নারী জাগরণের অগ্রদূত মহিয়সী নারী বেগম রোকেয়ার ১৩২তম জন্ম ও ৮০তম মৃত্যুবার্ষিকী যথাযোগ্য মর্যাদায় উদযাপনের লক্ষ্যে আজ রবিবার জেলা প্রশাসনসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন বিস্তারিত কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে আজ থেকে রোকেয়ার জন্মস্থান পায়রাবন্দে তিনদিনব্যাপী রোকেয়া মেলাসহ বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নেয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে: রোকেয়ার স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পমাল্য অর্পণ, স্বেচ্ছা রক্তদান, পায়রাবন্দ জামে মসজিদে মিলাদ মাহফিল, আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, চিত্রাঙ্কন ও রচনা প্রতিযোগিতা। এছাড়াও মেলায় থাকবে সার্কাস, পুতুল নাচ, জারীগান ও নারীদের মিলন মেলা। তিনদিনব্যাপী কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী মোতাহার হোসেন এমপি। তার স্মৃতি এবং অবদানকে স্মরণীয় করে রাখতে ১৯৯৭ সালের ২৮ জুন তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রোকেয়ার জন্মভূমি রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার পায়রাবন্দ গ্রামে ‘বেগম রোকেয়া স্মৃতি কেন্দ্রের’ ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় ৩ কোটি ৮০ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত করে বাংলা একাডেমী। ২০০১ সালের ১ জুলাই প্রধানমন্ত্রী স্মৃতি কেন্দ্রটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করলেও ৩ মাসের মাথায় ৪ দলীয় জোট সরকারের আমলে স্মৃতি কেন্দ্রের সকল কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।
পরবর্তীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ২০০৮ সালে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের কাছ থেকে নিয়ে স্মৃতি কেন্দ্রটির তদারকির দায়িত্ব দেয় শিশু ও মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে। এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা হাইকোর্টে রিট করেন। হাইকোর্ট রিটের নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত স্মৃতি কেন্দ্রটি যে অবস্থায় আছে সেভাবে রাখার আদেশ দেয়। কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকার সে আদেশ অমান্য করে ২০০৮ সালের নভেম্বরে স্মৃতি কেন্দ্রটি বিকেএমইএর (বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন) কাছে ৫ বছরের জন্য লিজ প্রদান করে। রিটের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্টের আদেশে চলতি বছরের ২৪ এপ্রিল বেগম রোকেয়া স্মৃতি কেন্দ্রটি বিকেএমইএর কাছে হস্তান্তর করা হয়। কিন্তু বর্তমানে অভিভাবকহীন অবস্থায় পড়ে রয়েছে স্মৃতি কেন্দ্রটি। ফলে পায়রাবন্দবাসী এবং রংপুরের বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন স্মৃতি কেন্দ্রটি পুনরায় চালুর দাবি জানিয়েছে। রংপুরের জেলা প্রশাসক ফরিদ আহাম্মদ জানান, স্মৃতি কেন্দ্রকে বাংলা একাডেমীর কাছে হস্তান্তরের জন্য হাইকোর্টের একটি আদেশ রয়েছে। আশাকরি, সরকার এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করে এ অঞ্চলের মানুষের আকাঙ্ক্ষাকে অগ্রাধিকার দিবে।
স্মৃতি কেন্দ্রের উপ-পরিচালক আব্দুল্লাহ আল ফারুক জানান, বেগম রোকেয়া স্মৃতি কেন্দ্রটি যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে প্রতিষ্ঠা হয়েছে তা বাস্তবায়নে সরকার দ্রুত পদক্ষেপ নিবে। যাতে সারাদেশের বেগম রোকেয়া অনুরাগীদের আশা-আকাঙ্ক্ষার বাস্তব প্রতিফলন ঘটে।
অপরদিকে বেগম রোকেয়ার ভাতিজি ও পায়রাবন্দ বেগম রোকেয়া মেমোরিয়াল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা রনজিনা সাবের জানান, ১৯৬৪ সালে স্কুলটি প্রতিষ্ঠিত হলেও এখন পর্যন্ত তা সরকারিকরণ করা হয়নি। বেগম রোকেয়া ফোরামের সিনিয়র সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট এম.এ বাশার টিপু বলেন, রোকেয়া স্মৃতি কেন্দ্র এখন এতিমখানায় পরিণত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য নিয়ে রোকেয়া স্মৃতি কেন্দ্র নির্মাণ করেছিলেন তা ব্যাহত হয়েছে।
বেগম রোকেয়া স্মৃতি সংসদের সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম দুলাল বলেন, স্মৃতি কেন্দ্র থেকে বিকেএমইকে উচ্ছেদ এবং রোকেয়ার পৈতৃক সম্পত্তি উদ্ধার করে সংরক্ষণের নির্দেশনা চেয়ে গত ২২ মার্চ হাইকোর্টে রিট পিটিশন করা হয়। বর্তমানে মামলাটি চূড়ান্ত শুনানি পর্যায়ে রয়েছে।
উল্লেখ্য, বেগম রোকেয়া ১৮৮০ সালে ৯ ডিসেম্বর রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলাধীন পায়রাবন্দ গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৩২ সালের ৯ ডিসেম্বর ভারতের কলকাতার সোদপুরে মৃত্যুবরণ করেন। সমাজসেবার পাশাপাশি সাহিত্য চর্চার মাধ্যমে নারীদের অধিকার নিয়ে মত তৈরির চেষ্টা করেছেন। রোকেয়ার উল্লে¬খযোগ্য রচনার মধ্যে রয়েছে মতিচুর, সুলতানার স্বপ্ন, পদ্মরাগ,অবরোধবাসিনী প্রভৃতি। এছাড়া রয়েছে অসংখ্য প্রবন্ধ , ছোট গল্প, কবিতা ও অনুবাদ।
