আপনি কি আবার সেনা সমর্থিত সরকার আনতে চাচ্ছেন?

আপডেট : ০৮ ডিসেম্বর ২০১২, ২২:৩৭
প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের আজকের অবরোধ কর্মসূচিকে ‘দুঃখজনক’ উল্লেখ করে বলেছেন, মহান বিজয়ের মাসে বিরোধী দলের আন্দোলনে জনগণ কখনোই সাড়া দেবে না। কারণ যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষার উদ্দেশ্যেই বিরোধী দলের এই আন্দোলন। এদিকে বিডি নিউজ আরো জানায়, সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় রাজনীতিকদের ওপর নির্যাতনের কথা বিরোধী দলীয় নেতা খালেদা জিয়াকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আপনি কি আবার সেনা সমর্থিত সরকার চাচ্ছেন? তখন তো ছেলেদের বের করে দিয়েছে। আর এখন আন্তর্জাতিক আদালত থেকে রায় দিয়েছে। এখন আপনার ছেলেদের ধরে এনে যে শাস্তি দেবে না—এর নিশ্চয়তা কী? তখন তো আপনার লোকদের বসিয়েছিলেন। এখন যারা বাতাস দিচ্ছে তারা যে বাঁচাতে পারবে তার নিশ্চয়তা কী? গতকাল শনিবার গণভবনে হবিগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের তৃণমূল নেতাকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় সূচনা বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বিজয়ের চেতনায় উদ্বুদ্ধ জনগণের দাবি। এ বিচার সম্পন্ন হবেই ইনশাল্লাহ। শেখ হাসিনা দুর্নীতির বিরুদ্ধে তার সরকারের কঠোর অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, বর্তমান সরকার দুর্নীতি নয়, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতায় বিশ্বাসী। প্রধানমন্ত্রী ১৪ ডিসেম্বর বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে বিরোধী দলীয় নেত্রী খালেদা জিয়ার শ্রদ্ধা জানাতে যাওয়াকে ‘ভান’ আখ্যায়িত করে বলেন, শহীদ বুদ্ধিজীবীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে তিনি কেন বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে যান? আমাদের বুদ্ধিজীবীদের যারা হত্যা করেছিল, সেই যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষার জন্য তিনি বিজয়ের মাসে আন্দোলনও করেন! একদিকে যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষায় আন্দোলন করেন, অন্যদিকে বুদ্ধিজীবীদের সম্মান জানাতে যান! তাহলে তিনি কী স্মৃতিসৌধে গিয়ে ভান করেন? প্রধানমন্ত্রী বলেন, যে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হচ্ছে, তাদের তো তারা (বিএনপি) ছেড়েই দিয়েছিল। আর এখন ডিসেম্বর মাসে সেই বিএনপি আন্দোলন করছে যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচাতে। তাদের বিচার ঠেকাতে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহালের বিরোধী দলের দাবি প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মাগুরার উপ-নির্বাচনে কারচুপির পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি উঠেছিল। তখন বর্তমান বিরোধী দলীয় নেত্রী বলেছিলেন ‘পাগল আর শিশু ছাড়া কেউ নিরপেক্ষ নয়’। এখন তিনিই আবার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি করছেন। তাহলে তিনি কী ভালো পাগল আর শিশু খুঁজে পেয়েছেন? তিনি বলেন, তখন যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আইন করা হয়েছিল, তাতে দেশের বিচারবিভাগকে ধ্বংস করা হয়। পরে বিচারপতি কেএম হাসানকে প্রধান উপদেষ্টা করতে বিচারপতিদের অবসরের বয়সসীমা বাড়ানো হয়েছিল; কিন্তু তা করতে না পেরে ইয়াজউদ্দিনকে প্রধান উপদেষ্টা করলেন। একই ব্যক্তি রাষ্ট্রপতি এবং প্রধান উপদেষ্টা হলেন। ইয়াজউদ্দিন হয়ে গেল ‘ইয়েসউদ্দিন’। তিনি বলেন, পরে তত্ত্বাবধায়ক সরকারে দুই দফা উপদেষ্টা বদলের পর যারা এসেছিলেন, তারাও তো উনারই (বিরোধী দলীয় নেত্রী) লোক ছিল। এরপর জরুরি অবস্থা এলো। ওই দুই বছরে মানুষের যে অভিজ্ঞতা, সে সময়ের অত্যাচার-নির্যাতনের কথা মানুষ ভুলে যাবে না। ইয়াজউদ্দিনের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টারা পদ থেকে পদত্যাগকারীদের সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যারা তখন পদত্যাগ করলেন, এখন তারা তত্ত্ব কথা বলেন। আমার প্রশ্ন পদত্যাগ করলেন কেন? কেন একটা নির্বাচন করার গাটস্ ছিল না? এ কারণেই তো ওয়ান ইলেভেন এসেছিল। তিনি বলেন, ওয়ান ইলেভেনের পর উনার (খালেদা জিয়া) ছেলেদের উত্তম-মধ্যম দিয়ে দেশ থেকে বের করে দেয়া হয়েছিল। উনাকেও দেশ থেকে বের করে দিতে চেয়েছিল। আমি দেশের বাইরে যাওয়ার পর আমাকে দেশে আসতে নিষেধ করা হয়েছিল। আমি বাধা উপেক্ষা করে দেশে ফিরে আসি। এবার তো আন্তর্জাতিক আদালতই উনার ছেলের দণ্ড দিয়েছে। আবারও ওই তত্ত্বাবধায়ক সরকার আসলে তাদের শাস্তি যে দেবে না, তার নিশ্চয়তা কী তিনি পেয়েছেন? দুর্নীতি নির্মূলই বর্তমান সরকারের মূল লক্ষ্য। এ কারণে দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) শক্তিশালী করা হয়েছে। দুদক এখন স্বাধীনভাবে কাজ করছে। বর্তমান সরকারের মন্ত্রী, এমপি, উপদেষ্টা ও নেতা যখন যাকে ইচ্ছা দুদক তলব এবং জিজ্ঞাসাবাদ করছে। এতে কেউ কোন আপত্তি করছে না। এক্ষত্রে প্রভাব খাটানোর কোন ঘটনাও ঘটছে না। এটা কি বিএনপি সরকারের সময়ে সম্ভব হয়েছিল? তাদের কোন মন্ত্রীকে দুদক ডাকলে তাদের গুন্ডা পান্ডারা তো দুদকেই হামলা করে বসতো। ‘নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়া পদ্মা সেতু প্রকল্পে অর্থায়ন নয়’ বিশ্বব্যাংকের দেয়া এমন বিবৃতির জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অতীতে কখনো দুদক এত বেশি স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ পায়নি। বর্তমান সরকার দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কাজে কোন ধরনের হস্তক্ষেপ করেনি ভবিষ্যতেও করবে না। তিনি বলেন, এখন যখন খুশি যাকে যেমন মন্ত্রী, উপদেষ্টা ও পার্লামেন্ট সদস্যদের স্বাধীনভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারছে দুদক। এ ধরনের চর্চা খালেদা জিয়া ও এরশাদের আমলে একবারেই ছিল না। প্রধানমন্ত্রী বলেন, নির্বাচন কমিশন স্বাধীন। নির্বাচনের সময় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসন নির্বাচন কমিশনের অধীনে থাকে। তারাই সব সিদ্ধান্ত নেয়। কাকে কোথায়, কোন দায়িত্ব দেবে তারা ঠিক করে। বর্তমান সরকারের সময় অনুষ্ঠিত সব নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, হবিগঞ্জের উপনির্বাচনে আমাদের প্রার্থী বারশ’ ভোটে হেরে গিয়েছে। বিএনপি ক্ষমতায় থাকলে তো এই রেজাল্ট বদলে দিত। হবিগঞ্জে গ্রেনেড হামলায় সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএম এস কিবরিয়া হত্যাকাণ্ড ও বাংলা ভাই সৃষ্টির কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ওই সময় অপারেশন ক্লিনহার্টে দেড়শ’ মানুষ মেরে ফেলা হয়েছিল। আর এ হত্যাকাণ্ডের বিচার যেন না হয়- সেজন্য তারা (তত্কালীন সরকার) ইনডেমনিটিও দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর প্রারম্ভিক বক্তব্যের পর তার সভাপতিত্বে রুদ্বদ্বার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে দলের জেলার সাংগঠনিক রিপোর্ট পেশ করেন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট আবু জাহির এমপি। দলের জেলা সভাপতি ডা. মুশফিক হোসেন চৌধুরীসহ বিভিন্ন উপজেলা পর্যায়ের নেতারা এতে বক্তব্য রাখেন। পরিচালনা করেন দলের সিলেট বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক এডভোকেট মিছবাহ উদ্দিন সিরাজ। সভায় আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামন্ডলীর সদস্য ও দফতরবিহীন মন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, প্রেসিডিয়াম সদস্য ও কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী, পাট ও বস্ত্রমন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী, সতীশ চন্দ্র রায়, সমাজকল্যাণ মন্ত্রী এনামুল হক মোস্তফা শহীদ, খাদ্যমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।