২. হরমোন প্রয়োগ পদ্ধতি:হরমোন প্রয়োগ পদ্ধতিতে মনোসেক্স বা পুরুষ তেলাপিয়া উত্পাদন করতে হলে প্রথমে ২০ থেকে ২৫ শতাংশের একটি ব্রুড মাছ পালনের পুকুরের প্রয়োজন হবে। প্রথমে জানুয়ারি মাসের শেষ দিকে পুকুরটিকে শুকিয়ে কাদামুক্ত মাটিতে প্রতি শতাংশে ১ কেজি হারে চুন প্রয়োগ করে মই দিয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে। তার ৩ থেকে ৪ দিন পর অগভীর বা গভীর নলকূপ দিয়ে ৩ ফুট পরিমাণ স্বচ্ছ পানি দিতে হবে। এর পর প্রতি শতাংশে ১০০ থেকে ১৫০ গ্রাম ওজনের ২৫ টি স্ত্রী মাছ এবং ১২ টি পুরুষ মাছ একসাথে পুকুরে ছাড়তে হবে। এখানে পুরুষ মাছ ৮ টি দিলেই চলত কিন্তু একসাথে বেশি সংখ্যক মাছ ডিম পারার জন্য পুরুষের সংখ্যা বেশি দেয়ার কথা বলা হয়েছে। পুকুরে তেলাপিয়ার ব্রুড মাছ ছাড়ার পর সম্পূরক খাবার দিতে হবে। আজকাল বাজারের যেকোনো কোম্পানির ভাসমান খাবার দিলেই চলবে। শরীরের ওজনের ৩ ভাগ হিসাবে খাবার দিতে হবে। এভাবে খাবার দেয়া হলে ২ সপ্তাহের মধ্যেই ব্রুড মাছগুলো বাচ্চা দেয়া শুরু করবে। প্রথমবার বাচ্চা দেয়ার পর মা মাছগুলোকে আলাদা করে অন্য একটি পুকুরে অথবা পুকুরে স্থাপিত হাঁপায় স্থানান্তর করতে হবে। বেশি বাচ্চা সংগ্রহের জন্য আগে থেকেই আরেকটি পুকুরে শুধু মা মাছ লালন-পালন করলে দ্বিতীয়বার বাচ্চা সংগ্রহ করা সহজ হবে। যেমন একটি পুকুরে পুরুষ ও স্ত্রী মাছ একসাথে দেয়ার পাশাপাশি আরেকটি পুকুরে শুধু স্ত্রী মাছ লালন-পালন করতে হবে। প্রথম পুকুরে বাচ্চা দেয়া শেষ হলে প্রথম পুকুরের শুধু পুরুষ মাছগুলোকে দ্বিতীয় পুকুর অর্থাত্ যে পুকুরে শুধু স্ত্রী মাছ ছিল সেই পুকুরে পুরুষ মাছগুলোকে ছেড়ে দিতে হবে। তা হলে ১০ দিনের মধ্যেই আবার দ্বিতীয় পুকুরে বাচ্চা দেয়া শুরু করবে। পালাক্রমে এ ব্যবস্থা নিলে প্রচুর বাচ্চা সংগ্রহ করা যাবে।
বাচ্চা সংগ্রহের কৌশল:পুকুরে তেলাপিয়ার ব্রুড মাছ ছাড়ার পর পুরুষ মাছগুলো পুকুরের অগভীর স্থানে গর্ত করে এবং স্ত্রী মাছকে ডিম ছাড়ার আমন্ত্রণ জানায়। প্রাপ্ত বয়স্ক পরিপূর্ণ ও পরিপক্ব ডিমভর্তি স্ত্রী মাছ পুরুষের আমন্ত্রণে গর্তে আসে এবং ওই গর্তের মাটিতে ডিম ছাড়ে এবং তারপর পুরুষ মাছ ওই ডিমে শুক্রাণু দিয়ে নিষিক্ত করে। এরপর স্ত্রী মাছটি এ নিষিক্ত ডিমগুলোকে তার মুখের ভেতর পুরে নেয়। এ সময় মা মাছ তার বাচ্চাকে সুরক্ষিত রাখার তাগিদে ৮ থেকে ৯ দিন কোনো খাবার খায় না। এভাবে মুখের ভেতর ৬ থেকে ৭ দিন থাকার পর ডিম ফুটে বাচ্চা বের হলে মা মাছটি পুকুরে ছেড়ে দিয়ে কাছাকাছি অবস্থান করে। বিপদ আসন্ন মনে হলে মা মাছটি তার বাচ্চাগুলোকে আবার মুখের ভেতর পুরে নেয়। এভাবে চলতে চলতে মা মাছটির যখন মনে হয় যে তার বাচ্চাগুলো নিজেরাই চলতে পারবে তখন বাচ্চাগুলোকে স্থায়ীভাবে পুকুরে ছেড়ে দেবে। বাচ্চাগুলো প্রথমে পুকুরের এককোণে টাকি মাছের বাচ্চার মত গোল হয়ে চলাফেরা করতে থাকে। এ সময় হাঁপা বা স্কুপ নেট দিয়ে বাচ্চাগুলোকে একসাথে করতে হবে। বাচ্চাগুলোতে সামান্য পরিমাণে ডিম্বকুসুম থাকার কারণে তারা খাবারের প্রতি আগ্রহ দেখায় না। এ জন্য প্রথমদিন বাচ্চা ধরলে মনোসেক্স তেলাপিয়া উত্পাদনে বেশি সহায়ক হয়। এখানে উল্লেখ্য, মা মাছ বাচ্চা ছাড়ার পর প্রতিদিনের বাচ্চা প্রতিদিনই সংগ্রহ করতে হবে। প্রয়োজনে সকাল বেলায় একবার বাচ্চা ধরার পর বিকেলে আবার ধরতে হবে।
২ দিন বয়সী বাচ্চা না ধরাই ভাল। এর পরও ধরা পরলে বাচ্চা সংগ্রহ করে .৩ মিমি:নেট দিয়ে ছেঁকে বড় বাচ্চাগুলোকে আলাদা করে ফেলতে হবে। সাধারণত সকাল বেলায় অক্সিজেন স্বল্পতার সময় বাচ্চাগুলো এভাবে ভেসে থাকতে দেখা যায়। তারপর সংগৃহীত বাচ্চাগুলোকে অন্য একটি পুকুরে স্থাপিত হাঁপায় রাখতে হবে, যা হবে হরমোন প্রয়োগের পুকুর। [ লেখকের গবেষণায় প্রাপ্ত ফলাফল] (চলবে)
