বোরো উত্পাদনে কৃষকের প্রস্তুতি

আপডেট : ০৮ ডিসেম্বর ২০১২, ১৮:৫২
সারা দেশে চলছে বোরোর বীজতলা পরিচর্যার কাজ। দেশে মোট ধানী জমির ৪১ ভাগ জমিতে বোরো ধান চাষ হয়। ধান উত্পাদন হয় ৫৬ ভাগ। চলতি বছর ৪৮ লাখ ৭০ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো উত্পাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে এক কোটি ৯৩ লাখ মেট্রিক টন। যা গত বছর ছিল ৪৮ লাখ হেক্টর জমিতে এক কোটি ৯২ লাখ মেট্টিকটন। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে গতবছর উত্পাদন বেশি হয়েছিল। এবারো কৃষক আশাবাদী। দেশে উচ্চ ফলনশীল জাতের ধান যেমন- বিআর-১, বিআর-২, বিআর-৩, বিআর-৬, বিআর-৭, বিআর-৮, বিআর-৯, বিআর-১১, বিআর-১২, বিআর-১৪, বিআর-১৫, বিআর-১৬, বিআর-১৭, বিআর-১৮, বিআর-১৯, ব্রি ধান-২৮, ব্রি ধান-৩৫, ব্রি ধান-৩৬, ব্রি হাইব্রিড ধান-১, ব্রি হাইব্রিড ধান-২, বিনা ধান-৫, বিনা ধান-৬, ইরাটম-২৪ কৃষক পর্যায়ে চাষ করা যেতে পারে। বোরোর ফলন বেশি পেতে হলে দরকার সঠিক সময়ে সার দেয়া। শেষ চাষের সাথে প্রতি বিঘায় টিএসপি ১৩ কেজি, এমওপি ১২ কেজি, জিপসাম ৮ কেজি, গন্ধক ৬ কেজি ও দস্তা ১ কেজি মিশিয়ে দিতে হবে। চারা রোপণের ১০ থেকে ১৫ দিন পর ০.৯ গ্রাম আকারের ৩টি বা ২.৭ থেকে ৩.০ গ্রাম আকারের ১টি গুটি ইউরিয়া চারাগুছির মাঝখানে ৪ থেকে ৫ সেন্টিমিটার গভীরে প্রয়োগ করতে হয়। এতে প্রতি বিঘায় ২১ থেকে ২২ কেজি গুটি ইউরিয়া লাগে। ধান কাটা পর্যন্ত একবার প্রয়োগ করলে ২০ থেকে ২৫ ভাগ ফলন বেশি হয়। এতে প্রতি বিঘায় অতিরিক্ত ২০৪ কেজি বেশি ধান উত্পাদন হয়। এতে ৩৫ থেকে ৪০ ভাগ ইউরিয়া সার কম লাগে। সার দেয়ার আগে আগাছা পরিস্কার করতে হবে। গবেষণায় দেখা গেছে- আগাছা ২০ থেকে ২৫ ভাগ ফলন কমিয়ে দেয়। কারণ আগাছা পুষ্টি শোষণ করে। সঠিক সময়ে আগাছা দমন করলে ২০ থেকে ২৫ ভাগ ফলন বাড়ে। পৌষ-মাঘ মাসের মধ্যে বোরো ধান রোপণ করলে ফলন বেশি হয়। সারি থেকে সারির দূরত্ব ২০ থেকে ২৫ সেন্টিমিটার এবং গুছি থেকে গুছির দূরত্ব ১৫ থেকে ২০ সেন্টিমিটার হবে। চারার বয়স ৪০ থেকে ৫০ দিন হতে হবে। চারা একটু গভীরে রোপণ করলে বেশি পুষ্টি গ্রহণ করতে পারে। জমি সমতল করতে হবে। চারা সুস্থ সবল সবুজ ও সতেজ হতে হবে। প্রতি গোছায় ২ থেকে ৩ টি চারা রোপণ করতে হবে। ধানের চারা মরে গেলে পুনরায় নতুন চারা রোপণ করতে হবে। চারা দেরিতে রোপণ করলে পরাগায়ন হয় না ফলে ধান চিটা হয়। বোরো ধানে সব সময় পানি রাখতে হয়। সঠিক সময়ে সেচ দিলে ১৫ থেকে ২৫ ভাগ ফলন বাড়ে। চারা রোপণের পর থেকে কাইচ থোড় পর্যন্ত ছিপছিপে পানি রাখলেই হবে। কাইচ থোড় আসা শুরু হলে পানির পরিমাণ দ্বিগুণ করতে হবে। সার প্রয়োগের দু’তিন দিন পর সেচ দিলে সারের কার্যকারিতা বাড়ে। কুশি স্তরে পানির পরিমাণ কম রাখলে কুশি বাড়ে। ধান পাকার সময় ধান শক্ত হলেই জমি থেকে পানি সরিয়ে দিতে হবে। সঠিক সময় রোগ ও পোকামাকড় দমন করলে ১৫ থেকে ২০ ভাগ ফলন বেশি হয়। দেশে ধানের ৩১ টি রোগ এবং ১৭৫ প্রজাতির পোকা আক্রমণ করে। এরমধ্যে ১০ টি রোগ এবং ২০ থেকে ৩০ টি পোকা মারাত্মক ক্ষতি করে। মারাত্মক পোকার মধ্যে রয়েছে- হলুদ মাজরা পোকা, গল মাছি, পামরী পোকা, চুঙ্গি পোকা, ঘাস ফড়িং, পাতার লেদা পোকা, সবুজ পাতা ফড়িং, মাজরা পোকা, বাদামি গাছ ফড়িং ইত্যাদি। এসব পোকা হাত জাল, আলোর ফাঁদ, ক্ষেতে ডাল পুঁতে, জমির পানি বের করে ও কীটনাশক দিয়ে দমন করা যায়। মারাত্মক রোগের মধ্যে রয়েছে টুংরো, পাতা পোড়া, ব্লাস্ট, খোলপড়া, খোলপচা ইত্যাদি। এসব রোগ প্রতিরোধের জন্য রোগমুক্ত বীজ বালাইসহনশীল জাতের চাষ, সুষম সার প্রয়োগ, নির্দিষ্ট দূরত্বে চারা রোপণ, সমকালীন চাষাবাদ ইত্যাদি পদ্ধতি অবলম্বন করা যেতে পারে। এ ছাড়াও জৈবিক দমন পদ্ধতিতে রোগ ও পোকা দমন করা যায়। জমির ৮০ ভাগ ধান পেকে গেলে কাটতে হবে। বেশি পাকলে ঝরে যেতে পারে। কাঁচা ধান কাটলে ফলন কম হয়। ধান গাছ হেলে পড়লে ক্ষেতের দাঁড়িয়ে থাকা পানি বের করে দিতে হয়। ধানের চিটার জন্যে ফলন কম হয়। ধানের চিটা হওয়া প্রতিরোধ করে ফসল বাড়ানো যায়। স্বাভাবিকভাবে ধানে ১৫ থেকে ২০ ভাগ চিটা হয়। ধান গাছের জন্য অসহনীয় ঠাণ্ডা বা গরম, খরা, ঝড়, তুফান ইত্যাদির জন্য চিটা হয়। এ ছাড়াও সেচের অভাব, সুষম সারের অভাব, পরাগায়নে বিঘ্ন, পরিচর্যার অভাব ইত্যাদি কারণেও ধানে চিটা হয়। এসব প্রতিরোধের জন্য ৪০ থেকে ৫০ দিন বয়সের চারা পৌষ ও মাঘের মধ্যে রোপণ করা এবং কাইচ থোড়, শীষ বের হওয়ার সময়, ফুল ফোটার সময় সেচ দিতে হবে। দুধভরা অবস্থায় সেচ দিলে ফলন বাড়ে। সুষম মাত্রায় সার দিলে চিটা হয় না। জিঙ্ক ও বোরনের সর্বশেষ প্রযুক্তি চিলেটেড জিঙ্ক ও সরিউবর বোরন প্রয়োগ করলে ধানে চিটা হয় না। ধানের চারা রোপণের ২০ থেকে ২২ দিন পর প্রথম বার এবং ৪০ থেকে ৪৫ দিন পর দ্বিতীয় বার এক লিটার পানিতে এক গ্লাস লিবরেল জিঙ্ক ও দুই গ্রাম লিবরেল বোরন এক সাথে মিশিয়ে সেপ্র করতে হবে। দেশের আবাদি জমি কমছে। পক্ষান্তরে বাড়ছে জনসংখ্যা। এ জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা যোগান দিতে প্রয়োজন অধিক উত্পাদন। পতিত জমি উত্পাদনের আওতায় আনা। আমাদের খাদ্য নিরাপত্তার বড় অংশ পূরণ হয় বোরো ফসল থেকে। তাই বোরো ধানে অধিক ফসল পেতে উপরের কৌশলগুলো অনুসরণ করা যেতে পারে। পাশাপাশি দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উন্নত প্রযুক্তিতে সীমিত জমি থেকে খাদ্য উত্পাদন বাড়াতে হবে।