টপ টপ করে রক্ত ঝরছিল

আপডেট : ০৭ ডিসেম্বর ২০১২, ২২:৩৮
আমি তখন ফিল্মস অ্যান্ড পাবলিকেশন্স বিভাগে কাজ করতাম। সরকারি চাকরি। ১৯৬৮ সালে ঢাকার আর্ট কলেজ থেকে আমি পাস করি। আমাদের ছাত্র জীবন পুরোপুরিই আন্দোলন-সংগ্রামের ভেতরে কেটেছে। মূলত ষাটের দশকের প্রথম থেকে এখানে নানা ধরনের আন্দোলন দানা বাঁধতে শুরু করে। আমাদের আর্ট কলেজের অগ্রজ শিক্ষার্থীরা সব সময় রাজনীতি সচেতন ছিলেন। যার সূচনা হয় ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের ভেতর দিয়েই। শুধু শিক্ষার্থীরা নয়—শিক্ষকরাও প্রত্যক্ষভাবে এসব আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। পাকিস্তান আমল থেকে বাংলাদেশ পর্ব পর্যন্ত প্রায় সব আন্দোলনে আর্ট কলেজ থেকে পোস্টার, ফেস্টুন, ব্যানার প্রভৃতি আঁকা হতো। ২১ ফেব্রুয়ারির সময় শহীদ মিনারে আল্পনা, ফেস্টুন আর্ট কলেজের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও শিল্পীরা আঁকতেন। ফেস্টুনগুলোর বিষয় ছিল প্রতিবাদী ধরনের—বলা যেতে পারে সরকার বিরোধীও। এভাবেই আমি এগিয়ে যাচ্ছিলাম স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতা অর্জনের দিকে। এলো ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালো রাত। আমি সেই রাতে আজিমপুরে ছিলাম। এমন রাত কখনো আমাদের জীবনে আগে আর আসেনি। মানুষ রাস্তায় গাছ ফেলে ব্যারিকেড দিয়ে পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। যদিও পাকবাহিনী নির্মম দমন-পীড়ন থেকে আমরা রেহাই পাইনি। তার কয়েকদিনের মধ্যে সবাইকে যার যার কর্মক্ষেত্রে যোগদান করতে সার্কুলার দেয়া হলো। আমি যেহেতু সরকারি চাকরি করতাম —তাই অফিসে যাওয়া-আসা শুরু করলাম। সরকারি অফিস হলেও অফিসে বসেই আমরা কীভাবে পাকবাহিনীকে প্রতিরোধ করতে পারি তা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করতাম। এপ্রিলের শেষ দিকে জানতে পারলাম সীমানার ওপারে ক্যাম্প গঠনের প্রস্তুতি চলছে। সেই খবরের ভিত্তিতে আমরা কয়েকজন ঢাকা ছেড়ে কুমিল্লা হয়ে সোনামুড়া দিয়ে সীমানা পাড়ি দিয়ে আগরতলায় পৌঁছলাম। সোনাপুড়ায় ক্যাপ্টেন আখতার আহমেদের সঙ্গে আমাদের দেখা হয়। সেখানে তিনি একটা ক্যাম্পের মতো করেছিলেন। যেখান থেকে তিনি চিকিত্সা সেবা দিতেন। আগরতলায় যাওয়ার কিছুদিন পর ‘মেলাঘর ক্যাম্প’ গঠনের খবর পেলাম। পরবর্তী সময় আমি সেই ক্যাম্পে যোগদান করলাম। আগস্ট মাসে ফতেহ আলীর নেতৃত্বে বাকের, কমল ও আমি প্রচুর পরিমাণ অস্ত্র-গোলাবারুদ নিয়ে ঢাকায় আসি। মেলাঘর ক্যাম্পের নির্দেশ ছিল—ঢাকার অস্ত্র ও গোলাবারুদের মজুত বাড়াতে হবে। ঢাকায় এসে আমরা বাকেরের এক আত্মীয়ের বাড্ডার বাসায় অস্ত্র-গোলাবারুদ রাখি। বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে ও প্রতিনিয়ত ঝুঁকি নিয়ে আমরা এই অস্ত্রশস্ত্র ঢাকায় নিয়ে আসি। স্থান স্বল্পতার কারণে তার বিবরণ এখানে উল্লেখ করলাম না। ৩০ আগস্ট ঢাকায় ৯টি বাসায় পাকবাহিনীরা অভিযান চালায়। এরমধ্যে সঙ্গীত শিল্পী আলতাফ মাহমুদের বাসাও ছিল। সেই রাতে আমি ওনার বাসায় ছিলাম। আলতাফ মাহমুদসহ আমি এবং আরো অনেককে পাকবাহিনী মার্শাল ল’ কোর্টে নিয়ে যায়। মার্শাল ল’ কোর্ট বসেছিল পুরাতন অ্যাসেম্বলি ভবনের পাশে সাংসদের বাসভবনে। সেখানে নিয়ে যাওয়ার পর আমি অনেক নিরীহ মানুষ ও ঘনিষ্ঠ মুক্তিযোদ্ধার দেখতে পাই। পাকবাহিনী সদস্যরা মার্শাল ল’ কোর্টে যে যার মতো ও যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে আমাদের ওপর অত্যাচার চালায়। সে এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতা। চড়-ঘুষি, রাইফেলের বাট, বুটের লাথি থেকে কেউ রেহাই পায়নি। মার্শাল ল’ কোর্টে একটি রুমে আমাদের গাদাগাদি করে রাখা হলো। আর অন্য একটি কক্ষে বিচার কাজ চলছে। এক সময় আলতাফ মাহমুদকে ডাকা হলো। দরজার ওপাশ থেকে মাঝে মাঝে ওনার চিত্কার আমাদের কানে আসছে। আর বুঝতে পেরেছি—তারা কী নির্মম নির্যাতন চালাচ্ছে ওনার ওপর। এক সময় আমাকে নাম ধরে ডাকলো। আমি অবাক হলাম এই ভেবে—কীভাবে তারা আমার নাম জানলো। আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা শুরু হলো। চললো নির্যাতন—একসময় টপ টপ করে শরীর থেকে রক্ত ঝরছিল। তারা আমার ওপর এমন নির্যাতনই করলো যার ফলে আমার আঙ্গুলের সব হাড় ভেঙ্গে গিয়েছিল। পরবর্তী সময় কিছুদিন কানে শুনতেও সমস্যা হয়েছিল। তবে আমি সবকিছু অস্বীকার করলাম। এভাবে কয়েক দফা আমাকে তারা টর্চার করলো। কতভাবেই না তারা আমাকে নির্যাতন করেছে—যার সব এখানে লিখতে পারলাম না। এক সময় তারা আমাকে অন্য একটি কক্ষে পাঠালো। সেই কক্ষে নির্যাতনের মাত্রা এমন ছিল যে এক সময় আমার কোনো বোধশক্তিই ছিল না। কোনো কিছু অনুভব করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছিলাম। আমি যখন কিছুই বলছি না, সবকিছু অস্বীকার করে যাচ্ছি তখন তারা আমাকে রমনা থানায় নিয়ে আসলো। সেখানে আমি আমার নাম থেকে ‘আলভী’ শব্দটি বাদ দিয়ে ‘সৈয়দ আবুল বার্ক’ অংশটি থানায় লিপিবদ্ধ করি। সে রাতে আমাকে থানা হাজতে রাখা হয়। পরদিন আমাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য অন্য একটি ভবনে নিয়ে যাওয়া হয়। তারপর সবকিছু অস্বীকার করে সেই বিকালে আমি ছাড়া পেলাম। ছাড়া পেলে কী হবে—ভবনের গেট পর্যন্ত হেঁটে আসার শক্তি পর্যন্ত আমার ছিল না। আর এটা তাদের কৌশল ছিল কিনা তার ব্যাপারেও আমাকে সজাগ থাকতে হয়েছে। তবে মার্শাল ল’ কোর্টে যারা গেছেন—যাদের আমি সেখানে দেখেছি—তাদের অনেকেই ফিরে আসেনি। পাকবাহিনী তাদের কই নিয়েছে আজও জানি না। লেখক:চিত্রশিল্পী