আমাদের অর্থনীতির বড় খাত কৃষি। বাজারের প্রশ্নেই হোক, কর্মসংস্থান, অভ্যন্তরীণ চাহিদা সৃষ্টি, সঞ্চয় ও বিনিয়োগের প্রসার সম্ভাবনার প্রশ্নে এবং সর্বোপরি শিল্পায়নের প্রশ্নে, সব কিছুর ভিত্তিভূমি আমাদের কৃষি। অর্থনীতির বড় ভরসার জায়গা। বিজয়ের বিয়াল্লিশ বছরে দাঁড়িয়েও কৃষির মূল কাণ্ডারি কৃষাণ-কৃষাণীর মুখের হাসি ও চোখের পানি নিত্যসঙ্গী। উত্পাদিত কৃষি পণ্যের যথার্থ দাম প্রাপ্তির নিশ্চয়তা রক্ষার কোনো স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা ও পদ্ধতি আজ পর্যন্ত যে গড়ে তোলা যায়নি, তা নিয়ে কেউ কিন্তু কিছু ভাবছেন না; বলছেনও না। অসংখ্য প্রশ্ন, পারস্পরিক সাংঘর্ষিক অবস্থান, কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, নীতি-কৌশলের প্রায়োগিক সীমাবদ্ধতা, স্বার্থের দ্বন্দ্ব এবং রাজনীতি এখানে যে সতত ক্রীয়াশীল তা মোকাবিলায় কার্যকর রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি কোথায়।
আমাদের কৃষি অর্থনীতিতে বিরাজ করে উভয় সংকট। ধান, পাট, সবজির ভাল ফলন হলেও কৃষকের মুখে হাসি ফোটে না; কারণ দাম পাওয়ার কোনো নিশ্চয়তা নেই। আবার ফলন পড়ে গেলে তো হাসি এমনিতেই চলে যায়। খোদ কৃষককে তার ফসলের ন্যায্যদাম দিতে গেলেও সমস্যা হয় বলে অনেকে মনে করেন। তা হলে ভোক্তা পর্যায়ে পণ্যের দাম হবে আরো চড়া। এর ফলে রাজনৈতিক কারণেও তখন সরকার চিন্তিত হয়ে পড়ে। তবে কৃষক তার কৃষি পণ্যের দাম কম পেলে চূড়ান্ত ভোক্তারা কম দামে যে সেই পণ্যটি কিনবে তার ন্যূনতম নিশ্চয়তা কিন্তু নেই। ক্ষেত থেকে একের পর এক হাত ঘুরে চূড়ান্ত ভোক্তার কাছে কয়েকগুণ বেশি দামেই গিয়ে পৌঁছে পণ্য সামগ্রী। মাঝখানে সব চলে যায় মধ্যস্বত্বভোগীদের পকেটে। অথচ কৃষকের সার, কীটনাশক থেকে উত্পাদনের সব উপাদান কিনতে হচ্ছে উচ্চ দামে।
ঢাকায় আমরা যখন সবজির কেজি ৪০ থেকে ৫০ টাকায় কিনছি তখন কৃষক সবজি বিক্রি করে পাচ্ছেন ২০ থেকে ২৫ টাকা। আলুতে কৃষক এখন দারুণ বিপাকে। গত মৌসুমের উত্পাদিত আলুর ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় আলু চাষে কৃষকের উত্সাহে ভাটা পড়েছে। পাট চাষিদের এবার মাথায় হাত। গত বছর প্রতি মণ পাটের দাম ছিল আড়াই হাজার টাকা। এবার লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে পাটের ফলন এবং আবাদ বেশি হয়েছে। সেই পাট বিক্রি হচ্ছে ৮০০ থেকে ১০০০ টাকায়। আমনের এবার ভাল ফলন হয়েছে। কিন্তু কৃষকের মুখে হাসি নেই। প্রতি মণ আমনের উত্পাদন খরচ ৫৬০ টাকা থেকে ৬০০ টাকা হলেও বাজারে কৃষক বিক্রি করছেন ৫০০ থেকে ৬০০ টাকায়। কোনো কোনো অঞ্চলে আবার ৪৫০ টাকা করেও ধান বিক্রি হচ্ছে। মোট কথা, প্রায় সব কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রেই একদিকে কৃষক এবং অন্যদিকে চূড়ান্ত ভোক্তা মার খাচ্ছে। দেশের প্রায় ২ কোটি কৃষকের জীবিকাই চলে এই অনিশ্চয়তার দোলাচলে। কৃষক মার খায় তার ফসলের উত্সাহজনক দাম না পেয়ে। আর আমরা মার খাই সেই পণ্য দু-তিনগুণ বেশি দামে কিনে। কৃষক যদি উত্পাদিত পণ্যের যথার্থ দাম না পান তা হলে কী হবে- এক. কৃষক পরে আরো বেশি উত্পাদনের উত্সাহ হারিয়ে ফেলবে। দুই. গ্রামীণ দারিদ্র্যের বিস্তার ঘটার ঝুঁকি বাড়বে। তিন. এর অনুষঙ্গ হিসেবে পুষ্টি ও স্বাস্থ্যহীনতা দেখা দেবে এবং চার. উত্পাদক পর্যায়ে পণ্যের ন্যায্যদাম নিশ্চিত করা সরকারের নীতিরই অংশ। এর ব্যত্যয় হলে রাজনৈতিক সংকটই ডেকে আনবে।
সরকার কখনই সরাসরি চাষিদের কাছ থেকে ধান-চাল কেনে না; চাল কেনে মিলারদের কাছ থেকে। এখানে মধ্যস্বত্বভোগী বাজারে সক্রিয় থাকে। বহু হাত বদল হয়। সিপিডি গবেষণায় দেখিয়েছে, এখানে প্রায় ৮ বার হাত বদল হয়। অর্থাত্ চেইনে ৮টি স্তর কাজ করে। কিন্তু প্রকৃত কৃষক ছিলেন যে তিমিরে সে তিমিরেই রয়ে গেছেন।
কৃষিপণ্যের বিপণনে কৃষকের স্বার্থ রক্ষার স্থায়ী কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা আজো গড়ে ওঠেনি। কৃষক প্রতারিত হলেও অনেক ক্ষেত্রেই মন্দের ভাল হিসেবে বিপণনের মধ্যস্বত্বভোগীদের অবস্থানগত স্তরগুলো কৃষি বিপণন প্রক্রিয়াকে সক্রিয় রেখেছে। এখানে প্রাতিষ্ঠানিক উপায়ে সরকারি হস্তক্ষেপই প্রকৃত চাষিদের মূল্য প্রাপ্তিতে একমাত্র স্বস্তি দিতে পারে।
কৃষক উত্পাদন করেই যাচ্ছেন। এর একটাই উত্তর। বিকল্প তাদের আর কিছু করার নেই। অর্থাত্ বাবা-দাদার আমল থেকে চৌদ্দ পুরুষ ধরে এই ক্ষেত-খামারেই তারা আছেন। উপযুক্ত ও কৃষক কল্যাণমুখী নীতি সমর্থন পেলে তাদের হাসি ফোটে মুখে। না পেলে এভাবেই মার খান, যেমন বর্তমানে ধানে মার খাচ্ছেন, পাটে মার খাচ্ছেন, সবজিতে মার খাচ্ছেন, হলুদ, পেঁয়াজ-মরিচ উত্পাদনে মার খাচ্ছেন। আশায় বুক বেঁধে আবার এগুলোই উত্পাদনে যাবেন তারা। এভাবেই চলে বংশ পরম্পরায়। দারিদ্র্যকে চিরসাথী করে এভাবেই তারা চলেছেন।
