ নিয়ে পয়সার হাটে পৌঁছালে মুক্তিযোদ্ধারা লঞ্চে গুলি চালায়। এতে পাকবাহিনীর ৬ সৈন্য নিহত ও বেশ কয়েকজন আহত হয়। গৌরনদী, উজিরপুর, কোটালীপাড়া ও গোপালগঞ্জ থেকে ৪টি স্পিডবোটযোগে পাকসেনারা প্রতিশোধ নিতে কোদালধোয়া গ্রামের দিকে অগ্রসর হয়। কিন্তু পয়সারহাট থেকে ৮ মাইল দূরে সংঘটিত যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধারা তাদেরকে পরাস্ত করে। এ যুদ্ধে ৯ পাক সেনা মারা যায়। ৩৭টি গণকবরে হাজারো মানুষ: বরিশালের ৩৭টি গণকবর স্বাধীনতা যুদ্ধে পাকবাহিনীর বর্বরতার সাক্ষী হয়ে আছে। নগরীর পানি উন্নয়ন বোর্ড সংলগ্ন কীর্তনখোলা তীরের বধ্যভূমিতে হত্যা করা হয় অন্তত দেড় হাজার লোককে। নগর সংলগ্ন তালতলী বধ্যভূমিতে অর্ধশত মানুষকে হত্যা করা হয়। চরকাউয়া মোসলেম মিয়ার বাড়ি সংলগ্ন খালের পাড় এলাকায় অর্ধশত ব্যক্তিকে হত্যা করে লাশ মাটিচাপা দেয়া হয়। গৌরনদীর বাটাজোর মরার ভিটার গণকবরে দু’শ ব্যক্তিকে হত্যা করে মাটিচাপা দেয়া হয়। গৌরনদী কলেজ সংলগ্ন ঘাট ও গয়নাঘাটা পুল এলাকায় এলাকার দু’টি গণকবরে মাটিচাপা দেয়া হয়েছে ৪শ’ ব্যক্তিকে। আগৈলঝাড়া কাটিরা ব্যাপ্টিস্ট চার্চ সংলগ্ন বধ্যভূমিতে অর্ধশতাধিক ব্যক্তিকে হত্যার পর গণকবর দেয়া হয়। উপজেলার রাংতা বিল ও রাজিহার বধ্যভূমিতে ৫ শতাধিক মানুষের মৃতদেহ মাটিচাপা দেয়া হয়। কেতনার বিল বধ্যভূমিতে হত্যা করা হয় ৬ থেকে ৭শ’ ব্যক্তিকে। বাকেরগঞ্জের কলসকাঠীর গণকবরে রয়েছে ৪ শতাধিক ব্যক্তির লাশ। উপজেলার বেবাজ বধ্যভূমিতে গণহত্যার শিকার হয় ২ শতাধিক ব্যক্তি। বানারীপাড়ার দক্ষিণ গাভা নরের কাঠী বধ্যভূমিতে হত্যা করা হয় শতাধিক ব্যক্তিকে। বাবুগঞ্জের ক্যাডেট কলেজ বধ্যভূমিতে গণহত্যার শিকার হয় অর্ধশতাধিক নিরীহ মানুষ। উজিরপুর বড়াকোঠা দরগাবাড়ি বধ্যভূমিতে হত্যা করা হয় শতাধিক ব্যক্তিকে। স্বরূপকাঠি কুড়িয়ানা খালের বধ্যভূমিতে হত্যা করা হয় প্রায় এক হাজার ব্যক্তিকে। কুড়িয়ানা জয়দেব হালদার বাড়ি বধ্যভূমিতে হত্যা করা হয় ৫ শতাধিক মানুষকে। পূর্বজলাবাড়ী খালপাড় বধ্যভূমিতে হত্যা করা হয় ২ শতাধিক মানুষকে। কেমন আছেন মুক্তিযোদ্ধারা: নানান প্রতিশ্রুতি আর পরিকল্পনার কথা শুনতে শুনতে জীবনের শেষপ্রান্তে দাঁড়িয়েছেন এমজি কবির ভুলু। দু’ ছেলে ও এক মেয়ে মুক্তিযোদ্ধার কোটায় আজো চাকরি পায়নি। ভুলু প্রতিমাসে ৬ হাজার ৭শ’ টাকা মুক্তিযোদ্ধা ভাতা পান। কিন্তু ১৯৯০ সালের আগে তার নাম ছিল না মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায়। ভুলুর দুঃখ, যারা তার সাথে সরাসরি মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে যুদ্ধ করেছেন তাদের অনেকের নাম এখনো তালিকায় নেই। অথচ এই তালিকায় স্বাধীনতা বিরোধীদেরও অনেকে নাম লিখিয়ে সরকারি সুবিধা ভোগ করছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। নগর সংলগ্ন কাশিপুর এলাকার আব্দুস সাত্তার মুক্তিযুদ্ধে বীর উত্তম খেতাব পেয়েছিলেন, পেয়েছিলেন সনদ। কিন্তু সেই সনদের মর্ম না বুঝে তা বাক্সবন্দি করে রেখে দেন তিনি, অতিকষ্টে চালিয়েছেন নিজের সংসার। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে আব্দুস সাত্তার মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় নাম উঠানোর জন্য সনদটি মুক্তিযোদ্ধা সংসদে জমা দিলে সর্বত্র হইচই পড়ে যায়। পত্র-পত্রিকায় বিশাল শিরোনাম হয় ‘দুই যুগ পর এক বীর উত্তমের সন্ধান লাভ।’ এরপর একটি বেভারেজ কোম্পানিতে নিরাপত্তা রক্ষীর চাকরি পান আব্দুস সাত্তার। কিন্তু আর এক মুক্তিযোদ্ধা আগৈলঝাড়ার মাগুরা গ্রামের জিয়াত আলী ফকিরের (৭৫) মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকু পর্যন্ত নেই। স্বাধীনতার ৪১ বছর পরও অপরের বাড়িতে আশ্রিত জিয়াত আলী ও তার পরিবার। একই উপজেলার সুজনকাঠী গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা ক্ষিতিস চন্দ্র সরকার (৭২) এক ছেলে এক মেয়ে নিয়ে অনাহারে-অর্ধাহারে জীবন কাটাচ্ছেন। মুলাদীর চর লক্ষ্মীপুর গ্রামের রহিম ফকিরের (৭০) নেই কোন আয়ের উত্স। বৃদ্ধ এ মুক্তিযোদ্ধা জীবনের শেষ বেলায় অসহায় অবস্থায় মৃত্যুর প্রহর গুনছেন।