আজ ৮ ডিসেম্বর। ১৯৭১ সালের এই দিনে দেশের বিভিন্নস্থান শত্রুমুক্ত হয়। এ উপলক্ষে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে ঐ এলাকার মুক্তিযোদ্ধা ও বিভিন্ন সংগঠন। খবর ইত্তেফাক প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের।
কুমিল্লা
১৯৭১ সালের এদিনে পাকহানাদার বাহিনীর কবল থেকে মুক্ত হয় ‘কুমিল্লা’। দীর্ঘ নয় মাসের যুদ্ধ আর নির্যাতনের পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে মুক্তিযোদ্ধা মিত্রবাহিনীসহ জনগণের উল্লাস ধ্বনিতে কুমিল্লা প্রকম্পিত হয়ে উঠে। এ সময়ে কুমিল্লা সেনানিবাসের চতুর্দিকে পাকসেনাদের ঘিরে ফেলে মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর জোয়ানরা। পরে ১৬ ডিসেম্বর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে সেনানিবাস পাক হানাদার দখলমুক্ত হয়। ৮ ডিসেম্বর ভোরে মুক্তিসেনারা চকবাজার, রাজগঞ্জ, টমছমব্রীজ ও গোমতী পাড়ের ভাটপাড়া দিয়ে আনন্দ উল্লাস করে শহরে প্রবেশ করে। তখন রাস্তায় নেমে আসে বিজয় উল্লাসে উদ্বেলিত জনতার ঢল। এদিন বিকালে টাউন হল মাঠে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়। তত্কালীন পূর্বাঞ্চলের প্রশাসনিক কাউন্সিলের চেয়ারম্যান মরহুম জহুর আহমেদ চৌধুরী দলীয় পতাকা ও কুমিল্লার প্রথম প্রশাসক এডভোকেট আহমদ আলী জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন।
চাঁদপুর
হাজীগঞ্জ, লাকসাম, মুদাফ্ফরগঞ্জ এলাকায় মিত্রবাহিনীর সাথে প্রায় ৩৬ ঘণ্টা যুদ্ধের পর পাকসেনারা ৭ ডিসেম্বর পরাজিত হয় এবং ৮ ডিসেম্বর পালিয়ে যায়। ৮ ডিসেম্বর মুক্তি বাহিনী ও ভারতীয় সৈন্যরা ট্যাঙ্ক বহর নিয়ে চাঁদপুর শহরে প্রবেশ করে এবং মেঘনা নদী দিয়ে প্রায় ৬শ হানাদার বাহিনীর সদস্য ২টি জাহাজে করে ঢাকায় পালিয়ে যাওয়ার পথে মুক্তিযোদ্ধারা কামানের গোলা মেরে তাদের মেঘনা নদীতে কবর রচনা করে ও চাঁদপুর চিরতরে শত্রুমুক্ত হয়।
এদিকে মুক্ত দিবস পালনে এবং যুদ্ধাপরাধীদের দ্রুত বিচার সম্পন্ন করার দাবিতে প্রতি বছরের ন্যায় এবারও স্থানীয় হাসান আলী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে মাসব্যাপী মুক্তিযুদ্ধের বিজয় মেলা শুরু হয়েছে।
ঝালকাঠি
এই দিনে পাকবাহিনী আর রাজাকারদের কবল থেকে দখলমুক্ত হয় তত্কালীন মহাকুমা শহর ঝালকাঠি। ঘরে ঘরে ওড়ে লাল সবুজের পতাকা। ৭ ডিসেম্বর রাতে রাজাকাররা মাইকিং করে শহরে কারফিউ ঘোষণা করে। ভোর হওয়ার সাথে সাথেই পাকিস্তানি সৈন্যরা স্পিডবোটযোগে স্থানীয় রাজাকারদের সঙ্গে নিয়ে ঝালকাঠির হিন্দু অধ্যুষিত এলাকায় অভিযানে নামে। দুপুরে তারা ফিরে আসে এবং ৩২ জন রাজাকারকে কাঠপট্টি খেয়াঘাট সংলগ্ন এলাকায় নামিয়ে দিয়ে শহর ছেড়ে পালিয়ে যায়। এ সময় জনসাধারণ জয় বাংলা শ্লোগান দিয়ে লাঠিসোঁটা নিয়ে রাজাকারদের পিছু ধওয়া করে। এতে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে রাজাকাররা নিজেদের সাথে থাকা রাইফেল ফেলে দিয়ে আত্মসমর্পণ করে। পরে তাদের নিয়ে যাওয়া হয় পশ্চিম ঝালকাঠির মুক্তাঞ্চলে এবং গণধোলাই দিয়ে মেরে ফেলা হয় রাজাকারদের। এছাড়া আজ নলছিটি মুক্ত দিবস। ৭ ডিসেম্বর রাতে মুক্তিযোদ্ধারা ঘিরে ফেলে নলছিটি শহর। সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে তারা শহরে প্রবেশ করে। এসময় পাক হানাদার বাহিনীর দোসর রাজাকার, আলবদর ও পুলিশ বাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে আত্মসমর্পণ করে।
পিরোজপুর
এ দিনে মুক্তিবাহিনীর সংবাদে ভীত হয়ে পিরোজপুর থেকে পাক হানাদার বাহিনী পালিয়ে যায়। তত্কালীন মহকুমা শহর হয় শত্রুমুক্ত। ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে মুক্তিযুদ্ধের ৯ নং সেক্টরের সুন্দরবন সাব সেক্টর কমান্ডার ক্যাপ্টেন জিয়াউদ্দিন আহমেদের নির্দেশে পিরোজপুরের হুলারহাট রাস্তা দিয়ে সুবেদার আবেদ আলী খান, পাড়েরহাটের রাস্তা দিয়ে শামসুল হক খান এবং কদমতলা দিয়ে হাবিবুর রহমান সিকদারের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা শহর অভিমুখে আসতে থাকে। এ খবরে পাকবাহিনী ভীত হয়ে পড়ে এবং তারা তড়িঘড়ি করে পিরোজপুর ত্যাগ করে। এ দিবস উপলক্ষে শহরে আনন্দ শোভাযাত্রা, মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতিচারণ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।
মীর্জাগঞ্জ (পটুয়াখালী)
এদিন ভোর রাতে গ্রুপ কমান্ডার আলতাফ হায়দারের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা উপজেলা সদর সুবিদখালীতে প্রবেশ করেন। এদিকে মুক্তিযোদ্ধারা প্রবেশ করার খবর পেয়ে পাক হানাদার বাহিনীর দোসর আলবদর, রাজাকার উপজেলা শহর থেকে অস্ত্র ফেলে পালিয়ে যায় এবং অনেকে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে আত্মসমর্পণ করে। ছাত্র-জনতার জয়বাংলা শ্লোগানে উপজেলা শহরসহ সর্বত্র মুখরিত হয়ে ওঠে। ঐ দিন ভোরে সুবিদখালী রহমান ইস্হাক হাইস্কুল মাঠে কমান্ডার আলতাফ হায়দার উত্তোলন করেন স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা। দিবসটি পালন উপলক্ষে মীর্জাগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগ, উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ও প্রেসক্লাব পৃথক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।
গৌরীপুর (ময়মনসিংহ)
এই দিনে মুক্তিযোদ্ধারা হানাদার পাকিস্তানী বাহিনীকে পরাজিত করে গৌরীপুরের আকাশে উড়িয়েছিল লাল-সবুজ খচিত স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা। রক্তঝরা ৯ মাসের যু্দ্ধ শেষে বিজয় উল্লাসে মেতে উঠেছিল গৌরীপুরের মুক্তিযোদ্ধা-জনতা।
গৌরীপুরকে হানাদার মুক্ত ও দেশকে স্বাধীন করতে বিভিন্ন রণাঙ্গনে মতিউর রহমান, আনোয়ারুল হক, সিদ্দিকুর রহমান, আব্দুল হাই, হাতেম আলী, আফাজ উদ্দিন, জসীম উদ্দিন, আনোয়ারুল ইসলাম, মঞ্জু, সিরাজুল হক, আব্দুল মতিন, ও সুধীর বড়ুয়া শহীদ হন।
ভালুকা
এই দিনে পাক হানাদার ও রাজাকার বাহিনীকে বিতাড়িত করার মাধ্যমে ভালুকা সদরসহ উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা শত্রু মুক্ত হয়। ময়মনসিংহে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ভালুকা থানা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি আফসার উদ্দিন আহম্মেদের নেতৃত্বে আফসার বাহিনী গড়ে উঠে। আফসার বাহিনী ৮ ডিসেম্বর ভালুকা, ৯ ডিসেম্বর ত্রিশাল ও গফরগাঁও শত্রু মুক্ত করে, ১০ ডিসেম্বর মুক্ত অভিযানে মিত্র বাহিনীর সাথে যোগ দেয়।
মিরপুর (কুষ্টিয়া)
বহু ত্যাগ-তিতীক্ষার বিনিময়ে কুষ্টিয়া জেলার মিরপুর এদিন পাক হানাদারমুক্ত হিসেবে ইতিহাসের পাতায় স্থান পায়। ১৯৭১ সালের ৩১ মার্চ তত্কালীন ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি আফতাব উদ্দিন খাঁনের নের্তৃত্বে শতাধিক মুক্তিকামী ছাত্র-জনতা বর্তমান কলেজ রোডস্থ মসজিদে শপথ গ্রহণ করেন।
৮ ডিসেম্বর ভোরে কমান্ডার আফতাব উদ্দিন খান ১৭০ জন মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে মিরপুর থানায় স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা গান স্যালুটের মাধ্যমে উত্তোলন করেন। এরপর ৬৫ জন পাক হানাদার বাহিনীর দোসর ও রাজাকার পাহাড়পুর মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্পে আত্মসমর্পণ করে। মিরপুর হানাদার মুক্ত হওয়ার সংবাদ এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে ১৯৭১ সালের এদিনে বিভিন্ন বয়সের হাজারও নারী-পুরুষ রাস্তায় নেমে আনন্দ উল্লাস করতে থাকে।
দৌলতপুর
আজ দৌলতপুর মুক্ত দিবস। তত্কালীন দৌলতপুর থানায় পাক হানাদারদের সাথে সবচেয়ে বড় যুদ্ধ সংগঠিত হয় ১৩ নভেম্বর ব্যাঙগাড়ী মাঠে। ৭ ডিসেম্বর রাতে পাকসেনারা পালিয়ে কুষ্টিয়ার শহরতলী জগতি বটতৈল এলাকায় আশ্রয় নেয়। এইদিনে বীর মুক্তিযোদ্ধারা বাংলাদেশের পতাকা আনুষ্ঠানিকভাবে উত্তোলনের মাধ্যমে দৌলতপুরকে শত্রুমুক্ত ঘোষণা করেন। দিনটি উপলক্ষে উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ দিনব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করবে।
লোহাগড়া (নড়াইল)
এই দিনে বীর মুক্তিযোদ্ধারা থানা আক্রমণ করে লোহাগড়াকে পাক-হানাদার মুক্ত করেন। সর্বত্র পত্পত্ করে উড়তে থাকে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা। স্বতস্ফূর্ত বিজয় উল্লাসে রাস্তায় নেমে আসে হাজার হাজার মুক্তিপাগল জনতা। ১৯৭১ সালের নভেম্বর মাসের শুরুতেই লোহাগড়া থানার অধিকাংশ এলাকা হানাদার মুক্ত হয়। এ সময় স্থানীয় রাজাকাররা থানায় আশ্রয় নেয়। তারা পুলিশ কনস্টেবল খালেকের নেতৃত্বে থানা অভ্যন্তরে অস্ত্র ও গোলাবারুদের বিশাল মজুদ গড়ে তোলে। মধ্য নভেম্বরে মুক্তিযোদ্ধারা লোহাগড়া থানা আক্রমণের চূড়ান্ত পরিকল্পনা গ্রহণ করে। লোহাগড়া মুক্ত দিবস পালন উপলক্ষে উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ দিনব্যাপী নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।
ফটিকছড়ি (চট্টগ্রাম)
এই দিন ফটিকছড়ি পাকহানাদার মুক্ত করে তত্কালীন বিএল এফ কমান্ডার আনোয়ারুল আজিম উত্তর ফটিকছড়ির নারায়ণহাট হাইস্কুল মাঠে প্রথম স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন। সেদিন মুক্তির আনন্দে আত্মহারা শত শত মুক্তিযোদ্ধা গুলি ছুঁড়ে উল্লাস প্রকাশ করেন। তাদের সাথে আনন্দে মেতে উঠেন স্থানীয় হাজার হাজার সাধারণ মামুষ।
মিরসরাই
আজ মিরসরাই পাক হানাদার মুক্ত হয়। ৭ মার্চে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণ শোনার পর থেকেই মিরসরাইয়ের সর্বস্তরের জনতা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠন শুরু করে। দিবসটি উপলক্ষে আজ শনিবার সকাল ১০টায় মিরসরাই উপজেলা মিলনায়তনে মাসিক মিরসরাই ও উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড মুক্তিযোদ্ধা সমাবেশের আয়োজন করেছে।
রামগড় (খাগড়াছড়ি)
বজ্র কঠিন আক্রমণে বিধ্বস্ত ও পরাভূত হয়ে পাকবাহিনী এই দিনে রামগড়ের মাটি ছেড়ে পালিয়ে যায়। দীর্ঘ ৭ মাস ছয়দিন শত্রুর দখলে থাকা এ জনপদ শত্রুমুক্ত হয় , মুক্তি পায় রামগড়ের মানুষ। ৭ ডিসেম্বর সকালে ভারতীয় বিমান বাহিনীর তিনটি জেট বিমান রামগড়ে দখলদার বাহিনীর অবস্থানের উপর প্রবল বোমা বর্ষণ করে। মিত্রবাহিনী ও মুক্তিবাহিনী সম্মিলিতভাবে আক্রমণ চালায় পাক হানাদারদের উপর। ফলে ভীতসন্ত্রস্ত পাকবাহিনীর সৈন্যরা ৭ ডিসেম্বর সন্ধ্যা থেকে পিছু হটতে শুরু করে। ৮ ডিসেম্বর বিকেলের আগেই পাক সৈন্যরা রামগড়ের মাটি ছেড়ে অন্যত্র পালিয়ে যায়। রামগড় বাজারে উড়ানো হয় স্বাধীন বাংলার পতাকা।
