উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রত্যাশিত আশা পূরণ ছাড়াই শেষ হলো বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনের নির্ধারিত সময়। পক্ষকাল দরকষাকষির পরও শুক্রবার গভীর রাত পর্যন্ত প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি দোহা। তবে দীর্ঘ মেয়াদে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে সহায়তা দিতে রাজি উন্নতদেশগুলো। তবে পরিমাণ তারা ঠিক করেনি। প্রতিনিধিদের কেউ কেউ বলছেন, আলোচনার জট ধীরে ধীরে খুলছে, অন্যান্য আন্তর্জাতিক সম্মেলনের ধারাবাহিকতায় এবারও গভীর রাতে হয়তো একটা সমাধান আসবে।
জলবায়ু সম্মেলনের মূল দাবি কার্বন নিঃসরণ কমানো ও ক্ষতিপূরণ দেয়ায় ব্যাপারে শিল্পোন্নত দেশগুলোর ওপর শেষ পর্যন্ত কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা থাকছে না। শুক্রবার সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত বিরতিহীন দরকষাকষি করেও কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং মধ্য মেয়াদে অর্থ বরাদ্দ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, কানাডা, রাশিয়া, ব্রাজিল, সৌদি আরব ও চীনকে কোনো আইনি কাঠামোর মধ্যে আনা যায়নি। কার্বন নিঃসরণ কমানো ছাড়াও অভিযোজন খাত নিয়ে উদীয়মান অর্থনীতির জোট বেসিক এবং জি-৭৭ চায়না কোনো ঐকমত্যে পৌঁছতে পারেনি।
তবে কার্বন নির্গমন কমাতে নতুন আইনগত চুক্তির বাস্তবায়ন শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত বর্তমানের একমাত্র আইনি বাধ্যবাধকতা কিয়োটো প্রোটোকলের মেয়াদ আট বছর বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে আগের মতই যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, রাশিয়া ও জাপান এতে স্বাক্ষর করতে এখনো সম্মত হয়নি। নতুন আইনগত চুক্তি ডারবান প্ল্যাটফর্মের ব্যাপারে তিন বছর মেয়াদী একটি ‘ওয়ার্ক প্রোগ্রাম’ চূড়ান্ত করা হয়েছে। মধ্যমেয়াদী অর্থায়নের বিষয়ে খুব বেশি অগ্রগতি না হলেও, দীর্ঘ মেয়াদে ২০২০ সাল নাগাদ ১০০ বিলিয়ন ডলার দেয়ার বিষয়ে একটি কর্মপরিকল্পনা করা হয়েছে। এই কর্মপরিকল্পনায় পর্যায়ক্রমে জলবায়ু সহায়তার পরিমাণ বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে। তবে এতে স্পষ্ট কোন দিক নির্দেশনা থাকছে না।
সমঝোতাকারীরা জানান, শুরুতে যে প্রত্যাশা নিয়ে দোহা জলবায়ু সম্মেলন শুরু হয়েছিল, মাঝপথে এসে তা মুখথুবড়ে পড়ে। তা থেকে আর সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। চিনের প্রতিনিধি দলের প্রধান ও ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট এন্ড রিফর্ম কমিশন মন্ত্রী সিনহ জুনহুয়া শুক্রবার ইত্তেফাককে বলেন, এই সম্মেলনে যা হয়েছে তাতে আমরা সন্তষ্ট নয়। আশা ছিল আরো অনেক বিষয়ে নির্দিষ্ট কিছু পাওয়া যাবে। ২০০৭ সালে ইন্দোনেশিয়ার বালিতে অনুষ্ঠিত জলবায়ু সস্মেলনে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় দীর্ঘ মেয়াদী সহযোগিতা দেয়ার লক্ষ্যে বালি এ্যাকশন প্ল্যান বা বালি পরিকল্পনা করা হয়। এ পরিকল্পনাগুলো সিদ্ধান্ত আকারে নেয়ার জন্য গত পাঁচ বছর উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে উন্নয়নশীল দেশগুলোর দরকষাকষি চলে। শেষ পর্যন্ত দোহাতেই সমাপ্তি ঘটল সেই আলোচনার।
গত ২৬ নভেম্বর এ সম্মেলন শুরু হয়। বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনের শেষদিন শেষে রাতে বিভিন্ন দেশের মন্ত্রী আর সমঝোতাকারীদের কাছে জানতে চাইলে তারা বলেছেন, আলোচনা চলছে। এবারের সম্মেলনে কিয়োটো প্রটোকলের দ্বিতীয় মেয়াদ ২০২০ সাল পর্যন্ত বাড়ানো, আগামী আট বছরে জলবায়ু পরিবতর্েনর প্রভাব মোকাবেলায় প্রথম তিন বছর ৪০ বিলিয়ন ডলার ও পরে ৬০ বিলিয়ন ডলার দেয়ার প্রতিশ্রুতি চূড়ান্ত করাই ছিল মূল লক্ষ্য। কোস্টারিকার পরিবেশ মন্ত্রী রেনে দোহা সম্মেলনের সফলতা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করলেন। তিনি বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশ ডেনমার্ক, জার্মানি ও সুইডেন এরই মধ্যে মধ্য মেয়াদী আর্থিক সহায়তার ঘোষণা দিলেও অন্য উন্নত দেশগুলো কোন সহায়তার ঘোষণা দিচ্ছে না। উন্নত দেশগুলোকে এগিয়ে আসার আহবান জানালেন ইইউ’র জলবায়ু সেলের মহাপরিচালক মাইকেল ক্লারবেক।
সমঝোতায় পৌঁছতে গতকাল শুক্রবার দুপুরে বিভিন্ন গ্রুপের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করে এলডিসি, আফ্রিকান গ্রুপ ও ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন। রাতে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল, ইংল্যান্ড, চিন, ইউরোপিয় ইউনিয়ন, ভারত, অস্ট্রেলিয়াসহ প্রভাবশালী ২৬টি দেশের মন্ত্রীদের নিয়ে বৈঠক করেন সম্মেলনের সভাপতি আবদুল্লাহ আল-আতিয়া ও ইউএনএফসিসিসির নির্বাহী সেক্রেটারি ক্রিস্টিনা ফিগুয়াস। বৈঠক শেষে বাংলাদেশের পরিবেশ ও বন মন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেন, কিয়োটো প্রটোকল ও গ্রিন ফান্ড চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এখন এলসিএ’র কয়েকটি বিষয় নিয়ে মতপার্থক্য দেখা দেয়ায় আলোচনা দীর্ঘ হচ্ছে। তবে শুক্রবার রাতের মধ্যে একটি সর্বসম্মত সমঝোতা হবে বলে আশা করি।
এদিকে পরিবেশবাদিরা বলছেন, ইউরোপিয় ইউনিয়নের যে ঘোষণা আসছে তাতে নতুনত্ব নেই। বিশ্বের মাথাপিছু সর্বাধিক কার্বন নিঃসরণকারী দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের আইনি কাঠামোর মধ্যে নেই। তারা সাজানো তর্কে অযথা সময় ক্ষেপণ করছে। ৪০ বিলিয়ন ডলারের তহবিলকে অপ্রতুল বলছেন পরিবেশবাদীরা।
‘বিশ্বব্যাংক শিগগিরই পদ্মাসেতুর কাজ
শুরু করতে চায়’
পদ্মা সেতুর তদন্ত ও নির্মাণ কাজ এক সাথে করার প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ। এই প্রস্তাব বিশ্ব ব্যাংকের শীর্ষ পর্যায়ে আলোচনা করবেন বলে জানিয়েছেন ব্যাংকটির ভাইস প্রেসিডেন্ট রাসেল কাইট। কাতারের রাজধানী দোহায় জলবায়ু সম্মেলন চলাকালে শুক্রবার পরিবেশ মন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বিশ্বব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্টের সাথে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন। বৈঠক শেষে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তবে বৈঠক শেষে পদ্মা সেতু বিষয়ে কোন কথা বলতে রাজি হননি বিশ্বব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট।
ড. হাছান মাহমুদ সাংবাদিকদের জানান, পদ্মা সেতু নিয়ে রাসেল কাইটের সাথে তার আলোচনা হয়েছে। পদ্মা সেতুর গুরুত্ব অনুধাবন করে বিশ্বব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট বলেছেন, বিশ্বব্যাংক খুব শীঘ্রই পদ্মাসেতুর কাজ শুরু করতে চায়। এ ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি মোকাবেলায় বাংলাদেশের নেয়া কার্যক্রমের প্রশংসা করেছেন কাইট।
বাংলাদেশ আয়োজিত আলোচনা সভা
এদিকে গতকাল চলমান বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনে বাংলাদেশ আয়োজিত ‘ন্যাশনাল ক্লাইমেট চেঞ্জ ফাইনান্সিয়াল ম্যাকনিজম: লেসন্স লার্নড ফ্রম বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক আলোচনায় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বিশ্বব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট বলেন, জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবেলায় বাংলাদেশের গৃহীত কার্যক্রম উন্নয়নশীল দেশসমূহের জন্য অনুকরণীয়। এসময় আরো উপস্থিত ছিলেন কোস্টারিকার পরিবেশ মন্ত্রী রিনে ক্যাস্ট্রো, রুয়ান্ডার ন্যাচারাল রিসোর্স মন্ত্রী কামানজি স্টায়নিলাস, ইউরোপিয়ন ইউনিয়নের ক্লাইমেট এ্যাকশন পরিচালক মাইকেল স্টার্ভিক, মালদ্বীপের এনার্জি এন্ড এনভায়র্নমেন্ট মন্ত্রী মারিয়াম শাকিলা প্রমুখ।
